কোটা আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইতোমধ্যে ৪২ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে যেমন অনেক উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন তেমনি কেউ কেউ স্বেচ্ছায় সরে গেছেন। তবে উপাচার্যদের পদত্যাগের হিড়িকের মধ্যেও এখনো টিকে আছে ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
এই ৯ জনের মধ্যে কেউ আত্মগোপনে আছেন। আবার কেউ বা সরকার থেকে কি নির্দেশনা আসে সেই প্রতীক্ষার প্রহর গুণছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ চেষ্টা তদবির করছেন কোনোমতে টিকে থাকার। বাকিরা মনে করেন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে এ নিয়ে তাদের করার কিছুই নেই।
এদিকে ৪২ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করলেও এখনো ভিসিবিহীন রয়েছে ৯ বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে গতি ফিরছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে, শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
অপরদিকে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো উপাচার্য শূন্য সেখানে নিয়োগ পেতে নানা তদবির চালাচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা নিয়োগ পেতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যেমন ধর্ণা দিচ্ছেন তেমনি যোগাযোগ করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে। আবার কেউ কেউ যোগাযোগ রাখছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, যেসব উপাচার্য পদত্যাগ করেননি কিংবা এখনো স্বপদে বহাল আছেন তাদের কাউকেই রাখা হবে না, পর্যায়ক্রমে সবাইকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো উপাচার্য শূন্য তার মধ্যে চলতি সপ্তাহেই বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। এ নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। যেসব উপাচার্যরা পদত্যাগ করেননি তাদের বিষয়ে সরকার কি সিদ্ধান্ত নেবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ উপাচার্যই পদত্যাগ করেছেন। যারা পদত্যাগ করেছেন সেসব জায়গায় নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়ে গেছে, অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এখনো পদত্যাগ করেননি কিংবা স্বপদে বহাল আছেন। এ ক্ষেত্রে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। যারা দায়িত্বে আছেন তাদের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে কিংবা আমরা কোনো অভিযোগ পাই তাহলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সবশেষ বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শাহ আলিমুজ্জামান পদত্যাগ করেন। তিনি পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, 'বিগত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলনকারী শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ আমার বিরুদ্ধে যে সকল মিথ্যা, বানোয়াট, মানহানি রিপোর্ট, সংবাদ ও অভিযোগ প্রচার করে যাচ্ছে ১০টি বিভাগের মধ্যে ২টি বিভাগের শিক্ষার্থীদের একাংশ তা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, যা আমার জন্য বেদনাদায়ক'।
এর আগে ১ অক্টোবর হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বাসেতকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ সায়েম উদ্দিন আহম্মদকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এখনো যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেননি সেগুলো হলো- চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. নাছিম আখতার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কিশোরগঞ্জের উপাচার্য জেড এম পারভেজ সাজ্জাদ, শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় খুলনার উপাচার্য ডা. মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কে এম জাকির হোসেন, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আবু নঈম শেখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পিরোজপুরের উপাচার্য কাজী সাইফুদ্দীন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় নওগাঁর উপাচার্য মো. আবুল কালাম আজাদ, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন এবং মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয় মেহেরপুরের উপাচার্য মো. রবিউল আলম
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, যেসব উপাচার্য এখনো পদত্যাগ করেননি তারা তুলনামূলকভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারা আগের সরকারের সময় যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে বেশি নিয়োগ পেয়েছেন। যেহেতু অল্প কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সব জায়গায় উপাচার্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা পদত্যাগ করেছেন তাই অল্প কয়জনকে না রেখে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া উচিৎ।
নানা অভিযোগ তবুও বহাল: চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চাঁবিপ্রবি) উপাচার্য ড. মো. নাসিম আখতারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। সরকার পতনের পর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ভিসি ড. মো. নাসিম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছেন এবং হুমকি ধমকি প্রদান করেছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগ দাবি করেন।
শান্তি মিছিলে অংশ নিয়েও উপাচার্য বহাল: কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম জাকির হোসেনকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে শান্তি মিছিলে সামনের সারিতে দেখা গিয়েছিল। গত ৪ আগস্ট বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) তিনি ‘শেখ হাসিনাতেই আস্থা’লেখা ব্যানার নিয়ে শান্তি মিছিলে অংশ নেন। এছাড়া ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো শান্তিতে নোবেল জয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিচার প্রক্রিয়া স্থগিতের দাবির প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক উপকমিটির একজন সদস্য।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তারা উপাচার্যকে পদে দেখতে চান না। তিনি উপাচার্য থাকলে আন্দোলনের বিপক্ষে থাকা এই শিক্ষককে দেখে শিক্ষার্থীদের মনে বারবার ফ্যাসিজমের স্মৃতি ফিরে আসবে। এ ধরনের শিক্ষকদের মধ্যে যারা এখনো পদে রয়েছেন, তারা যেন নিজের ইচ্ছায় পদত্যাগ করেন এমন দাবি শিক্ষার্থীদের।
খুলনা শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিতেন ভিসি, এমপি, আ.লীগ নেতারা: এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের তালিকায় আছেন এমপির শ্যালিকার ছেলে ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়, ব্যক্তিগত সহকারীর স্ত্রী, সাবেক প্যানেল মেয়রের ভাগ্নে ও ভাতিজা। এর বাইরে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রধান যোগ্যতা ছিল তারা আওয়ামী পরিবারের সদস্য। আর এ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানের সহযোগিতায়। উপাচার্য মাহবুবুর রহমানের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরে। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর টিপুর মামা। বাড়ি গোপালগঞ্জ, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সখ্য এবং টিপুর মামা এ পরিচয়গুলো উপাচার্য হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কাজে লাগান।