ভারত রাষ্ট্র এই মুহূর্তে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মাওবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে। প্রায় রোজ সংবাদমাধ্যমে ব্রেকিং নিউজে উঠে আসছে কোথাও না কোথাও পুলিশ এনকাউন্টারে মাওবাদীদের মৃত্যুর কাহিনি। মনমোহন সিংহের কংগ্রেস সরকার বলতেন, ভারতের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক মাওবাদী রাজনীতি। দেশের অভ্যন্তরীণ থ্রেট মাওবাদ। আর এখন তো নিছক মুখে বা বিবৃতি দিয়ে নয়, সরকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে মাওবাদী দমনে।
ভারতের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো দিনক্ষণ-তিথি-নক্ষত্র দেখে ঘোষণা করে দিয়েছেন যে ২০২৬ সালের মধ্যে মাওবাদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে দেশ থেকে। বোধহয় তার ফলেই এই সর্বাত্মক যুদ্ধ। আকাশ পথে ড্রোন থেকে হামলা চালানো হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে ফেলা হয়েছে পুলিশ, প্যারা-মিলিটারি ফোর্স দিয়ে। একের পর এক এনকাউন্টারে, যার বেশিরভাগ ফেক এনকাউন্টার, খুন করা হচ্ছে। মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি ছত্তিশগড়, বস্তার এখন অবরুদ্ধ। সেখানে সাধারণ মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত। মাওবাদী বলে স্থানীয় নিরীহ বাসিন্দা, বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিকদের কাছেও বস্তার এখন নিষিদ্ধ নগরী। ওই সব অঞ্চলে সিপিআই দলের কিছু কাজকর্ম ছিল। বলাই বাহুল্য তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে বস্তার, গরচৌলি, কাঁকের, দান্তেওয়ারা, অবুঝমাড় সম্পূর্ণ এক মিলিটারি স্টেট। কাশ্মীরের চেয়েও যার পরিস্থিতি এখন ভয়ংকর, অগ্নিগর্ভ।
মিডিয়ায় মিডিয়ায় প্রতিযোগিতা চলেছে কে কতজন মাওবাদী হত্যার এক্সক্লুসিভ নিউজ করতে পারবে তার। টিভিতে, কাগজে ছবি বের হচ্ছে ‘সন্ত্রাসবাদী’ মাওবাদীদের লাশের। সরকার প্রায় উল্লাসে মেতে জানাচ্ছেন, কবে কত মাওবাদীর মৃত্যু ঘটেছে। দিন দিন সংখ্যা বাড়ছে ২০, ২৬, ২৯, ৩০। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রায় ক্রিকেটের উত্তেজনায় পর্যবসিত হচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে সংখ্যা দিয়ে, মিলিটারি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে যে সব সমস্যার সমাধান হয় না সেটা কোনো দেশেই শাসকদের কোনোদিন বোঝানো যায় না। যদি ধরেও নিই, মাওবাদীদের ঘাঁটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। শেষ করা হলো মাওবাদীদের পিপলস্ লিবারেশন আর্মি। তা সত্ত্বেও কি মুছে ফেলা যায় একটি রাজনৈতিক চিন্তা, দর্শনকে! যতদিন দেশে গরিবি, বৈষম্য, হাহাকার, বিষাদ, বেকারত্ব, দুর্নীতি কোথাও না কোথাও থাকবে, ততদিন কোনো না কোনো নামে বামপন্থা ফিরে ফিরে আসবে।
মাওবাদ, দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সশস্ত্র ধারা। সে বিশ্বাস করে দেশের রাষ্ট্র কাঠামো বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উচ্ছেদ করতে। তার পথ নিয়ে আপনার হাজার ওজর আপত্তি থাকতে পারে। পথটি আজকের দিনে সম্পূর্ণ অচল, আপনি বলতেই পারেন। এ এক বাম হঠকারী লাইন, মনে হতেই পারে। কিন্তু এ কোনো আইসিএস বা তালিবানি জঙ্গিদের মতো মার্কিন মদদপুষ্ট হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসী সংগঠন বলা যাবে না। তার কারণ পৃথিবীর বহু দেশে মাওবাদী রাজনীতি আছে। ল্যাটিন আমেরিকা, ইউরোপ, মার্কিন মুলুক, এমনকি সবে সবে ক্ষমতায় আসা শ্রীলঙ্কার কমিউনিস্টদের মধ্যেও মাওবাদী রাজনীতির প্রভাব যথেষ্ট। ফলে এই লড়াইয়ে ওয়ার অন টেরর মোকাবিলা করার মতো রণকৌশল ভাবলে অমিত শাহরা ভুল করবেন।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবসময় নকশালবাদকে বিদ্রুপ করেন, হয়তো খুবই অপছন্দের এই মতবাদ সম্পর্কে চরম দক্ষিণপন্থি সংঘ পরিবারের এক ধরনের ভয় থাকতেও পারে। খোলা মনে দেখতে পারলে বুঝতেন, নকশালবাড়ি রাজনীতির উদ্ভব ও বিকাশ ভারতের আর্থসামাজিক কাঠামোর মধ্যেই। মাওবাদী রাজনীতি তো নকশালবাড়ির রাজনীতিই। যদিও দীর্ঘদিন ধরে মাও রাজনীতি চর্চা করে আমার মনে হয়েছে এ এক আদিবাসী বিদ্রোহ। ঠিক চেনা, ধ্রুপদী মার্কসবাদ নয়।
শ্রেণি রাজনীতি আছে। তবে তা আদিবাসী শোষণের মধ্যে। আসলে ভারতে অনেক ক্ষেত্রেই কাস্ট ইজ ক্লাস। দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের বড় অংশই, এদেশের সবচেয়ে বেশি শোষিত, বঞ্চিত। এ দেশে যত মুৎসুদ্দি পুঁজির বিকাশ ঘটেছে তত বিপদে পড়েছে আদিবাসী, দলিতরা। করপোরেট পুঁজির মৃগয়াভূমিতে পরিণত হয়েছে দেশের জল-জঙ্গল-জমি। বিরাট জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা এখন সরকারের ঘোষিত নীতি। হাজার হাজার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এই নীতির কারণে। বড় বাঁধ, ঝা-চকচকে রাস্তা, মহাসড়ক, বিরাট সেতু নির্মাণের নামে জমি অধিগ্রহণের জেরে কত লাখ আদিবাসী বাসভূমি, আয়ের উৎস হারিয়ে পথের ভিখারি হয়ে গেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। টুরিজমের নামে অত্যাধুনিক রিসোর্ট হয়েছে, আদিবাসী, দলিত পুরুষরা সেখানে ঝাড়ুদার, ভৃত্য হয়েছেন। আর মেয়েরা হয়েছেন পরিচারিকা। কখনো আবার বাবু মনোরঞ্জনের দায় থাকে আদিবাসী, দলিত মেয়েদের। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুললেই তাদের মাওবাদী বলে চিহ্নিত করে রাষ্ট্র নিপীড়ন নামিয়ে আনছে। আদিবাসী, দলিত, সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেই আরবান নকশাল বলে, অনেক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীকে জেলে পোরা হচ্ছে। রাষ্ট্র প্রতিবাদের মুখ বন্ধ রাখতে এমন এমন কালো আইন আনছে, যা ব্রিটিশ শাসনকেও লজ্জা দেবে।
মাওবাদী ঘাঁটি বলে চিহ্নিত এলাকা বিশাল। দ-কারণ্য। প্রাচীন এই জনপদের আদত সীমানা ভারতের একাধিক রাজ্যে বিস্তৃত। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, অন্ধ্র রাজ্যের এগারো জেলা মিলে দ-কারণ্য। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস এই এলাকার জঙ্গল পাহাড়ে। অজস্র নদী। তার মধ্যে প্রধান তিনটি গোদাবরী, প্রাণহিতা ও ইন্দ্রাবতী। বস্তার দন্ডকারণ্যের প্রাণ। মূলত গো- হলেও এখানকার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে মারিয়া, মুরিয়া, কো-মল, কন্দু, দোরলা, পরুজা প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম নয়। জীবিকা বলতে প্রধানতম বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও অরণ্য নির্ভরতা। খনিজ সম্পদ এখানে অফুরান। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বস্তার লগ্নি পুঁজির মৃগয়া ক্ষেত্র। চরম আদিবাসী শোষণের দৃষ্টান্ত জানতে আপনাকে একবার অন্তত বস্তার যেতে হবে। করপোরেট শোষণের গড় বস্তার। মাত্রা ছাড়া শোষণ ও বিপুল মুনাফার কেস স্টাডি হিসেবে কাছাকাছি এলাকার বাইলাডিলা খনি প্রকল্পের কিরণডুলকে বেছে নিতে পারেন, আদিবাসী এলাকাতেই আজ তাদের সংখ্যা মোটে দুই শতাংশ। জমি হারিয়ে আদিবাসী আজ ঠিকা শ্রমিক। মেয়েদের অনেককেই নব্য ঠিকাদার, মহাজন, কারখানার বাবুদের কাছে দেহ বেচতে হয়। এলাকার অন্তত একান্ন গ্রামের চল্লিশ হাজার অধিবাসী, খনির দূষণে কোনো না কোনো অসুখে আক্রান্ত।
বস্তার দন্ডকারণ্যের আদিবাসী বিদ্রোহের ইতিহাস বহু পুরনো। ১৮২৫ সালের পারলকোট বিদ্রোহের মহানায়ক গোন্দ সিংহের নেতৃত্বে আদিবাসী কৃষক বিদ্রোহ আজও বংশপরম্পরায় স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। এ ছাড়া ভুমকাল বিদ্রোহ, স্বাধীনতার পর স্থানীয় ভূ-স্বামীদের নেতৃত্বে আদিবাসী লড়াই, চারণদের গল্পগাথা, গানে আজও বেঁচে আছে। শোষণ, অত্যাচার যত বাড়বে তত শতাব্দীর পর শতাব্দী নতুন নামে, নতুনভাবে আদিবাসী, কৃষক বিদ্রোহ জন্ম নেবে। মাওবাদী কমিউনিস্টদের হত্যা করা যায়। কিন্তু কোনো দর্শনকে শেষ করা যায় না। ধ্বংসের মধ্যেই সে ঠিক ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম নেয়। তার কোনো গন্ডি, সীমান্ত, নির্দিষ্ট ভূগোল থাকে না। উগ্র জাতীয়তাবাদ দিয়ে কি আর আন্তর্জাতিকতাবাদকে ঠেকানো যায়!
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com