চট্টগ্রামের স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাস শুরু হয় মুঘল আমলে, যখন এ অঞ্চলটি বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব, বিশেষ করে মসজিদ, ইমারত এবং উদ্যান নির্মাণের কৌশলগুলো চট্টগ্রামের প্রাচীন স্থাপত্যের ওপর একটি গভীর ছাপ ফেলেছিল। এরপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চট্টগ্রাম শহর ক্রমশ নগরায়ণ এবং পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি নতুন মোড় নেয় যেখানে প্রশাসনিক ভবন, রেলস্টেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে এ সময় নির্দিষ্ট স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপত্য শিক্ষার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ দেশের প্রথম স্থাপত্য শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং এর প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে চট্টগ্রামে তখনো স্বতন্ত্র স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্থাপত্যে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঢাকা কিংবা খুলনা যেতে হতো। ১৯৯০-এর দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে স্থাপত্য শিক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে, চট্টগ্রামের ছাত্রছাত্রীরা স্থাপত্য শিক্ষার জন্য বাইরে চলে যেতেন। সে সময় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে স্থাপত্য শিল্পের চর্চা ও গবেষণায় একটি শূন্যতা বিরাজ করছিল।
চট্টগ্রামে এরপর স্থাপত্য শিক্ষার বড় পরিবর্তন আসে ২০১০ সালে, যখন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগ যাত্রা শুরু করে। এটি চট্টগ্রামের স্থাপত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। স্থাপত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠার পর থেকে, চট্টগ্রামে স্থাপত্য শিক্ষার মান অনেক উন্নত হয়েছে।
বর্তমানে স্থাপত্য বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চমানের শিক্ষা গ্রহণ করে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় আবাসন শিল্প এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণেও স্থপতিরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন।
চুয়েট পরিবেশবান্ধব নকশা এবং টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিয়ে সিলেবাস তৈরি করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্থাপত্য নকশা ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত দিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে পারেন। বিভাগটি শুধু প্রচলিত স্থাপত্য শিক্ষার ধারা নয়, বরং জ¦ালানি দক্ষতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেছে। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রিমিয়ার বিশ^বিদ্যালয়েও স্থাপত্য বিভাগ চালু হয়েছে এবং গড়ে উঠছে স্থপতি।
আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগের চট্টগ্রামের স্থাপত্য ভাবনা এবং চর্চা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল ঐতিহ্যবাহী এবং মূলত প্রথাগত নির্মাণ কৌশল ও উপকরণ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। তখনকার স্থপতিরা স্থানীয় জলবায়ু ও সামাজিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্মাণ করতেন।
অন্যদিকে, বর্তমান তরুণ স্থপতিরা স্থাপত্যচর্চায় বৈচিত্র্যময় এবং সমসাময়িক ধারণার ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা পরিবেশবান্ধব নকশা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং টেকসই নির্মাণ উপকরণের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কর্মসংস্থানের দিক থেকে স্থপতিরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসন প্রকল্প এবং রিয়েল এস্টেট সেক্টরে কাজ করছেন, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
লেখক : শিক্ষক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়