সিন্ডিকেট ভেঙে ইলিশ বাজারে আসুক

ইলিশ শুনলেই এখন মনে বিভিন্ন প্রশ্ন আসে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক প্রশ্ন হলো ইলিশ কি আমরা আর খেতে পারব না? বাঙালির ইলিশ নিয়ে প্রচুর আবেগ মিশে আছে। সেই আবেগ ক্রমশ ফিকে হয়ে হাহাকারে পরিণত হয়েছে প্রায়। কারণ ধীরে ধীরে ইলিশ জনমানুষের পাত থেকে সমাজের ওপরের তলার মানুষের রসনার মাছে পরিণত হয়েছে।

ইলিশ মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও লাগামহীন মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত, পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা এবং ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের অস্বাভাবিক মূল্যসহ বিভিন্ন কারণে এই মাছ নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা।      

এতদিন মাছের আড়তদাররা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে এসেছেন, উচ্চমূল্যের পেছনে বিভিন্ন যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই একই আড়তদার ও রপ্তানিকারকরা ভারতে বাংলাদেশের বাজারের তুলনায় কম দামে ইলিশ রপ্তানি শুরু করেছে। শীর্ষ একটি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানিকৃত ইলিশের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার বা ১ হাজার ১৮০ টাকা (৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি আকারের ইলিশ); অথচ ঐ একই আকারের ইলিশ মাছের আড়তে পাইকারিতে ১ হাজার ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে ভাবুন আসলে মাছ ব্যবসায়ীরা ইলিশের ওপর ভর করে আসলে কত টাকার মুনাফা করছেন।

এই লেখার মূল বিষয় আসলে ইলিশের দাম না। ইলিশ আসলে আমাদের সামনে অনেক বিষয় খোলাসা করেছে। প্রথমত, এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। ইলিশ জাতীয় মাছ হওয়া সত্ত্বেও এই মাছ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো নিয়ে ভাবলে এটি আরও স্পষ্ট যে, এই ব্যর্থতা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের। এই উচ্চমূল্যের অন্যতম কারণ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং চাঁদাবাজদের আধিপত্য। প্রচলিত ধারণা হলো সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। কিন্তু এখন তো অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। দেখা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারও সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। বাজার তদারকির উদ্যোগ নিলেও সেটি কাজ করছে না। পাইকার ও মহাজন পর্যায়ে কারসাজি চলছে কোনো বাধা ছাড়াই। আর এভাবে বেড়েই চলেছে ইলিশের দাম। সরকার কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও চক্রের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

দ্বিতীয়ত, ইলিশের দাম ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের দিকে ইশারা করে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উচ্চবিত্তের আয়ের পার্থক্য অনেক। একদিকে ইলিশের উচ্চমূল্য অনেকের জন্য তেমন সমস্যা নয়, অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ উচ্চমূল্যের কারণে ইলিশ কিনতে পারছেন না। তিন বছর আগেও আমি কারওয়ান বাজার থেকে কেজি কেজি ইলিশ কিনেছি, তবে গত তিন বছরে আমি একটি ইলিশও কিনতে পারিনি। আমার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও ১৭০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকা দরে কিনে ইলিশ খাওয়ার মতো অর্থবিত্ত নেই। এই বাস্তবতা বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের জাতীয় মাছের মূল্য ১৫০০ বা ১৭০০ টাকা হবে কেন? আর যদি তা হয়ই, তাহলে সেই মাছ দেশের জাতীয় মাছ হিসেবে বিবেচিত হবে কোন যুক্তিতে? এটি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুরবস্থার সঙ্গে প্রহসন আর কিছুই না। এছাড়া, ইলিশ ঠিক কী কারণে আমাদের জাতীয় মাছ এ বিষয়েও স্পষ্ট করে কারও কিছু জানা নেই। এমনকি ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে প্রশাসন ও গবেষণার দায়িত্বে থাকা দেশের প্রবীণ মৎস্য বিশেষজ্ঞরাও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ‘ইলিশ যেভাবে জাতীয় মাছ হলো’ শীর্ষক একটি লেখার তথ্যমতে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, ফল, ফুল, প্রাণীসহ নানা কিছু নির্বাচনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অধিকাংশই ইলিশকে জাতীয় মাছ করার পেছনে নির্দিষ্ট বা একক কোনো কারণের কথা নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করতে পারেনি। আর সে সময় তো ইলিশের দামও নাগালের মধ্যেই ছিল নিশ্চয়। এখন বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।

তবে, সাধারণ জ্ঞানে এটা স্পষ্ট যে, ইলিশকে জাতীয় মাছ হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম আমাদের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ ঐতিহ্য। আর যেহেতু ইলিশের স্বাদ অন্য যেকোনো মাছের থেকে অনেক বেশি, তাই এই মাছ জাতীয় মাছ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে প্রাধান্য পেয়ে থাকতে পারে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে এই মাছের পুষ্টিগুণ। কিন্তু, এত টাকা দিয়ে এসব পুষ্টিগুণস¤পন্ন মাছ বেশিরভাগেরই ক্রয়ের সামর্থ্য নেই।

এমন পরিবর্তিত বাস্তবতায় মনে সত্যি প্রশ্ন জাগে, জাতীয় মাছ পাঙাশ না হয়ে ইলিশ থাকবে কেন? যেহেতু সুস্বাদু ইলিশ উচ্চমূল্য নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের থেকে যত দূরে, সহজপ্রাপ্যতা ও কম দামের কারণে ঠিক ততটাই সাধারণের নিকটবর্তী হয়ে উঠেছে পাঙাশ।  ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদের সার্থকতা ইলিশের মধ্যে খুঁজে পাওয়া এখন অসম্ভব। বরং এমন একটি মাছ নির্বাচন করা উচিত যে মাছ সাধারণ মানুষ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য রাখে। যেমন ধরুন পাঙাশ মাছের কথা। বাজারে মাত্র দুইশ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় এই মাছ। প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই মাছ কিনে খেতে সক্ষম। তবে একটিই সমস্যা, এই মাছকে জাতীয় মাছ করলে সিন্ডিকেট এই মাছের দাম নিয়েও কারসাজি করতে পারে। সেক্ষেত্রে, সরকার বাংলাদেশে প্রায় যে ৭৩৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় সেগুলো থেকে যেকোনো একটি মাছ বেছে নিতে পারে। 

এই কথাগুলো একটু অভিমানের বশবর্তী হয়ে অথবা কিছুতা রসিকতার ছলে বললেও, এখন শুধু দুটি উপায় আছে। অন্তর্বর্তী সরকার বা পরবর্তী সময়ে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের এই সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। গভীর পানির সিন্ডিকেট ভেঙে ইলিশ বাজারে আসুক সাধারণের ক্রয়যোগ্য মূল্যে। আর যদি সেটি করতে না পারেন তাহলে দয়া করে আমাদের জাতীয় মাছ বদলে ফেলুন। জাতীয় মাছ খেতে না পারার মানসিক পীড়া বাংলাদেশি হিসেবে আর নিতে পারছি না।

লেখক : কলামিস্ট

malammohabbat@gmail.com