নির্বাচন হোক সংস্কারের পর

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই মাস পার হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী নানা অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও বেশ কিছু টানাপড়েন ও উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার নানা আলামত এখনো দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হয়নি। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং রাষ্ট্রের পুনর্গঠন অন্তত এ দুটি কাজ এই সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। এই কাজ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করার বন্দোবস্ত করতে না পারার ব্যর্থতা অর্থনৈতিক উন্নতি দিয়ে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করলে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। স্বাধীন বাংলাদেশে নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আরও একটি নাগরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কেন বাংলাদেশে বারবার গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে হয়? কারণ বাংলাদেশে রাষ্ট্র গঠনের আদিপাপের মীমাংসা না করেই এখানে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল আওয়ামী লীগের একক ইচ্ছায়। সেই আদিপাপটা হলো, স্বাধীন দেশের জন্য নতুন সংবিধান সভা/গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা সংবিধান প্রণয়ন এবং সেই সংবিধানের পক্ষে জনতার সম্মতি আদায় না করা। ফলে এক ব্যক্তির হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার মতো একটা সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে সত্তর সালে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে, সেই তারাই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশের সংবিধান সভায় বসে উকিলদের দ্বারা রচিত সংবিধান পাস করেছেন। স্মর্তব্য, ওই নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক কর্র্তৃপক্ষের এলএফওর অধীনে, যার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল পাকিস্তান হবে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন গঠনতান্ত্রিক সভার জন্য কোনো নির্বাচন হয়নি। এই সংবিধান সভা এবং জনগণের সম্মতি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী ক্ষমতা বন্দোবস্তের সংবিধান পাল্টানোর সুযোগ এসেছিল নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময়। তেমন আলাপও উঠেছিল। সেই আলাপ ও দাবিকে তথা গণ-অভ্যুত্থানকে স্রেফ ‘সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা’র দিকে নিয়ে গিয়েছিল তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী জোট। পতিত এরশাদের কাছ থেকে ক্ষমতা বুঝে নিয়েছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। মৃত্যুর আগ দিন পর্যন্ত সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বহাল তবিয়তে রাজনীতিতে ছিলেন।

ছাত্র-জনতার ওই বীরোচিত উত্থানকে অর্থবহ করে তোলার দায় এবং স্বৈরাচার উৎখাতকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল যাদের; সে সব রাজনৈতিক দলই এরশাদকে তাদের ভোটের রাজনীতির পুতুলে পরিণত করেছিল। ফলে স্বৈরাচার যায়, নানা মোড়কের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র থেকে যায়। রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। দর্শন ও আইনশাস্ত্রে গণ-অভ্যুত্থানকে ‘গাঠনিক মুহূর্ত’ (constituent moment) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ গণ-অভ্যুত্থান সেই মুহূর্ত, যখন জনগণ নামক ধারণা বাস্তব রাজনীতিতে হাজির হয় এবং গাঠনিক ক্ষমতার (constituent power) জোরে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে। তার মানে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম কাজ হচ্ছে রাষ্ট্র গঠন করা। বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায় একেই বলা হচ্ছে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’। নির্বাচনকে গণতন্ত্রের সমার্থক ভাবা গুরুতর রাজনৈতিক বিভ্রান্তি। নির্বাচন মাত্রই গণতন্ত্র নয়। ‘অনির্বাচিত’ সরকার মাত্রই অগণতান্ত্রিক নয়; ‘নির্বাচিত’ সরকার মানেই গণতান্ত্রিক নয়। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হলে নির্বাচন হচ্ছে সরকার বেছে নেওয়ার একটা পদ্ধতি মাত্র। কিন্তু রাষ্ট্রই যদি গণতান্ত্রিক না হয়; প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন না হয়ে সাংবিধানিকভাবে একক ব্যক্তির করতলগত থাকে, সে ক্ষেত্রে তা ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ ছাড়া আর কিছু হয় না। সুতরাং আগে রাষ্ট্র, পরে সরকার। ১৯৭২ সাল থেকেই অগণতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক মডেলের রাষ্ট্র জনগণের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। বাহাত্তর সালে একটা সুযোগ এসেছিল। সব পক্ষকে নিয়ে একটা গণপরিষদ গঠন করে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করার সুযোগ। তেমন দাবিও ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সত্তরের নির্বাচনের বিজয়ীদের দিয়েই স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন করেছে। ফলে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্ন অধরা থেকে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত গাঠনিক ক্ষমতার বলে জনগণ নিজেরা নিজেদের সংবিধান অর্পণ করে। এটা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার জিনিস নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের নজির (নব্বই) থাকলেও, সেই অভ্যুত্থানকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র নামে। ফলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা যায়নি। পুরনো অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই রয়ে গেছে। ক্ষমতার হাত বদলে হয়েছে মাত্র। তার মধ্যেও শাসক শ্রেণির দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা বন্দোবস্ত তৈরি করেছিল। সেটা ২০০৮ সাল পর্যন্ত ধুঁকে ধুঁকে কিছু দূর এগিয়েছিল। মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন (১৯৯৫-৯৬), লগি-বৈঠা (২০০৬), এক/এগারো (২০০৭-০৮) ইত্যাদি ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের নজিরবিহীন এক গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। আবারও আমাদের সামনে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। অন্যদিকে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষা তথা পুরনো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার শক্তিশালী অপচেষ্টাও লক্ষণীয়। এর মধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে। তারা সংস্কার, পুনর্গঠন কিছুই চায় না; স্রেফ (সংসদ) নির্বাচন চায়। রাষ্ট্রকে অগণতান্ত্রিক রেখে, পুরনো সংবিধানের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতার হাত বদল তথা ‘রেজিম চেঞ্জ’ করার জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত এক দফা : ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট শাসকের পতনই শুধু নয়; ক্ষমতায় গিয়ে নতুন নামে নতুন মোড়কে আর কেউ যেন ফ্যাসিস্ট হতে না পারে, সে জন্যই জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।

‘সংস্কার’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার। সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে তরুণদের সংস্কারের বাসনা এখনো লিপিবদ্ধ। সুতরাং আগে রাষ্ট্র সংস্কার/পুনর্গঠন হবে; সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধীনে সরকার বেছে নেওয়ার নির্বাচন হবে। রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক না করে নির্বাচনের দাবি জানানো মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে আইন প্রণয়নী সভাকে ‘সংসদ’ অভিহিত করা হয়। সংসদে সংবিধান পরিবর্তন/সংস্কার কিছুই করা যায় না। করলে তা অসাংবিধানিক হয়। যারা সংসদে গিয়ে সংবিধানে হাত দিতে চাইছেন, তারা এই মৌলিক পার্থক্য ধরতে পারছেন না।  সংবিধান প্রণয়ন করতে গণপরিষদ নির্বাচন আহ্বান করতে হয়। নির্বাচিত গণপরিষদে প্রণীত সংবিধানের অধীনে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বেছে নেওয়ার এটাই রেওয়াজ। এ পদ্ধতি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্র সম্মত। বাংলাদেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দল পুরনো ক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্য এতটাই উন্মুখ হয়ে পড়েছে যে, রাষ্ট্র, সংবিধান, গণপরিষদ, সংসদ, সরকার, নির্বাচন ইত্যাদির ভেদবুদ্ধি তারা গুলিয়ে ফেলেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনের স্তরে নেই; রাষ্ট্র সংস্কারের স্তরে রয়েছে। নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাথার মুকুট, কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনগণ নিজেদের জন্য গণতান্ত্রিক সংবিধান গ্রহণ না করে নির্বাচনের তোড়জোড় গণ-অভ্যুত্থানকে ‘আনডু’ করার শামিল। রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগে সংসদ নির্বাচনের দাবি ‘নির্বাচনী প্রতিবিপ্লব’ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

লেখক: সদস্য, জাতীয় নাগরিক কমিটি

gstusher10@gmail.com