দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রায় সবক্ষেত্রে। স্বৈরাচারী শাসনের সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলবাজি আর দুর্নীতির ফলে অযোগ্য ও অসৎ লোকে নানাক্ষেত্রে বোঝা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। স্বৈরাচার বিদায়ের পরও যার প্রভাব রয়ে গেছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সবক্ষেত্রেই অরাজকতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা এখনো অস্থির অবস্থায়। একই রকম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে প্রশাসনেও। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে বুধবার জানা গেছে, সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে সকালবেলা সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার পর ওইদিন বিকেলেই তা বাতিল করা হয়। একজন অতিরিক্ত সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব করার দুদিনের মাথায় তাকে করা হয় বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)। একইভাবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ থেকে শুরু করে অন্যান্য পদের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনায় প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া সচিবালয়ে চলছে অরাজকতা। নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে উপসচিবসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের হট্টগোল, হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রশাসনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বদলি, ওএসডি আতঙ্কে রয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। আতঙ্ক ও অস্থিরতায় শ্লথ হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা নানা রকম সুবিধা নিয়েছেন, তাদের অনেকেই বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলে পদ-পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিতদের তালিকায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা এখনো বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। পাশাপাশি পদ না থাকার পরও পদোন্নতি দেওয়ার ফলে মাথাভারী হচ্ছে প্রশাসন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একাধিক অতিরিক্ত সচিব ও উপসচিবের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীদের আধিপত্য রয়েছে। নিয়োগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা প্রভাব বিস্তার করছে। যাচাই-বাছাই না করে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যখন আপত্তি উঠছে, তখন আবার তা বাতিল করা হচ্ছে।
দুই দফায় দেশের ৫৯ জেলায় নতুন ডিসি পদায়ন নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে নজিরবিহীন হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের ‘সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের’ ডিসি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানান ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগের দুই যুগ্ম সচিবকে কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। কর্মকর্তাদের রোষ থেকে নিজেকে বাঁচাতে যুগ্ম সচিব আলী আযম পাশের রুমের টয়লেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সিনিয়র কর্মকর্তারা তাকে বের করেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভের মুখে নবনিযুক্ত ডিসিদের মধ্যে আটজনের নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ১৭ জন উপসচিবের মধ্যে আটজনের গুরুদন্ড, চারজনকে লঘুদন্ড এবং পাঁচজনকে তিরস্কারের সুপারিশ করেছে এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি। এই ধরনের অস্থিরতা সচিবালয়ের সর্বত্র বিরাজমান। মাঠ পর্যায়েও এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে কিন্তু সরকারের তরফ থেকে কোনো শক্ত বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর পর থেকেই আমলারা তাদের পদোন্নতি-বদলিসহ নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শৃঙ্খলারক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছেন। প্রায় প্রতিদিনই সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে ভিড় করছেন তদবিরকারী কর্মকর্তারা। অথচ আগের সরকারের নানা অপকর্ম বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও তাদের বেশিরভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসন ঠিক রাখার কেন্দ্রবিন্দুই এখন চরম টালমাটাল। ১৬ বছরের অরাজকতার জের টেনে প্রশাসন এখনো অস্থির। এই অস্থিরতা দ্রুত দূর করতে না পারলে অবস্থা আরও বেসামাল হয়ে যেতে পারে। সরকারকে কঠিন হাতে দ্রুত প্রশাসনে স্থিরতা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যেন কালক্ষেপণ না হয়।