৫৬ বছরের অপেক্ষা-আক্ষেপ

দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। আর অঞ্চলটির আগুনে পোড়া রোগীদের একমাত্র ভরসা হাসপাতালটির বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। তবে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখনো পূর্ণতা পায়নি সেটি। চিকিৎসক, শয্যাসহ নানা সংকটে কখনোই পুরোপুরি সেবা দেওয়ার অবস্থায় যায়নি ইউনিটটি।

সবশেষ একমাত্র চিকিৎসক চলে যাওয়ায় সেখানে চিকিৎসাসেবা চলছে নামমাত্র।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শেবাচিম বার্ন ইউনিটে ৩৫টি শয্যা থাকলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। তিন বছর আগে ঝালকাঠির অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকশ যাত্রীর বার্ন ইনজুরি হয়। ওই ঘটনার পর শেবাচিমের বার্ন ইউনিটে জোড়াতালি দিয়ে সেবা চালু হয়।

তবে ইউনিটে থাকা একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মারুফুল ইসলাম এক মাস আগে বদলির কারণে ঢাকায় চলে যাওয়ায় ইউনিটটি এখন কার্যত অভিভাবকহীন। বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর পুরো দায়িত্ব পড়েছে, যা রোগীদের জন্য অপ্রতুল।

হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ঘুরে দেখা যায়, এখানে নেই পর্যাপ্ত এসি বা কার্যকর ফ্যানের ব্যবস্থা। অনেকেই বাড়ি থেকে ফ্যান নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিচ্ছন্নতার অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপে জমে আছে।

সম্প্রতি সেখানে দেখা যায়, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস গ্রামের দেড় বছরের শিশু আবদুল্লাহ আল আরাফ গরম পানিতে ঝলসে গিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে সেখানে। তার অভিভাবক শামিম হোসেন বলেন, ‘সন্তানকে নিয়ে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালে আছি, অথচ কোনো ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় সংকটের মধ্যে পড়েছি।’

ভুক্তভোগী রোগীর স্বজন রাসেল বলেন, ‘ওয়ার্ডে এমন অবস্থায় চিকিৎসা নেওয়া এক ধরনের ভোগান্তি। এখানে রোগীদের পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপত্তা কিছুই নেই। আমরা প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি, কখন কী ঘটবে!’

ভুক্তভোগী রোগীর আরেক স্বজন শহীদ অভিযোগ করে বলেন, ‘এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়ার্ডে কোনো এসি চলে না, ফ্যানের অবস্থাও খারাপ। আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়।’

ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সেবিকা বলেন, ‘আমরা সব সময় পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারি না। আয়া বা ওয়ার্ডবয় থাকে না, রোগীদের অনেক সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। আমাদের পক্ষেও রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী সবকিছু মেটানো সম্ভব নয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেবাচিম বার্ন ইউনিটের এই অবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা-সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে প্রতিনিয়ত রোগীরা ঢাকার দিকে ছুটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আকাক্সক্ষা থাকলেও অনেকেই ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে পেরে উঠছেন না। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচাতে, শেবাচিম বার্ন ইউনিটের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. রেজওয়ানুর আলম বলেন, ‘বার্ন ইউনিটসহ বেশ কিছু বিভাগের চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, বরিশালের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট নির্মাণের জন্য দশতলা ভবনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেটি পাস হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে আর ঢাকায় যেতে হবে না।’