পশতুনদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বপ্ন তার দুচোখে

পাকিস্তানে গত কয়েক সপ্তাহের আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পশতুন জনগোষ্ঠীর জাগরণ। দেশটির উত্তর-পশ্চিমের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলের প্রধানতম জনগোষ্ঠী পশতুনরা সম্প্রতি ‘পশতুন কওমি জিরগা’ আহ্বানের পর ইসলামাবাদের শাসকদের অন্দরে জোর আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় সরকার জিরগা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে আয়োজক সংগঠন ‘পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট (পিটিএম)’ তথা ‘পশতুন সুরক্ষা কমিটি’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ, প্রদেশটির জামরুদ শহরে গত বুধবার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। এসবের মধ্যে প্রাদেশিক শাসক পাকিস্তান তেহরিক ইনসাফ (পিটিআই) দলের সরকার এবং সামরিক সমর্থনপুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছিল। ঘটনাচক্রে দেখা যাচ্ছে, পিটিআই সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের শাসকের রাজনৈতিক বিবাদ থাকলেও জিরগা ঠেকানোর প্রশ্নে তারা একাট্টা ছিল। শেষমেশ স্বল্প পরিসরে কোনোমতে  আয়োজনটি সেরে ফেলা হয়েছে।

পশতুনদের স্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাব নতুন করে চাঙ্গা হওয়ার নেপথ্যে পিটিএমের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী সমালোচনা করেছে। প্রকৃতপক্ষে, জিরগা যেভাবে ঐতিহ্য-পরিচয়গত সত্তা থেকে রাজপথে প্রতিবাদের অস্ত্রে পরিণত হলো, তা গত এক দশকের রাজনৈতিক বিবর্তনের চেহারারই ফল। আর পশতুনদের গোত্রে গোত্রে এই অবিস্মরণীয় ঐক্যের পেছনে এক তরুণ নেতার ভূমিকা আলোচিত হচ্ছে। এই তরুণের নাম মঞ্জুর আহমাদ পাশতিন। নিজেকে নিছক একজন নাগরিক অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন মঞ্জুর। মাথায় পশতুনদের লাল-কালো রঙের ঐতিহ্যবাহী ‘পাশতিন ক্যাপ’ তথা ‘মাজারি টুপি’ পরিহিত এই তরুণ ওয়াজিরিস্তানের সর্বত্র মনোযোগ কাড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সরব পদচারণা। শুধু ওয়াজিরিস্তান নয়, পাকিস্তানের লাখ লাখ তরুণ সমাজমাধ্যমে তার অনুসারী। ১১ অক্টোবর শুক্রবার থেকে ১৩ অক্টোবর রবিবার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা যে জিরগা, সেই আয়োজন সফল করতে দুর্গম ওয়াজিরিস্তানের উত্তর-দক্ষিণের মাঠে-ঘাটে, পাহাড়ি উপত্যকার কোনায় কোনায় ছুটে বেড়িয়েছেন মঞ্জুর ও তার সহযোগীরা। ওয়াজিরিস্তানে যেন উল্কার গতিতে উত্থান হয়েছে ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণের, যাকে নিয়ে বিস্তর অস্বস্তি দেখা যায় পাকিস্তানের প্রভাবশালী ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ তথা সামরিক বাহিনীর কর্তাদের মধ্যে।

যতদূর জানা যায়, পিটিএমের শুরুটা মঞ্জুরের গ্রাম থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ওয়াজিরিস্তানে বহুজাতিক বাহিনীর যুদ্ধ (ওয়ার অন টেরর) এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের সময় বেসামরিক বসতিতে অসংখ্য স্থলমাইন পোঁতা হয়, যার ভুক্তভোগী ছিল মঞ্জুরের গ্রাম ‘মেহসুদ’। মেহসুদ গোত্রের বসতির সুরক্ষার দাবি জানিয়ে ২০১৪ সালে ‘মেহসুদ তাহাফুজ মুভমেন্ট’ নামের নাগরিক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়, যার নেপথ্যে ছিলেন মঞ্জুর ও তার আট বন্ধু। খাইবার পাখতুনখোয়ার ডেরা ইসমাইল খান অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া সংগঠনটির নাম বদল হয় ২০১৮ সালে, যখন করাচি শহরে নাকিবুল্লাহ মেহসুদ নামের এক পশতুন তরুণকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। সেই থেকে মঞ্জুরের সংগঠন গোটা পশতুন জাতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পান। স্কুলশিক্ষক বাবার সন্তান মঞ্জুরের বড় চাচা আলি খান মাসুদ পশতুন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। তিনি পুরোধা তাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও রাজনীতিক। পশতুন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিএসডিপি) প্রধান আলি খান পাকিস্তান ও আফিগানিস্তানের মধ্যকার ঔপনিবেশিক ডুরান্ড লাইনকে মানেন না। পশতুন জাতীয়তাবাদের প্রবল সমর্থক আলি খান তার জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের  কথা বললেও মঞ্জুর সবসময়ই পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাছে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তার কওম বা জাতির জন্য সুরক্ষা চেয়ে এসেছেন। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত কর্র্তৃপক্ষ ওয়াজিরিস্তানে যেসব গুম, খুন, নির্যাতন চালিয়েছেন, সে সবের বিচার চান তিনি এবং এসব অপরাধ ঘটার প্রশ্নে স্থায়ী সুরাহা চায় তার সংগঠন। সর্বোপরি, পশতুনদের ওপর যাবতীয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করতে তিনি সোচ্চার কণ্ঠস্বর। এদিকে পাাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী তাকে কখনো বলছে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী, আবার কখনো বলছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আঁতাতকারী। মঞ্জুরের ডাকে এত তরুণ ও সাধারণ মানুষ কেন সমবেত হলো, তার উত্তর নিহিত রয়েছে গত প্রায় আড়াই দশক ধরে পাহাড়ি জনপদের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে। এই এলাকার মানুষ শুধু যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, তা নয় বরং কখনো পাকিস্তানি তালেবান টিটিপি, কখনো আল-কায়েদা, কখনো-বা আফগান তালেবানের মতো জিহাদি সংগঠনগুলোর রোষানলে পড়েছে। জিহাদি গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যখানে পড়ে বসতিহারা হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। আড়াই দশকের সহিংসতায় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে দুই পাশের পশতুন জনপদে। বলাবাহুল্য, মঞ্জুরের পরিবারকে গত দশকে কয়েকবার ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে। বছরের পর বছর এসব অস্থিরতাই পিটিএমের বিস্তারের কারণ। মঞ্জুরের এতটা বিপুল গ্রহণযোগ্যতার পেছনের কারণ হলো জনগোষ্ঠীর মধ্যে তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা। তা ছাড়া একদম স্বল্পবয়সী কোনো নেতার মুখ থেকে নিঃসৃত জাতিবাদী অধিকারবোধের রোমান্টিকতা তরুণদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে পশতুনদের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারাটা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবাবেগ তৈরি করেছে। জিরগা সে রকমই একটি ঐতিহ্য, যাকে আঁকড়ে ধরেছেন মঞ্জুরের সহযোগীরা। ঐতিহ্যগতভাবে অবিভক্ত পশতুন জনপদ (আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমানা বিভক্তি পশতুনদের আলাদা করেছে) নিজেদের সমস্যা-সংকট নিয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানে পৌঁছত। ব্রিটিশ শাসন এবং উপনিবেশোত্তরকালে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে ওয়াজিরিস্তানে এবং সীমান্তের ওপারে জিরগার ঐতিহ্য জৌলুশ হারালেও টিকে ছিল। ডুরান্ড লাইন বরাবরই এই মহামিলনের সামনে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও সরকার জিরগার ঐক্যকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি, যখন পশতুন গোত্রগুলোর নেতারা ইতিপূর্বের জিরগা জলসা থেকে পাকিস্তান সরকারের নিপীড়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এবারের জিরগার আগেও ওয়াজিরিস্তানের প্রান্তে প্রান্তে আওয়াজ উঠছিল, ব্রিটিশ শাসনের পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ওপর হওয়া সব বঞ্চনার হিসাবনিকাশ করতে চায় তারা। স্বভাবতই মঞ্জুর পাশতিন এই নয়া জাগরণের নেতা হয়ে ওঠায়, তিনি এখন চক্ষুশূল।

গোমাল ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর অফ ভেটেরিনারি মেডিসিন ডিগ্রি সম্পন্ন করা এই তরুণ ২০১৭ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হন। সেবার একদিন পরই ছাড়া পান। এ সময় সামরিক বাহিনীর নির্দেশে তার পরিবারের সদস্যদেরও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০২০ এবং ২০২১ সালে পরপর দুবার গ্রেপ্তার হন। সর্বশেষ তাকে ২০২৩ সালে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ কয়েকদিন পর পেশ করা হয় আদালতে। মঞ্জুরের মতো আরও তরুণদের এই আপসহীন মনোভাবই তাদের গ্রহণযোগ্যতার কারণ। এর মধ্যে নতুন এক জটিলতা তৈরি হয়েছে, সীমিত পরিসরে আয়োজন সেরে ফেলতে  বলা হয়েছে, কিন্তু  মঞ্জুরের অংশগ্রহণ আটকে দেওয়া হয়েছে। পশতুনদের মধ্যে পিটিএমের গ্রহণযোগ্যতার পেছনে আরও যে প্রেক্ষাপটটি কাজ করেছে, তা হলো খাইবার পাখতুনখোয়ার রাজনীতিতে পাহাড়িদের সংকট ও আকাক্সক্ষা অস্বীকারের প্রবণতা। ইসলামাবাদের তখতে যারা বসেছেন, তাদের কারও সেই ক্ষমতা ছিল না যে সামরিক বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে সংকট সমাধান করবে। পিটিআই পশতুন স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানোর যে ভান করত, তা এখন উন্মোচিত। কেন্দ্রীয় সরকার যখন জিরগা ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী পিটিআই নেতা আলি আমিন গান্দাপুর  সায় দিয়েছেন। আবার পশতুনদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) প্রতিও মানুষের আস্থা ক্রমহ্রাসমান। সব মিলিয়ে পাঞ্জাবি জনগোষ্ঠী প্রভাবিত কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে পিটিএমের তরুণ আন্দোলনকর্মীরা চাঁছাছোলা ভাষায় যেভাবে আক্রমণ করেন, তা স্বাগত জানাচ্ছে ওয়াজিরিস্তানের পাহাড়ি মানুষরা। কারণ পাকিস্তানে বালুচিস্তানের পর সামরিক বাহিনীর নিষ্পেষণের প্রত্যক্ষ শিকার এ অঞ্চল।

দুই দেশের পশতুনদের মধ্যে মেলামেশাকে সন্দেহের চোখে দেখা পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এবং ইসলামাবাদের শাসকরা মনে করে, সীমান্তের ওপার থেকে টিটিপির মতো জিহাদি গোষ্ঠী পশতুনদের অবাধ যাতায়াতের মধ্যে সুযোগ নিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এখন শুধু সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে সীমিত নেই। তারা পিটিএমের তৎপরতায় বিচ্ছিন্নতা এবং জাতিগত বিভাজনের গন্ধ পাচ্ছে। যেমন জামরুদে পিটিএম কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি অভিযোগ করেছেন, পিটিএমের কর্মকাণ্ড দেশের মধ্যে ‘এথনিক ডিভিশন’ তৈরি করছে। তার এমন শঙ্কা প্রকাশের পর অনেকে হয়তো কৌতুক করে প্রশ্ন তুলবেন, ‘পাকিস্তানি’ বলে আদৌ কোনো ‘এথনিসিটি’ রয়েছে কি না?

লেখকঃ অনুবাদক ও লেখক

musfikur.muzahid1993@gmail.com