দুর্নীতিসংস্কৃতি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সময়মতো নড়েচড়ে বসে। অনেকটা হাইবারনেশনের মতো। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর, তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। নতুন সরকার গঠিত হলে দেখা যায়, তারা একের পর এক দুর্নীতির তথ্য উদঘাটন করছেন। এমনকি সরকার চলমান থাকতেই প্রকাশ পায়, বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের বিভিন্ন ঘটনা। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নামও জানা যায়। তারপর? অধিকাংশই ভুলে যান সেই দুর্নীতির তথ্য। ঠিক এই সুযোগে ক্রমাগত চলছে একের পর এক দুর্নীতি। যেহেতু কোনো শাস্তি নেই, সেহেতু ক্ষমতা পেলে অধিকাংশই ইচ্ছামতো দুর্নীতি করেন। এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ কাজ করে না।

এবারও অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আলোচিত দুই ডজন সাবেক শীর্ষ আমলা, মন্ত্রী, এমপি, ব্যবসায়ী ও পুলিশের অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে সংস্থাটি।  ইতিমধ্যে তাদের সম্পত্তি, নামে-বেনামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ খোঁজ নিচ্ছে। সরকারের ৭০ জনের বেশি মন্ত্রী-এমপি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তা এই পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলের মধ্যে ১৪ বছরে শুধু সড়ক ও মহাসড়ক প্রকল্পের নির্মাণকাজেই ২৯ হাজার কোটি  থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে ধারণা পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। আর অন্য সেক্টরের অবস্থা বিস্তারিত বলার কিছু নেই। এভাবে একটি গরিব দেশের  লাখ লাখ কোটি টাকা দুর্নীতি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে রবিবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে- মহাজোট সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক শপথ নিয়েই বলেছিলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেট ভাঙতে চান। কিন্তু জানা যাচ্ছে- ওই সময় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের জন্য দুই কোটি টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন মন্ত্রী। এ ছাড়া কলেজের আসন বাড়াতে তাকে দিতে হতো আসনপ্রতি ২০ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে ডা. রুহুল হক যখন দায়িত্ব নেন, তখন দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ছিল ৪০। যখন মেয়াদ পূর্ণ করেন, তখন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫। অর্থাৎ এক মেয়াদেই তিনি ২৫ মেডিকেলের অনুমোদন দেন। শুধু তাই নয়, একই সময়ে বেসরকারি সাতটি ডেন্টাল কলেজও অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মানে তিনি মোট কত টাকা একটি খাত থেকেই আত্মসাৎ করেছেন? এর বাইরে রয়েছে শত শত নেতা, মন্ত্রী, আমলা, সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ। তাহলে মোট কত টাকা হয়! সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগ এবং উচ্চপর্যায়ের অজানাতে এই দুর্নীতি হয়েছে, কোনোভাবেই তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিচার হয়নি।

দুর্নীতিসংস্কৃতি আমাদের রক্তের মধ্যে মিশে গেছে। রাজনৈতিক সরকারের আমলে নখদন্তহীন বাঘ বনে যাওয়া দুদক হঠাৎ গর্জন শুরু করেছে। পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকার সন্ধানের কথাও বলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিগত সরকারের অন্তত ৬৯ মন্ত্রী-এমপির অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কমপক্ষে ২৯ জনের সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য ২ বছর আগে থেকেই সংস্থাটির  গোয়েন্দা শাখায় পড়ে ছিল। তখন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার পতনের পর এসব ফাইল সামনে এনে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে কমিশন।  

যারা দুর্নীতিতে জড়িত, তাদের আত্মশুদ্ধি দরকার। কঠোর করতে হবে আইনের প্রয়োগ। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শুদ্ধাচারসহায়ক আমূল পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অর্থ ও দুর্র্বৃত্তায়ন থেকে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন তার সীমারেখা থেকে বের হতে না পারলে, কোনোভাবেই প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতির ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন ‘দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন দেশ। সব সংস্কারের পর নির্বাচন।’ আসলে একটি সমাজ এ রকম মহা দুর্নীতিসংস্কৃতিতে ডুবে থাকলে, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এনে জনগণের কী লাভ?