পশ্চিমা নির্বাচনে ডিপফেক ও সফটফেক

প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য নির্বাচনী প্রচারে প্রাধান্য পাচ্ছে ডিপফেক ও সফটফেক। সম্প্রতি ইউরোপ-আমেরিকার নির্বাচনে এ প্রবণতা দেখা গেছে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

এর আগে ভারতের নির্বাচনে দেখা দিয়েছিল ডিপফেক-এর প্রাদুর্ভাব। এখন যা মহামারী আকারে শুরু হয়েছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মহামারী আকার ধারণ করছে এই ডিপফেক। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নেতারা নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ডিপফেক ছবি ও ভিডিও প্রচার করছে। এ নিয়ে রবিবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডয়েচে ভেলে। তাদের প্রতিবেদন শুরু হয় এভাবে, ‘একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা শার্ট পরা এক নীল চোখের স্বর্ণকেশী ব্যক্তি তার ব্যালট পেপার পরীক্ষা করছেন। একই ভিডিওর আরেকটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, একদল পর্দানশীন নারী রাস্তায় হাঁটছেন। এই ভিডিওটি নির্বাচনের আগে পূর্ব জার্মান রাজ্য ব্র্যান্ডেনবার্গে অতি-ডানপন্থি এএফডি পার্টির এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়। ভিডিটিও প্রায় ৯ লাখ বার দেখা হয়েছে।’ তারা বলছে, ভিডিওগুলো ভীতিকর ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বিপরীতে সামান্য একটি সমাধান দেখিয়ে জনগণের আবেগকে দোলা দেয়। ভিডিওতে দেখানো কোনো চরিত্র বা কোনো বিষয় বাস্তব নয় ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের ভিডিও দ্রুত তৈরি করা যেতে পারে এবং এটি সস্তা ও সহজ। অন্যান্য আরও বিস্তৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিডিওর তুলনায় এসব ভিডিও যে নকল তা শনাক্ত করা বেশ সহজ। কিন্তু যদি তা-ই হয়, তাহলে কেন এগুলো তৈরি করা হলো? ডয়েচে ভেলে ফ্যাক্ট চেক তথাকথিত নকল ভিডিওগুলো পরীক্ষা করে দেখেছে। তারা বলছে, ডিপফেকে কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি এবং নড়াচড়া এত ভালোভাবে অনুকরণ করা হয় যে, তারা আসল না নকল তা বুঝতে ভুল হতে পারে। কিন্তু সফটফেক ভিডিও লুকানোর চেষ্টা করে না যে তারা কম্পিউটারে তৈরি।

সফটফেক

ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক নির্বাচনী প্রচারণায় এ ধরনের সফটফেক ক্রমশ ব্যবহার হচ্ছে। ইউরোপীয় নির্বাচনের জন্য তৎকালীন এএফডি প্রধান প্রার্থী ম্যাক্সিমিলিয়ান ক্রাহ তার টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রচুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছবি পোস্ট করেছিলেন। এসব ছবিতে দেখানো মানুষরা কেউই আসল নয়। ফ্রান্সেও ইইউ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে এ ধরনের সফটফেক ছবি ও ভিডিও ব্যবহার দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এআই চিত্র তৈরি করেছে মূলত মানবিক আবেগকে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে। নির্বাচনী প্রচারের সময় সব ফরাসি দলের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিয়ে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অতি ডানপন্থি দলগুলো এ ধরনের সফটফেক ব্যবহারে এগিয়ে ছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে আচরণবিধিতে এ ধরনের ছবি বা ভিডিও শনাক্তে দলগুলো সম্মত হলেও, একটি ছবিকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উৎপাদিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে উৎপাদিত বিষয়বস্তু বিষয়ে আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল যে, দলগুলোকে বিভ্রান্তিকর বিষয় তৈরি, ব্যবহার বা প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। তারপরও দ্য প্যাট্রিয়টস, ন্যাশনাল র‌্যালি এবং রিকনকুয়েটের মতো দলগুলো এ ধরনের বিষয়বস্তু ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। তবে সেগুলো কৃত্রিম উপায়ে তৈরি বলে চিহ্নিত করা যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেও এ ধরনের ছবি দেখা গেছে। প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন নারীর ছবি পোস্ট করেছেন, যা দেখতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসের মতো। কৃত্রিম ওই নারীকে দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট নেতার মতো পোশাক পরা এবং জনতাকে সে সম্বোধনও করছে সেই ভঙ্গিতে। যা কমলা হ্যারিসকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করার একটি চক্রান্ত। ডয়েচে ভেলে বলছে, এ ধরনের ছবির সমস্যা হলো তা ভুল তথ্য বা ভুয়া খবরের বাইরে অন্য রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করে। জনগণের সামনে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে। কমলা হ্যারিসকে কমিউনিস্ট হিসেবে প্রচারের কারণে অনেকে তার প্রতি বিরূপ হয়ে উঠতে পারে। ভোটার কমে যেতে পারে কমলার। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিস্ট বিরোধী ভোটারই বেশি। এভাবে একটি কৃত্রিম ছবি বাস্তব ঘটনার চেয়েও গুরুতর হিসেবে চিত্রিত হয়।

অস্বস্তি ও ঝুঁকি

ডয়েচে ভেলে এ বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান চালিয়েছে। তারা জানতে চেয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ভিডিওকে বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা হয় শুধু বিষয়বস্তুর কারণে? যেমন ১৯৭০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা রোবটের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান করে। জাপানি রোবটিক্স প্রকৌশলী মাসাহিরো মোরি তখন বলেছিলেন, এসব রোবট যত বেশি আচার-আচরণে মানুষের কাছাকাছি হয়, এটি তত বেশি লোমহর্ষক হয়ে উঠবে। জার্নাল অব মিডিয়া সাইকোলজির প্রধান সম্পাদক এবং সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির নিউহাউজ স্কুল অব পাবলিক কমিউনিকেশনের সহযোগী অধ্যাপক বলছেন, বিষয়টি আসলে আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, কারণ আমরা যা মনে করি এবং আমাদের সামনে যা আছে তার মধ্যে সত্যতা নেই। আমরা এ অস্বাভাবিকতা তখন অনুভব করি যখন আমরা জানি এটি ভুল।

ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন দ্য ইনফরমেশন এনভায়রনমেন্ট-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি ফিলিপ হাওয়ার্ড মনে করছেন, নির্বাচনী প্রচারে ডিপফেক ও সফটফেকের ব্যবহার বাড়ছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণার জন্য তারা ৬০টিরও বেশি দেশের ৪০০’র বেশি গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিশ্বাস করে যে, এআই উৎপন্ন ভিডিও, কণ্ঠ, ছবি এবং লেখা বিশ্বব্যাপী তথ্য পরিবেশনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। অর্ধেকের বেশি বিশ্বাস করে যে, এই প্রযুক্তি আগামী পাঁচ বছরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের স্ব-নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম করা উচিত। এখন এআই সংস্থাগুলো নিজেদের অডিট করছে। তবে তারা তাদের নিজস্ব হোমওয়ার্ক করছে। কিন্তু স্বাধীন যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে তাদের এ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। যদি আমরা স্বাধীন তদন্তকারী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদরা মিলে এ তৎপরতা নিয়ে কাজ করতে পারি, তাহলে একটি ভালো সমাধান আসবে।

যেভাবে শুরু

গবেষকরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিস্তার শুরু একটি দাবা খেলা থেকে। ১৯৯৭ সালে আইবিএম কম্পিউটার ‘ডিপ ব্লু’র সঙ্গে ওই খেলায় লড়েছিলেন গ্যারি কাসপারভ। ওই ম্যাচ নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই হয়েছিল। ‘ডিপ ব্লু’র কাছে সেবার হার মানতে হয়েছিল ‘দাবার ঈশ্বর’কে। প্রথমবার কাসপারভ জিতলেও হেরে যান পরের দুটিতে। বাকি তিনটি ড্র হয়। সেই থেকে যন্ত্র মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে বলে শঙ্কা শুরু হয়। এরপর পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র ২৭ বছর পার হলেও ‘যন্ত্র’ অভিনব সব পদ্ধতিতে মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এমনকি রাজনীতিতেও যন্ত্র হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রচুর পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। যে কারণে তারা শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষত ২০২২-এর শেষে চ্যাটজিপিটি ছিল নতুন অগ্রগতি। এর মাধ্যমে একেবারে সাধারণ কাজেও এআইর ব্যবহার বিস্তৃতি পায়। যে কোনো ব্যবহারকারীর সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। এই এআই ব্যবহারকারীর মনোভাব সংরক্ষণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে যার মাধ্যমে সে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ এবং ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তুলতে থাকে। এখন দেখা যায় যে, মাত্র কয়েক বছরে অনলাইনের ছবি, লেখা, ভিডিওর বড় একটি অংশ কৃত্রিমভাবে তৈরি হচ্ছে। আর এর ফলে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে রাজনীতির পরিসরেও। নির্বাচনে এই এআই কতভাবে যে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, তা আতঙ্ক তৈরি করছে রাজনীতিকদের মনে।

আরও জটিল বিষয় হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়াকে দায়ী করছে পশ্চিমা দেশগুলো। তারা বলছে এ দুই দেশ তাদের নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ও বিকৃত ছবি-তথ্য প্রচার করছে। যার মধ্য দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করছে তারা। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় এখনো অজানা। অনেকটা মহাশূন্যের মতো এই মহা-অন্তর্জালিক দুনিয়ার দখল নিয়ে ঠান্ডা লড়াইয়ে যুক্ত পরাশক্তিগুলো। ডিপফেক বা সফটফেক প্রযুক্তির এ লড়াই কতদূর আগাবে তা নিয়ে তীব্র শঙ্কা রয়েছে। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও তাই অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই তৈরি করা ছবি বা লেখা দিয়ে মিথ্যা তথ্য বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। ট্রাম্পের ছবিগুলো এআই উৎপাদিত বিষয়বস্তু কীভাবে জনমতকে চালিত করতে বা ব্যক্তিকে অসম্মান করতে পারে তার সর্বশেষ উদাহরণ। এর আগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চলে। তার বিকৃত ছবি ও ভাস্কর্য তৈরি হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশে এ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনেও এ নিয়ে কথা উঠেছে। ইইউর সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইএনআইএসএ বলেছে, এআই চ্যাটবট, ডিপফেক এবং অনুরূপ প্রযুক্তির বৃদ্ধি ঘটেছে। ইউরোপে সাইবার নিরাপত্তা হুমকি আছে। সরকার এবং বেসরকারি খাত, বিশেষ করে মিডিয়ার আগামী বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে উচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে অনলাইনে এআই উৎপাদিত বিভ্রান্তিকর তথ্য খুঁজে বের করা যায়। গুজবে উড়িয়ে দেওয়া যায়।

এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ‘ওপেন এআই’র প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছিলেন, তিনি উদ্বিগ্ন যে, কিছু লোক ভোটারদের বিভ্রান্ত, প্ররোচিত করতে এআই ব্যবহার করতে পারে। বেশ কিছু এআই মডেল বাজারে এসেছে। এআই কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠন হওয়া প্রয়োজন।