বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হয়েছে গত আগস্ট মাসে। জুলাই-আগস্ট মাসে অসংখ্য শিক্ষার্থী-সাধারণ মানুষ নিহত-আহত হয়েছেন। দেশব্যাপী যারা শহীদ হয়েছেন, এরই মধ্যে তাদের নামের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। জানা যাচ্ছে, দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতায় মোট ১৫৮১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩১ হাজারের বেশি মানুষ। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তবে এটি চূড়ান্ত তালিকা নয়। তালিকা প্রণয়নের কাজে সহায়তা প্রদান করেছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, রেড জুলাইসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তিরাও তথ্য প্রদান করে সহযোগিতা করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রত্যেক পরিবার এককালীন ৫ লাখ এবং আহত প্রত্যেক ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে পাবেন। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার খরচ দেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া।
কয়েকদিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহতদের মধ্যে ৩০ জনের প্রত্যেকের হাতে ১ লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। চেক হস্তান্তরের সময় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ উপস্থিত ছিলেন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধসহ আহত অনেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন, যারা এখনো কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। ফলে তারা অসহায়ের মতো অপেক্ষায় আছেন আর্থিক সহযোগিতা ও উন্নত চিকিৎসার। এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে চোখ, মুখ, কপালসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগা আবদুল্লাহ আল বাকী মিঠু এখন আর দেখতে পাচ্ছেন না বাম চোখে। অভাবের সংসারে চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার চিকিৎসা। শরীরের বিভিন্ন অংশের গুলি বের করা গেলেও আটটি বুলেট এখনো চোখ, মুখ ও কপালে রয়ে গেছে।
মিঠু নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের হাটগোবিন্দপুর এলাকার কৃষক আব্দুল খালেকের ছেলে। সিরাজগঞ্জের বেতিন বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি হাসপাতালে সিটিস্ক্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মিঠুর মতো এ রকম সাধারণ মানুষ এবং শত শত শিক্ষার্থী আহত অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে রয়েছেন। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এরই মধ্যে একটি ফাউন্ডেশন গঠন করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না। কীভাবে পর্যাপ্ত তহবিল তৈরি হবে এবং সহায়তা কার্যক্রম চলবে, তাও অনেকে জানেন না। সরকারের উপদেষ্টাদের আন্তরিক ধন্যবাদ এই কারণে যে, তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। এরইমধ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর খোলা হয়েছে। যার নম্বর- ১৬০০০। আহত এবং নিহত পরিবারদের যেকোনো ধরনের আইনি ও আর্থিক সমস্যা জানানোর জন্য এই হটলাইনে ফোন দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আন্দোলনে গুরুতর আহতদের উন্নত, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক রোগী আছেন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। একইসঙ্গে আন্দোলনে আহতদের এককালীন ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন ও আহত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ বিবেচনা করতে হবে। যদি দেশের বিভিন্ন বিভাগে হেল্পলাইন খোলা হয়, তাহলে আরও ভালো হয়। জেলা, উপজেলা, গ্রামে যারা আহত হয়েছেন, যারা বিভিন্ন হাসপাতালে রয়েছেন, তাদের তথ্য বিভাগ থেকে সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয়ভাবে দেশব্যাপী চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত প্রকাশ করে তাদের সুচিকিৎসার ভার সরকারের নেওয়া দরকার। আমরা আশা করব, এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।