অপরাধীর অভাবে একে একে বন্ধ হচ্ছে নেদারল্যান্ডসের কারাগার। অন্য দেশগুলোতে কেন এমন হচ্ছে না। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
নেদারল্যান্ডসে কমছে অপরাধীর সংখ্যা। একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ডাচ কারাগারে অপরাধী ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। এমনকি কোনো কোনো কারাগারকে সিনেমা হল হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তেমনই একটি হলে সিনেমা দেখতে যান ডাচ লেখক ও সাংবাদিক রেনাতে ফন দার জি। এরপর দ্য গার্ডিয়ানে তিনি লেখেন, গতকাল (১৩ অক্টোবর) আমি হারলেমের ডোম কারাগারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। আর ওই ভবনটি ছিল বিশাল। সেটি তৈরি করা হয়েছিল বৃহৎ গোলাকৃতির গম্বুজের নকশায়। ১৯০১ সালে এটি কারাগার হিসেবে চালু হয়। তবে আরও ২০-এর বেশি ডাচ কারাগারের মতো এটিও গত দশকে বন্ধ হয়ে গেছে। সেসব কারাগারকে জনসাধারণের জন্য উপভোগ্য করতে বিনোদন বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। রেনাতে লিখছেন, নেদারল্যান্ডসে গত ২০ বছরে কারাগারে অপরাধীর সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অথচ অন্য প্রান্তে পশ্চিম ইউরোপের ব্রিটেনে কারাবাসের হার সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, দেশটি এখন অভূতপূর্ব কারাগার সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। আর ইতিমধ্যে ব্রিটেনের কারামন্ত্রী জেমস টিম্পসন নেদারল্যান্ডসকে অনুপ্রেরণার উৎস বলে অভিহিত করেছেন। রেনাতে তার লেখার মাধ্যমে জানাতে চেয়েছেন, ডাচ ব্যবস্থা বাকি বিশ্বকে কী শেখাতে পারে? তিনি বলছেন, কারাগারের অপরাধীর সংখ্যা ক্রমে কমছে রাজনীতিবিদদের সাম্প্রতিক নীতির ফলে নয়। এর প্রধান কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। বেশিরভাগ অপরাধ এবং অপরাধের প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। অন্যান্য অনেক পশ্চিমা দেশের মতো সাম্প্রতিক দশকে নেদারল্যান্ডসে সহিংস অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কারাভীতি
কারাগার নিয়ে ডাচদের নানা ধরনের অস্বস্তি ও ভীতি রয়েছে। তাদের সামাজিক অভিজ্ঞতা হলো কেউ একবার কারাগারে গেলে আরও বেশি অপরাধী হয়ে ফিরে আসে। গবেষকরা বলছেন, ডাচ কারাগারের ভেতরও অপরাধী চক্র সক্রিয়। যে কারণে কারাগার এড়িয়ে চলতে চায় তারা। আর এ জন্য মামলার হার কম। আবার অপরাধের ধরনেও বদল ঘটেছে। ইন্টারনেট আসার কারণে নতুন নতুন অপরাধের দিকে ঝুঁকছে ডাচরা। সহজে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। আবার অনেকে হয়তো এড়িয়েই যায় অপরাধকে। অন্য দিকে রেনাতে তার লেখায় দেখিয়েছেন, ডাচ বিচারকরা সহজে কোনো অপরাধীকে কারাগারে পাঠাতে চান না। তারা সুযোগ রাখতে চান। বিভিন্ন অপরাধে তারা এমন সাজা দিতে আগ্রহী, যেখানে অপরাধীকে সামাজিক কোনো সেবা দিতে বলা হয়। আবার চুরি বা অন্যান্য অপরাধে কম সাজা দেওয়া হয়। তবে কারাভীতির কারণে যে অপরাধ কমছে দেশটিতে তাও মানতে চান না রেনাতে। তিনি লিখছেন, এর মানে এই নয় যে, সামগ্রিকভাবে প্রকৃত পক্ষে কম অপরাধ ঘটছে। তবে ধরন বদলেছে। এ বিষয়ে পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাচ অপরাধবিদ ফ্রান্সিস প্যাকস বলেন, এখানে প্রচলিত সহিংস অপরাধ কম ঘটছে, যেমন হত্যা। অন্যদিকে অনেক অপ্রচলিত অপরাধ অনলাইনে ঘটছে যেগুলো কম দৃশ্যমান। এটা খুবই সম্ভব যে এক ধরনের সংগঠিত অপরাধ আছে যেটার প্রতি আমাদের দৃষ্টি কম। তবে কম গুরুতর মামলা পুলিশ ও আদালতে আসছে। আর তাই কম লোক জেলে যায়। ডাচ কারাগারগুলো খালি হওয়ার কারণ নিয়ে প্যাকস গবেষণা করছেন। তিনি আরও জানাচ্ছেন, এমন কোনো নীতি ডাচদের নেই যা বিশ্ব অনুকরণ করতে পারে। কারাবাসের প্রতি সামগ্রিক ডাচ মনোভাব অস্বস্তিকর হতে পারে। প্যাকসের মতে, ডাচরা অনেক সচেতন যে কারাগারে থাকলে ভালোর চেয়ে ক্ষতি বেশি। তাদের অভিজ্ঞতা হলো, কারাগারের মাধ্যমে সমাজ কিছু সময়ের জন্য অপরাধী থেকে মুক্তি পেতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা জেল থেকে বের হয়ে গেলে তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে। সহিংস কারাগারের আবহাওয়ায় যেখানে তাদের টিকে থাকতে হয়েছিল, তার প্রভাবে তারা আরও নির্মম হয়ে উঠতে পারে। সম্ভবত তাদের একটি বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্ক রয়েছে যা তারা কারাগারের ভেতরেও তৈরি করতে পেরেছিল। ছোট অপরাধের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। আবার কারাগারে অবস্থান একজন অপরাধীর জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিতে পারে। যে ব্যক্তি কারাগারে যান তিনি চাকরি, বাড়ি এবং সামাজিক নেটওয়ার্ক হারাতে পারেন। তবে জেলে অবস্থান করে অপরাধীরা খুব কমই ভালো মানুষ হয়ে ওঠেন।
কম সাজা নীতি
রেনাতের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি দখলের সময় থেকে নেদারল্যান্ডসে দীর্ঘ কারাদণ্ড না দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি আবার ভিন্ন। অনেক ব্রিটিশ এবং আমেরিকান রাজনীতিবিদ নিজেদের শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য কঠোর সাজা দেওয়ার পক্ষে। যাই হোক নেদারল্যান্ডসেও ডানপন্থি রাজনীতিবিদরা এই মানসিকতা পোষণ করেন। ব্রিটিশ বিচারকরা ছোটখাটো অপরাধের জন্য ডাচদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সাজা আরোপ করে আসছেন। ডাচ বিচারকরা পরিষেবা দেওয়া বা অনুরূপ মামলায় সাজা স্থগিত রাখার বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। গবেষণা দেখায় যে, এই বিচারকদের প্রবণতা অপরাধের সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে কারাগারে থাকার রায় দেওয়া হয়, সেখানেও দেখা গেছে চুরির মতো কম অপরাধের শাস্তির দৈর্ঘ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সহিংস ও যৌন অপরাধের শাস্তির দৈর্ঘ্য বেড়েছে। তবে ডাচ বিচারকদের এ মনোভাব সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে অপরাধীর সংখ্যা হ্রাসের কারণ নয়। কিন্তু ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মতো দেশ এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নেদারল্যান্ডসে ধারাবাহিকভাবে কারাগারে লোকের সংখ্যা কমছে। দীর্ঘ সাজা কারাগার-ব্যবস্থার ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করে। এর একটি খরচের দিকও রয়েছে। কারাগারে আসামিদের পেছনে অর্থ খরচ কমিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যয় হয়, তাহলে এর বিস্ময়কর ফলাফল পাওয়া যায়।
কতটা সম্ভব
রেনাতে আরও লিখছেন, যাই হোক না কেন, নেদারল্যান্ডস অন্য দেশকে অন্তত একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিতে পেরেছে। সেটি হলো, এটি আবশ্যক নয় যে কারাগারের জনসংখ্যা সবসময় বাড়তে হবে। আবার এটিও অনিবার্য সত্য নয় যে, কম লোক জেলে থাকলে সমাজ কম নিরাপদ হয়ে যায়। কারাগার খালি থাকার একটি ইতিবাচক ফলাফল অবশ্য দেখা যায়। সেটি হলো ডাচরা রাতে নিরাপদে রাস্তায় হাঁটতে পারে, বিশেষ করে ব্রিটেনের তুলনায়; যেখানে অপরাধের ঘটনা এবং অপরাধ সম্পর্কে উদ্বেগ বেশি।
নেদারল্যান্ডসের দিকে তাকানোর পাশাপাশি নরওয়ের কারাগার ব্যবস্থাও বিবেচনা করার কথা বলছেন রেনাতে। তিনি লিখছেন, নরওয়ের কারাগারগুলো ছোট এবং এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে দৈনন্দিন জীবন যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। ফলে বন্দিরা সমাজ থেকে কম বিচ্ছিন্ন হয়। জনাকীর্ণ ব্রিটিশ কারাগারের চেয়ে তাদের পক্ষে অপরাধীদের একত্র করা সহজ। যেখানে তারা দিনে ২২ ঘণ্টা কারাকক্ষে বন্দি থাকে। আপনি তর্ক করতে পারেন যে, নরওয়ের মতো কম জনবহুল দেশ থেকে একটি ব্যবস্থা ব্রিটেন বা অন্যান্য বড় দেশের জন্য উপযুক্ত কি না। তবে এটাও স্পষ্ট যে, ব্রিটিশ ব্যবস্থা তার জেল ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয়ের সীমায় পৌঁছে গেছে এবং একটি নতুন পদ্ধতি তাদের জন্য বিলাসিতা হবে না।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেদারল্যান্ডস নামটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘নিম্নভূমি’। দেশটির জনসংখ্যা ১ কোটি ৭২ লাখ। ২০১৭ সালে দেশটিকে জাতিসংঘের ‘বিশ্ব সুখ’ প্রতিবেদনে বিশ্বের ষষ্ঠ সুখী মর্যাদা দেওয়া হয়। উদারপন্থি দেশটিতে যৌনবৃত্তি, গর্ভপাত ও যন্ত্রণাহীন স্বেচ্ছামৃত্যু আইনসম্মত। জনগণ জেলখানায় বসে থাকুক তা নেদারল্যান্ডস সরকার চায় না। তাদের নীতি হলো, এর মাধ্যমে অর্থনীতির ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে। তাই অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাদের উন্নত জীবনযাপনে সহায়তার জন্য তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। নেদারল্যান্ডস অপরাধীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে ইলেকট্রনিক ট্যাগিং ব্যবহার করে। এই যন্ত্রটি ব্যক্তির গোড়ালিতে আটকানো থাকে। যা ব্যক্তির প্রতিটি কার্যকলাপ রেকর্ড করে। অনেক অপরাধীর শরীরে এ ডিভাইস লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কারাগারে না থাকলেও আসামিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যার কারণে নেদারল্যান্ডস তাদের কারাগারগুলো একের পর এক বন্ধ করে দিচ্ছে। কয়েকটি কারাগার অবশ্য চালু আছে, তবে সেখানে অন্য দেশের বন্দিরা থাকেন। নেদারল্যান্ডস পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় একটি স্থান। দেশটি পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা রেখেছে। টিউলিপের জন্য বিখ্যাত নেদারল্যান্ডস। ফুলের মৌসুমে অর্থাৎ বছরের প্রথম দিকে দেশটিতে লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান বাহারিরঙা টিউলিপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, নেদারল্যান্ডস গণতন্ত্রের চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই চালিয়ে আসছে। তাদের শাসনব্যবস্থায় উচ্চশ্রেণি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমঝোতা দেখা যায়। যা এক ধরনের সামাজিক ও মানবিক বোধের ঐক্য গড়ে তুলেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ওঠার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বেশি কাজ করে। পাশাপাশি অধিকার চেতনাও কাজ করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য বোধ করে তারা। সময়ের চাহিদা ও পরিবর্তন মেনে নেওয়ার মতো সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা দীর্ঘকাল ধরে চলছে দেশটিতে।