আধ্যাত্মিক সাধনায় আবদুল কাদের জিলানি

হিজরি ৬ষ্ঠ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম, ফকিহ ও সুফি ছিলেন শায়েখ সাইয়্যিদ আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)। তিনি ৪৭০ হিজরি সনের ১ রমজান জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গি (রহ.) এবং মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (রহ.)। তিনি ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানিতে ৯১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

বাল্যশিক্ষা : বড়পীর আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর বাল্যশিক্ষা শুরু হয় মক্তবে। তার সম্পর্কে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। যেগুলোর সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে জানা যায় না। সেসব কিংবদন্তিও এখানে উল্লেখ থাকবে। তিনি প্রথম দিন মক্তবে গিয়ে দেখেন অন্য ছাত্রদের ভিড়ে বসার কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করে ওপর থেকে গায়েবি আওয়াজ এলো, হে মক্তবের ছাত্ররা! আল্লাহর অলির বসার স্থান প্রশস্ত করে দাও। গায়েবি আওয়াজ আসার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা চেপে বসলেন। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর বসার ব্যবস্থা হয়ে গেল। প্রথম দিনেই অবাক কাণ্ড, মক্তবের শিক্ষক আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-কে আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ সবক দানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি কোরআন মাজিদের প্রথম ১৮ পাড়া পর্যন্ত মুখস্থ বলে ফেলেন। মক্তবের শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! তুমি কীভাবে কোরআন মুখস্থ করেছ! আজ তো মক্তবে তোমার প্রথম দিন। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বললেন, আমার মা ১৮ পাড়া পর্যন্ত কোরআন মুখস্থ করেছিলেন। আমি গর্ভে থাকাকালে তিনি কোরআন পাঠ করতেন। আমি মায়ের তেলাওয়াত শুনে শুনে ১৮ পাড়া পর্যন্ত মায়ের গর্ভে থাকাকালে মুখস্থ করে ফেলেছি।

হিজরত ও সত্যবাদিতা : তৎকালীন ইরাকে ভালো পড়াশোনা ও ব্যবসার সুযোগ ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পড়াশোনা ও ব্যবসার জন্য মানুষ বাগদাদ আসত। পড়াশোনার উদ্দেশে আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ব্যবসায়িক কাফেলার সঙ্গে বাগদাদে যান। যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েন। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-কে ডাকাত সর্দার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সঙ্গে কী আছে? তিনি বললেন, আমার কাছে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে। ডাকাত সর্দার আশ্চর্য হয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন হে যুবক! তুমি তো মিথ্যা কথা বলে আমার কাছ থেকে স্বর্ণমুদ্রা লুকাতে পারতে। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বললেন, মিথ্যা কথা বলতে আমার মা নিষেধ করেছেন। এ কথা শুনে ডাকাত সর্দার বললেন, মায়ের আদেশ তুমি এভাবে পালন করো। নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর আদেশ আরও যত্নের সঙ্গে পালন করো। আর আমি ও অন্য ডাকাতরা তো আল্লাহর আদেশই পালন করি না। মায়ের আদেশ তো অনেক দূরের কথা। এই বলে ডাকাত সর্দার আফসোস করতে করতে বলেন, হে বালক! তুমি সাধারণ কোনো মানুষ না। হে বালক তুমি আমাকে কলেমা পড়াও। ডাকাত সর্দারের সঙ্গে আরও ৬০ জন অশ্বারোহী ডাকাত ছিলেন। তারাও কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান।

ইবাদতের কঠোর সাধনা : তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি একাধারে ৪০ বছর পর্যন্ত ইশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। তিনি প্রত্যহ শেষ রাতে মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হতেন এবং একটি কিংবদন্তি আছে যে, এমন একটি দোয়া পাঠ করতেন, যে দোয়া পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি লোকচক্ষুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তিনি রাতের একটা সময় জিকির ও মোরাকাবা করে কাটাতেন। যৌবনের অধিকাংশ সময় রোজা রেখে কাটিয়েছেন। যখন নফল নামাজ আদায় করতেন সুরা ফাতেহার পর সুরা আর রহমান, সুরা মুজ্জাম্মিল কিংবা সুরা ইখলাস পড়তেন। তন্দ্রার ভাব এলে দেখে দেখে কোরআন তেলাওয়াত করতেন।

কাদেরিয়া তরিকার প্রবর্তক : আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। মুসলমানদের ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কোরআন সুন্নাহভিত্তিক মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। মানুষকে মহান আল্লাহ ও রাসুলমুখী (সা.) করার জন্য বিভিন্ন আমল বাতলিয়ে দিতেন। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) যখন দুনিয়ার জীবন ত্যাগ করে পরপারে যান তখন ভক্ত-অনুসারীরা তার আমল ও চরিত্রকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কাদেরিয়া তরিকা প্রবর্তন করেন। সে সময় থেকে কাদেরিয়া তরিকার প্রচলন আমাদের দেশেও প্রচলিত হয়েছে।

রচিত গ্রন্থাবলি : আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) শুধু শরিয়ত ও মারফতের পণ্ডিতই ছিলেন না তিনি কাব্য-সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল বিষয়েরও পণ্ডিত ছিলেন। তার রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে ‘ফাতহুল গায়েব’, ‘গুনিয়াতুত তালেবিন’, ‘ফাতহুর রব্বানী’, ‘কালিদায়ে গাওসিয়া’ উল্লেখযোগ্য।

ফাতিহায়ে ইয়াজদাহম : প্রতি বছর ১১ রবিউস সানি ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালিত হয়ে থাকে। ফাতিহা বলতে বোঝানো হয় কোনো মৃতের জন্য দোয়া করা এবং সওয়াব পৌঁছানো। ইয়াজদাহম ফার্সি শব্দ। এর অর্থ একাদশ। ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানিতে বড়পীর আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যু উপলক্ষে রবিউস সানির ১১ তারিখে যে মৃত্যুবার্ষিকী পালন এবং তার জন্য দোয়া করা হয় সেটাকে বলা হয় ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম। জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকী পালন ইসলাম সমর্থিত নয়। তাই এই নির্দিষ্ট তারিখের অনুসরণ না করে যেকোনো দিন তার জন্য দোয়া করলে এবং জায়েজ তরিকায় তার জন্য সওয়াব পৌঁছালে তা উপকারে বয়ে আনবে।