সাম্প্রতিকালে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস আগেই জানা গিয়েছিল। এবার সংস্থাটি বলছে, আরও এক বছর অর্থনীতি চাপে থাকবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা ও বিদেশি অর্থায়ন না আসার চাপ। এ ছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে।
তবে পূর্বাভাসে বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে বাংলাদেশের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওয়াশিংটন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা, অর্থনীতিবিদ নাজমুস খান ও জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরীন এ মাহবুব।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই পূর্বাভাস কয়েক দিন আগেও অনানুষ্ঠানিকভাবে জানা গিয়েছিল। তবে সংস্থাটি বলছে, আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। প্রবৃদ্ধি কমার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশি^ক কারণ দায়ী বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
চলমান অর্থবছরের বাজেটে সদ্য পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। সেই হিসাবে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস সরকারি লক্ষ্যের চেয়ে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী কমে গেলে তা হবে করোনার পর সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বলেছে, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। তবে সরকারের নেওয়া বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে বেড়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। আর চলতি অর্থবছর শেষে এটি আবার ৯ শতাংশ নেমে আসবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির সূচকের ৪৫ শতাংশই হিসাব করা হয় খাদ্যপণ্যের দাম দিয়ে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়ায় তা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান তৈরি করা। তবে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় একদিকে দেশের বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এ অবস্থায় আরও বেশি নতুন ও শোভন চাকরির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কর্মসংস্থানে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতি বছর উৎপাদন খাতে গড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে এ খাতে প্রতি বছর কর্মসংস্থান ৯ দশমিক ৬ শতাংশ হারে কমেছে। বেশিরভাগ, প্রায় সাড়ে ৪৫ শতাংশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে কৃষি খাতে। এ খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক ও নিম্ন মজুরির।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিক দিয়েই চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানায় বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে শ্রমবাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধানে রয়েছে। সেটি একটি বড় সমস্যা। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার অমিল আছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে এসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি খারাপ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক খাত নিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সংকট রয়েছে, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ অনেক বেশি। সরকারের অনেক প্রচেষ্টার পরও সেটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণ কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, বাংলাদেশ এখন গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ অর্থনৈতিক কর্মকা-কে পুরোপুরি স্বাভাবিক করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দ্রুত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, যাতে বাংলাদেশ গুণগত চাকরি সৃষ্টির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারে এবং তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে খুব একটা ভূমিকা রাখেনি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবক ও নারীদের অনেকেই তাদের কাক্সিক্ষত চাকরি খুঁজে পান না। আর সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের শিল্প ও সেবা খাতের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালোর দিকে।
তবে বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভালো ইতিহাস রয়েছে বলে জানান আবদুলায়ে সেক। তিনি বলেন, ‘আশা করছি, সরকার দেশের আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও ব্যবসায়ের পরিবেশ উন্নত করতে জরুরি ও সাহসী সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে আসতে পারবে।’