দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত যতটা না দুর্ভোগে, তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডির তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে শুধু ভোগ্যপণ্যের দাম ৩১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, সেগুলোর মূল্য বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তার প্রতিফলন নেই। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য অনেকে ‘ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে’ দায়ী করছেন। ২০২৩ সালের ১১ মে তৎকালীন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি ও বাজার’ এ দুই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যে কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঝরে পড়ছে এবং পণ্যের মূল্য বেড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ বাজার করতে গিয়ে এখন কাঁদছে। দ্রব্যমূল্য ইস্যুতে এবার হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার। যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে সিন্ডিকেট করছে, তাদের বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেপ্তার করার ঘোষণা দিয়েছেন যুব, ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এখন চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আগে যে সিন্ডিকেট ছিল, সেটা আওয়ামী লীগ সরকার নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু সিন্ডিকেটের ভেতরে তো ব্যবসায়ীরাই বসে ছিলেন। তারা এখনো রয়ে গেছেন। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ বাঁচাতে কোনো কোনো রাজনীতিবিদের সঙ্গে লিয়াজোঁর মাধ্যমে সিন্ডিকেট টিকিয়ে রেখেছেন। সে ক্ষেত্রটা আমরা শনাক্ত করছি। সেটা অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছি।’ অর্থনীতি গবেষকরা বলছেন, বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখা ও দ্রব্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার কার্যকর মেকানিজম বা কৌশল না থাকার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। এই খাতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা মাঠ পর্যায় থেকে ভোগ্যপণ্য খুচরা বাজার পর্যন্ত আসার পথে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অনেকাংশে দায়ী এই সিন্ডিকেট। অন্তর্বর্তী সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। এখানেই রয়েছে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা যেখানে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। অন্তর্বর্তী সরকারের যে ক্ষমতা অনেকটাই কম। নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের মূল্য বিশেষ কারণে স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে কিন্তু যাবতীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির সতর্ক বার্তা বহন করে। বৃহৎ পরিসরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি যেন হতে না হয়, সেজন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আমদানিনির্ভর দ্রব্যে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করতে হবে। এতে দেশেই উৎপাদনের প্রতি উৎসাহ বাড়বে, সেই সঙ্গে কৃষক পাবে তার ন্যায্য ও কাক্সিক্ষত মূল্য। দেশে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের মূল্য বিশেষ কারণে স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে কিন্তু যাবতীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য মূলত দায়ী কারা? দায়ী তারা, যারা সব সরকারের সময় নিজেদের বিষয়টিই গুরুত্ব দেয়। এককথায় যারা মুনাফাখোর এবং মুখোশধারী। আর অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে তো কথাই নেই। যেহেতু রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে কোনো প্রেশার গ্রুপ নেই, সেহেতু তারা ইচ্ছামতো পণ্য্যমূল্য বৃদ্ধি করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ সমস্যায় সবজির দাম বেড়েছে। তখন দেখা গেছে, সেগুলো একটি বা দুটি আইটেম। কিন্তু একসঙ্গে সব ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু এবার তাই হয়েছে। মূলত কোনো রাজনৈতিক প্রেশার গ্রুপ না থাকায় বর্তমানে দ্রব্যমূল্য রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে।
অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত বলার দরকার নেই। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সবজির মূল্য একইসঙ্গে বৃদ্ধি কি কোনো ষড়যন্ত্রকে প্রমাণ করে না? বর্তমানে কী কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে! কৃষিপণ্য উৎপাদন কমেছে? জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে কি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে? ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে? পণ্য সরবরাহে যে চেইন রয়েছে, সেখানে কি কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে? যদি তা নাই-ই হয়, তাহলে কেন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে? অনেকে বলছেন, সব পণ্য মজুদ আছে। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে না। অধিকাংশই মজুদদারের কারসাজি। কিছুদিন পর জানা যাবে, এই কয়েকদিনে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করে এত হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মজুদদাররা। এই যে এসব চলছে, এটা কেন হচ্ছে? সেই কারণে বলছি, একটি রাজনৈতিক প্রেশার গ্রুপ থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি সহজেই সামাল দেওয়া যেত।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দ্রুত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য জরুরি। কারণ যে জনগণের জন্য রাজনীতি, সরকার সেই জনগণই যদি স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে কার জন্য কী? বিশেষ করে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে অনুরোধ করব, আপনারা দ্রুত জেলা-উপজেলা-গ্রাম পর্যায়ে কর্মীদের নামিয়ে দিন আমদানি ও খুচরা বাজার মনিটরিংয়ে। এরপর বাজারের পণ্যমূল্যের প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করুন সরকারের কাছে। এই রাজনীতি সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এর ফলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে।
দ্রব্যমূল্য কমানোর ব্যাপারে রাজনৈতিকভাবে তেমন কোনো চাপ নেই। কিন্তু সাধারণ জনগণের ত্রাহি অবস্থা। যাদের সংসার চালাতে হয় নির্দিষ্ট আয়ের ওপর ভিত্তি করে, যারা একেবারেই খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের কী অবস্থা হতে পারে? যারা দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর তাদের কথা আলাদা। উচ্চবিত্ত ছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে ক্রমেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমা হচ্ছে। যে অনাচার, দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ বিসর্জন দিল, যে মানুষগুলো আহত হলো তারা মূলত কী চেয়েছিলেন? রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি রাজনৈতিক সুস্থিরতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা? তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন, নতুন একটি বাংলাদেশের যেখানে বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ‘অল আউট’ অ্যাকশনে যাবেন। কিন্তু তারপরও যদি দ্রব্যমূল্য না কমে? কোনো ধরনের সময় না নিয়ে এ ব্যাপারে সর্বদলীয় বৈঠক করে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একটি রাজনৈতিক মনিটরিং সেল গঠন করা দরকার। যাদের কাজ হবে- সরকার নির্ধারিত দ্রব্যমূল্য এবং বাজারদর পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। এই কাজ বর্তমান সরকারের পক্ষে একা সমাধান করা কঠিন। যে সমস্ত রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এই ধরনের কাজ হবে, তাতে প্রায় শতভাগ সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, একসময় নির্বাচন করতে হবে। যেতে হবে জনগণের দোরগোড়ায়। তখন যাতে নেতারা কোনো ধরনের অবাঞ্ছিত প্রশ্নের মুখোমুখি না হন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যতই হার্ড লাইনে যাক, দেশব্যাপী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। কারণ তাদের দলীয় রাজনৈতিক শক্তি নেই। শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে, যতই আন্তরিকতা থাক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হবে। কারণ প্রশাসনও জানে, তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যেহেতু তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নেই, সেহেতু এই কাজ খুবই চ্যালেঞ্জিং তবে অসম্ভব নয়। সন্তুষ্টিজনক উৎপাদন, বিঘœহীন জোগানের পর পণ্যমূল্যের উল্লম্ফন হলে, মজুদদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কাজ করতে পারবে। তা যদি না হয়? এই কারণেই দ্রুত সর্বদলীয় সহযোগিতা চাইতে হবে সরকারকে। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই সম্ভবত সরকারের আহ্বানে মুখ ফেরাবে না। কালবিলম্ব না করে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করতে হবে। তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন মিলিতভাবে কাজ না করলে এই ভয়াবহ দ্রব্যমূল্য কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। এই কারণেই বারবার বলছি, সমন্বিত রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া পণ্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া থামানো কঠিন।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব
eliaskhan71@gmail.com