এইচএসসির পাস ফেল কী কথা বলে?

বিশাল রাজনৈতিক ডামাডোল ও পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার প্রকাশিত হলো উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল। এই প্রেক্ষাপটের কারণেই হয়তো এবারের ফল প্রকাশে নেই তেমন উত্তাপ, নেই আনন্দ কিংবা অর্জনের সাফল্যগাধা আর উত্তেজনা। আমরা জানি এসএসসি ও এইচএসসির পড়াশোনা এবং ফলাফলের মধ্যে সাধারণত বড় একটি গ্যাপ থাকে। যারা এসএসসিতে ভালো ফললাভ করে তারা সবাই এইচএসসিতে সেভাবে করে না, অথচ এবার সেই এসএসসির ফলের ওপরেই এইচএসসির ফল তৈরি করতে হয়েছে। অতএব কোনো কিছু প্রাপ্তির যে আনন্দ সেটি থেকে শিক্ষার্থীরা যেমন বঞ্চিত হয়েছে তেমনি প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং সর্বোপরি দেশ ফল লাভের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলো।

আমরা জানি, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে (যা ‘বিষয় ম্যাপিং’ নামে পরিচিত) মাঝপথে বাতিল হওয়া এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফল তৈরি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় একজন পরীক্ষার্থী এসএসসিতে একটি বিষয়ে যত নম্বর পেয়েছিল, এইচএসসিতে সেই বিষয় থাকলে তাতে এসএসসির প্রাপ্ত পুরো নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আর এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমান পরীক্ষার বিষয়ে ভিন্নতা থাকলে বিষয় ম্যাপিংয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নম্বর বিবেচনা করে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। 

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ৩০ জুন। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৭৯০ জন। সাতটি পরীক্ষা হওয়ার পর সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে কয়েক দফায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তখন পর্যন্ত ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষা বাকি ছিল। এ ছাড়া ব্যবহারিক পরীক্ষাও বাকি। এক পর্যায়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয় এবং সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে সরকারের পতন হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১১ আগস্ট থেকে নতুন সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবির মুখে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো বাতিল করে সরকার।

আমাদের স্মরণে আছে এইচএসসির ফল প্রকাশের দাবি নিয়ে কয়েকশ পরীক্ষার্থী নজিরবিহীনভাবে ২০ আগস্ট  দুপুরে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে। পরে তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বৈঠকে অবশিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে (বিষয় ম্যাপিং) হবে মাঝপথে বাতিল করা এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফল। ইতিমধ্যে যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে সেগুলোর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ করা হেেয়ছে। আর যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফল প্রকাশ করা হয়েছে এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে।

এবার এইচএসসি ও সমমানের সব বোর্ডের পাসের গড় হার ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ অর্থাৎ ফল প্রায় একই। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ যা গতবার ছিল ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ। গতবার মোট জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৭৮ হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী। এবার এইচএসসিতে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৭৬ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এইচএসসি বিএম ভোকেশনালে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৯২২ জন। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৯ দশমিক ২১ শতাংশ, রাজশাহী বোর্ডে ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৭৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ৮১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, সিলেট ৮৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৬৩ দশমিক ২২ শতাংশ, কুমিল্লা ৭১ দশমিক ১৫ শতাংশ। যশোর বোর্ডে অন্যান্য বিষয়ে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলেও ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৮ শতাংশ যা পুরো ফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এইচএসসি বিএম-ভোকেশনাল বোর্ডে পাসের হার ৮৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, আলিম প্রতি বছরের মতোই সবার ওপরে, এবারও ৯৩ দশমিক ৪০ শতাংশ কিন্তু কীভাবে তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা আমরা পাই না। আলিমে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ৯ হাজার ৬১৩ জন। ৬৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করেনি, সেই পুরনো খেলা। সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের কারণে এবার জিপিএ ৫ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৩১৬, তবে পাসের হার গতবারের চেয়ে সামান্য একটু কমেছে যদিও এই বাড়া-কমার মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অগ্রগতির কোনো চিত্র ফুটে ওঠে না।

কতিপয় শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়ার একটি দাবিও তুলেছে। তরুণ এসব শিক্ষার্থীর আবেগের দাবির প্রতি পরিস্থিতির কারণে সহানুভূতি দেখানো গেলেও, মেনে নেওয়ার সময় একবার কিংবা দুবার নয় আমি বলব শতবার ভাবা উচিত। কারণ সমাজ, বাস্তবতা, বৈশি^ক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষায় বারবার এভাবে ছাড় দেওয়া মোটেই ঠিক নয়। শিক্ষার মানের সঙ্গে কোনো আপস নয়। আর তাই এখন থেকে কঠোর হতে হবে এবং এক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

সব জায়গাতেই মেকি, সব জায়গাতেই অনুপযুক্ত লোক, সর্বত্রই ভুয়াদের দাপট থাকলে সমাজ টিকবে না। পরিশ্রম করে যা অর্জন করা হয়, তাই ঠিক। পরিশ্রমের জন্য কেউ কষ্ট করতে চায় না, পড়াশোনা না করেই সবকিছু পেতে  চায়। এখানে নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। সাত বিষয়ে নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হলেও ১৩ বিষয়ে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল তৈরি করা হয়েছে অর্থাৎ ১৩ বিষয়ে অটোপাস দেওয়া হয়েছে। তার পরেও লাখো শিক্ষার্থীর নাম অকৃতকার্যের খাতায়। কারণ ৯টি সাধারণ বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে এবার অনুপস্থিত ছিল ৯৬ হাজার ৯৯৭ জন পরীক্ষার্থী। আর বহিষ্কার হয় ২৯৭ জন। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে কিংবা বহিষ্কার হলে সামগ্রিক ফল অকৃতকার্য আসে। পরীক্ষার মাধ্যমে যে সাতটি বিষয়ের ফল তৈরি করা হয়েছে, সেখানে কতজন ফেল করেছে, সেটা জানা প্রয়োজন। সচিবালয়ে একটা অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মধ্যে কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক পরীক্ষাগুলো বাতিলের ঘোষণা দিতে হয়েছিল কিন্তু পরীক্ষাগুলো নিতে পারলে ভালো হতো। এসএসসিতে যারা কোনো বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে পরবর্তী বছরে আবার পরীক্ষার সুযোগ নিয়েছে সে ফলও নেওয়া হয়েছে। কাজেই চূড়ান্ত ফলাফলে যারা উত্তীর্ণ হবে না, তারা বঞ্চিত হয়েছে বলার সুযোগ নেই।

এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে, প্রকৌশল, মেডিকেল, কৃষিসহ সাধারণ শিক্ষায় তারা প্রবেশ করে। এই দুই স্তরে দুর্বল থাকার কারণে ভর্তি পরীক্ষায় সমস্যা হয়, পরে গোটা শিক্ষাজীবনে তার ছাপ পড়ে।  পেশাগত জীবনে যখন প্রবেশ করে তখনো আমরা দেখতে পাই তাদের দুর্বলতার চিত্র। নগণ্য সংখ্যক পেশায় প্রকৃত পেশাদারিত্বের ছাপ রাখতে পারে, অধিকাংশ সময়ই তারা ভুল, দুর্বল সিদ্ধান্ত ও অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। সেজন্য জাতিকে অনেক ভুগতে হয়। সেখান থেকে ওপরে ওঠার জন্য অবৈধ সিঁড়ি ব্যবহার করে। পেশিশক্তি, রাজনীতির দুষ্ট শক্তি ও চক্র ব্যবহার করে। সারা জীবন চলতে থাকে এর ফল।

এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজে না আসে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি দায়িত্ব রয়েছে। তারা যদি ভর্তি পরীক্ষাটা ঠিকভাবে নেয় তাহলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে তাদের ভুল, জাতি বুঝতে পারবে যে এ ধরনের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের এবং পড়াশোনা না করে অটোপাসে যে কত বড় ক্ষতি হয় সেটি। কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে, শিক্ষাকে তো এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেখে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও অটোপাসের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল। এটি একটি ব্যাড কালচার। এটি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

masumbillah65@gmail.com