আল্লাহতায়ালা মানুষকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সুখ-শান্তির জন্য এ ধরণীকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ করেছেন। সম্পদ বণ্টনে তিনি কাউকে প্রাধান্য দিয়েছেন আবার কাউকে করেছেন নিঃস্ব। কাউকে সম্পদ দিয়ে আবার কাউকে সম্পদ না দিয়ে পরীক্ষা করছেন তিনি। পৃথিবীতে মানুষ মহান আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই মানুষের দায়িত্বই হচ্ছে সুখ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য অভাবীদের প্রতি দয়া প্রদর্শনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কারণ দয়া প্রদর্শন এবং সহানুভূতি পাওয়াকে দরিদ্রদের অধিকার বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থের অভাবের কারণেই খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের চাহিদা প্রকট হয় বলে এগুলোকে মানুষ দারিদ্র্য বলে চিহ্নিত করেছে। দারিদ্র্য দূরীকরণে ইসলামই দারিদ্র্যের মূলে কুঠারাঘাত করে ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত সুন্দর সমাজ উপহার দিতে কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক বিধিবিধান নির্ধারণ করছে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতির কারণে সমাজে দারিদ্র্যের মতো অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা থেকে বিরত থাকতে কোরআনের একাধিক জায়গায় গুরুত্বের সঙ্গে এসব নিষেধ করা হয়েছে। আর সম্পদশালী ব্যক্তিদের দারিদ্র্য দূরিকরণে এগিয়ে আসতে সুস্পষ্টভাবে আহ্বান করা হয়েছে।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দিই এবং তাদের একজনকে অপর জনের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করি। যাতে একে অপরকে অধীনস্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। আর তারা যা সঞ্চয় করে তোমার রবের রহমত তা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।’ (সুরা জুখরুফ ৩২) কোরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘বলুন, আমার রব যার প্রতি ইচ্ছে তার রিজিক বাড়িয়ে দেন অথবা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।’ (সুরা সাবা আয়াত ৩৬)
দারিদ্র্য অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম এবং জীবিকার প্রাচুর্যও অনেক নেয়ামতের অন্যতম। ব্যক্তি, সময় ও স্থানভেদে দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য দান মহান আল্লাহর কৌশলেরই বৈচিত্র্য। সব মানুষই আল্লাহর নির্ধারিত অবস্থানে থেকে আনুগত্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। অভাব বা সচ্ছলতা নয়, ব্যক্তির মানসিকতা অবাধ্যের কারণ। তাই রাসুল (সা.) অভাব ও প্রাচুর্যের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন।
পরকালের মুক্তির জন্যই দারিদ্র্য দূরীকরণে এগিয়ে আসা বাধ্যতামূলক। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে করো কিংবা পশ্চিম দিকে, এতে কোনো কল্যাণ নেই। বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ইমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতারা, কিতাবসমূহ ও নবীদের প্রতি এবং আল্লাহর ভালোবাসায় ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসত্বের জীবন থেকে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে। নামাজ আদায় করবে, জাকাত দেবে, ওয়াদা করার পর স্বীয় ওয়াদা পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-কষ্টে ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে, এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ, আর এ লোকেরাই মুত্তাকি।’ (সুরা বাকারা ১৭৭)
অভাবমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি দান গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। (বিনিময়ে) আল্লাহ তোমাদের কিছু গুনাহ দূর করে দেবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্মের খুব খবর রাখেন।’ (সুরা বাকারা ২৭১)
দরিদ্রদের দান করা সর্বোত্তম ঘোষণা দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেদের উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা তোমরাই তা কখনো গ্রহণ করবে না, তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সুরা বাকারা ২৬৭)