সার্চ কমিটি আর সংস্কার মিলবে কী করে

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে শিগগিরই সার্চ কমিটি গঠন করবে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ীই এ কমিটি গঠন হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারে গঠিত কমিশনের কাজ শেষ হওয়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে সার্চ কমিটি গঠন করা হলে সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সেটাকে কীভাবে মেলানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিশনের সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হয়নি। এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতেও পারব না।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে সার্চ কমিটি কেন হবে। একটা কমিশন হয়েছে। তারা কাজ করছে। তাদের সুপারিশ গ্রহণ করবে না? তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা নেই।’

রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান আইনে অতীতে যেসব সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তা ছিল বিতর্কিত। তাই ওই সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে, পরামর্শ করে কমিটির কার্যক্রম ঠিক করা উচিত।

দেশে ২০১২ সালে সার্চ কমিটির প্রথা চালু হলেও আইনটি তৈরি হয় ২০২২ সালে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে গত তিনটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তিনটি কমিশনই দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই সময় বিএনপিসহ বিরোধী সব রাজনৈতিক দল সার্চ কমিটির বিরোধিতা করেছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর নানা আলোচনায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগের আইনসহ এই সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া বদলানোর আওয়াজও উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার ক্ষেত্রে শুধু নির্দলীয় সরকারই নয়, একটা নিরপেক্ষ কমিশন আরও বেশি দরকার। সার্চ কমিটি থেকে শুরু করে কমিটি গঠন সব ক্ষেত্রেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করবেন, যার সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। এ দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন হবেন নারী। এ কমিটির কাজে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

সার্চ কমিটি ইসির পাঁচটি পদের বিপরীতে দুজন করে ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এর এক মাস পর পদত্যাগ করেন কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। অন্তর্র্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারে। বলা হয়েছিল সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।

এদিকে নির্বাচন সংস্কার কোন পদ্ধতিতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার হবেÑ তা এখন ঠিক করতে পারেনি সংস্কার কমিশন। তারা বলছে, নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশসহ (আরপিও) সবকটি বিধিবিধান পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হবে। সেখানে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন দরকার কি না, তা দেখা হবে। তারপর প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।

নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে যে আইন বিগত সরকার প্রণয়ন করেছে, তা অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশন সংস্কার প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। গত মাসে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এ আইনের মধ্যেই একটি বিধান আছে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের। কিন্তু বর্তমান বিধানের আওতায় কয়েকটি সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা এই অনুসন্ধান কমিটির সদস্য হন। এসব ব্যক্তির নিয়োগই দেওয়া হয় তারা যেন সরকারের প্রতি অনুগত থাকেন। এই বিধানে আছে অন্তত দুজন ব্যক্তিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। তারা যাকে চান তাকেই নিয়োগ দিতে পারেন এই সার্চ কমিটিতে।

তিনি বলেন, গত তিনটি কমিশন এভাবেই গঠিত হয়েছে। এটা হয়ে থাকে কখনো প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে, কখনো আইনের মাধ্যমে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা তো আর আমগাছ থেকে জাম পাব না। আবারও যদি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন হয়, মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন হয়, অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হয় তাহলে তো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন পাব না। তিনি বলেন, প্রথম কাজ হবে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনি কাঠামোতে সংস্কার নিয়ে আসা। আমরা আইনটি সংস্কার করব যাতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠন করা যায়। কমিশন যেন কোনো দলের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গঠিত না হয়। প্রাথমিক চিন্তায় আছে, প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রতিনিধি, প্রধান বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, তৃতীয় প্রধান দলের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি থাকবে সার্চ কমিটিতে যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়। অনুসন্ধান কমিটি যেন সবার মতের ভিত্তিতে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয়, তা আমাদের সংস্কারে অগ্রাধিকার পাবে। সার্চ কমিটি যাদের নাম প্রাথমিক বিবেচনায় নেবে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং তাদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা। এতে যারা পরিচ্ছন্ন নয়, তারা এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকবেন। এর মাধ্যমে যোগ্যদের নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ আবু আলম শহীদ খান বলেন, বিদ্যমান আইনটি যখন করা হয় তখন ওই পার্লামেন্টকে বলা হয়েছিল অবৈধ। বিনা ভোটের পার্লামেন্ট ছিল। যে কারণে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আইনটির বিরোধিতা করেছে। যদিও তারা মনে করেছিল, যেকোনো একটা আইনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ মনে করে এমন একটা সার্চ কমিটি গঠন করা হোক যেটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে। অনেকে মনে করেন, এটা ভারতের মতো হওয়া উচিত। সেখানে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে যেভাবে কমিটি গঠন করা হয়, সে রকম একটা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এরপরও যেহেতু এটা অন্তর্র্বর্তী সরকার, তার কোনো দলীয় পরিচয় নেই। সে কারণে তারা একটা সার্চ কমিটি গঠন করতে পারে। সেই কমিটি হওয়ার পর বোঝা যাবে সার্চ কমিটি কেমন হয়েছে। আমাদের আসলে অপেক্ষা করতে হবে।’

কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরাও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। কারণ এটি সেই পুরনো ফর্মুলা। তারা এতে নতুন কী যোগ করে সেটা আগে দেখতে হবে। কয়েক দিন যাক। তারা কাজ শুরু করুক। তাদের কর্মপরিকল্পনা দেখে আমরা আমাদের অবস্থান তুলে ধরব।’ অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিএনপির কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা চাইলে আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা শেষে একটি পন্থা তুলে ধরতে পারতাম।’

বামজোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সংবিধানে সার্চ কমিটি করার বিধান আছে। ওই বিধান সংযুক্ত করার দাবি ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে, পরামর্শ করে সার্চ কমিটির কার্যক্রম ঠিক করা উচিত। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের যোগ্যতার বিষয়ে আরও কী কী সংযুক্ত করা যায় তাও যুক্ত করা দরকার। তবে এসব কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। যাতে নির্বাচন কমিশন দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতির কাজ শুরু করতে পারে।’

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘একটা আইন আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল, যেটার ব্যাপারে আমাদের সমালোচনা ছিল। আইনটা তো এখন পরিবর্তন হয়নি। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আমরা অপেক্ষায় আছি তারা কীভাবে সার্চ কমিটি গঠন করেন। তারা কী করেন।’