হঠাৎ অশান্ত মোহাম্মদপুর

খুন, ছিনতাই, দখলবাজি ও অস্ত্রের ঝনঝনানিতে অশান্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে অবৈধ মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, বাজারসহ নানা খাত দখলে নিতে মরিয়া এই এলাকার নানা গ্রুপ। এজন্য নিজেদের আধিপত্য জানান দিতে লিপ্ত হচ্ছে সংঘর্ষে। এসব সংঘর্ষে প্রদর্শন ও ব্যবহার করছে অবৈধ স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, হচ্ছে রক্তপাত। সেই সঙ্গে ঝরছে জীবনও। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রও।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বলছেন, লোকবল ও টহল ভ্যান সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতায় এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। লোকবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেলে এ ধরনের কর্মকান্ড দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যাবে।

গত রবিবার সকালে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকায় বেসরকারি খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসলের গাড়ি থামিয়ে ১২ লাখ টাকা ও ব্যাংকের চেক বই ছিনিয়ে নেয় একদল ছিনতাইকারী। সেদিন হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল নেসলে কোম্পানির পণ্য পরিবহনকারী গাড়িটি। তখন কয়েকটি মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা গাড়িটির গতিরোধ করে। এরপর তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে গাড়ির সামনের গ্লাসে আঘাত করতে থাকে। এতে চালক গাড়িটি থামাতে বাধ্য হন। তারপর ঘটে চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনা। এ ঘটনায় নেসলের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে সেদিনই একজন মামলা করেছেন মোহাম্মদপুর থানায়। যদিও গতকাল পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি পুলিশের হাতে।

তবে ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চারটি মোটরসাইকেলে ১২ জন ছিনতাইকারী ছিল। একটি বাইকে ছিল চারজন, দুটিতে তিনজন, আরেকটিতে দুজন। সবার হাতে রামদা, চাপাতি ছিল। এই সিসিটিভি ফুটেজ ধরে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। ফুটেজে পাওয়া ১২ জন ছিনতাইকারীর মধ্যে চারজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেডে বসবাসকারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর। ঘটনার সময় এক বাইকে থাকা চারজন হলেন ময়লা জামাল, সাব্বির, জাকির ও মাসুদ। এ চারজনই এলাকায় চিহ্নিত ছিনতাইকারী ও অপরাধী হিসেবে পরিচিত। সবাই মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করেন। জানা গেছে, এ ছিনতাইকারী দলটি এলাকায় ‘শাহীন ও আশিক’ গ্রুপ হিসেবে পরিচিত।

পরিচয় শনাক্ত হওয়া চারজনের মধ্যে জাকিরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি। আর এই গ্রুপের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত আশিকের মোবাইলে কল দিলে সেটি বন্ধ দেখায়। জানা গেছে, এই গ্রুপের অন্য হোতা শাহীন এলাকায় ভাইস্তা শাহীন হিসেবে বেশি পরিচিত। এই শাহীন একসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ছিলেন।

নেসলের এরিয়া ম্যানেজার দিদারুল আলম বলেন, ‘আমরা সেদিনই মামলা করেছি। পুলিশ কাজ করছে। আশা করছি আমরা ছিনতাই হওয়া টাকা ফেরত পাব। অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে।’

শুধু এ ঘটনাই নয়, গত এক সপ্তাহে মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলীর দিকে যেতে সোয়ারীঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক, বেড়িবাঁধ চার রাস্তার মোড় থেকে বসিলা এবং গাবতলী সেতু এলাকায় ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর কোনোটিরই মামলা হয়নি। মোহাম্মদপুর থানার ওসি ইফতেখার হাসান বলেন, আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তৎপর আছি।

আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষ, খুন ও গোলাগুলিতে নিহত ৯ : গত ৫ আগস্টের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত শুধু মোহাম্মদপুরেই খুন হয়েছে ১০ জন। এসব খুনের নেপথ্য কারণ হচ্ছে আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও বাজার দখল। প্রকাশ্যে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া, গোলাগুলি যেন এই এলাকায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

মোহাম্মদপুরে জোড়া খুন : মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন বেড়িবাঁধে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন নাসির বিশ্বাস (২৯) ও মুন্না (২২)। তারা একই গ্রুপের সদস্য ছিলেন। নাসির পেশায় রাজমিস্ত্রি। খুন হওয়ার আগপর্যন্ত সর্দার হিসেবে তিনি ভবন নির্মাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সরবরাহ করতেন। বিগত সরকারের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে নাসির মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগ এলাকায় আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে পরিচিত।

পুলিশ বলছে, এ পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার চালিয়ে আসছিলেন নাসির। নাসিরের পেশা রাজমিস্ত্রি হলেও মুন্নার কোনো পেশা ছিল না। মুন্না মাদক, নাশকতাসহ অন্তত আটটি এবং নাসির দুটি মাদক মামলার আসামি।

ওই ঘটনার তিন দিন পর একটি মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। সেই মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার দিনই মিরাজ মোল্লা (২৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এ ছাড়া গত ১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের কুপিয়ে হত্যা হয় বিল্লাল গাজীকে। তাকে হত্যার আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। বিল্লাল স্থানীয় আকাশ নীলা ওয়েস্টার্ন হাউজিংয়ের স্টাফ ছিলেন। এ হত্যার মিশনে ছিল ৯ জন। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ে গ্রিন ভিউ হাউজিং এলাকায় বাসায় ঢুকে শাহাদাত হোসেন নামে এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় আরাম হাউজিং এলাকায় হাত-পা বেঁধে সিএনজিচালক শাহরিয়ার আশিককে (২১) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার ভোরে বসিলা ৪০ ফিট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলার পর ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

জেনেভা ক্যাম্পে চার খুন, নেপথ্যে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ : মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। রাজধানীর চিহ্নিত মাদক বিকিকিনির স্পটগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ঘিঞ্জি এই বস্তির মতো এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকার নানা ধরনের মাদক। ১২ বিঘা জায়গার ওপর ৫৫ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় এ কারবার করেই এখানে অধিকাংশ বসবাসকারীর জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ফলে এখানে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য ধরে রাখতে ৫ আগস্টের পর থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষ হচ্ছে মাদক কারবারিদের কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে। এ সংঘর্ষে মধ্যে পড়ে বা মাদক বিক্রিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় খুন হয়েছে চারজন। সর্বশেষ গত ১৬ অক্টোবর এ মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে নিহত হন ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা শাহনেওয়াজ কাল্লু (৩৮)। তিনি প্রয়াত আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে। কাল্লু স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। সেদিন রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ক্যাম্পের জালাল ডেকোরেটরের সামনে দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে পড়েন। কোনো একপক্ষের গুলিতে প্রাণ যায় তার। এ হত্যার বিচার দাবি করেন তার বোন নাসরিন আখতার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। যারা নিজেদের অবৈধ ব্যবসার জন্য আমার ভাইকে মেরেছে, তাদের কেন পুলিশ ধরে না।’

গতকাল জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, জি-ব্লকে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের তুমুল সংঘর্ষ চলছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ক্যাম্পের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ১০-এর অধিক গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোর মূলহোতা হচ্ছে ভূঁইয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, আরমান, পলু কসাই, সৈয়দপুরিয়া, ছটু মাসুদ, মনু, চারকু, রাজসহ একাধিক গ্রুপ। তাদের অধীনে ক্যাম্পের অন্তত ৫০০ অস্ত্রধারী আছে, যারা মাদক বিক্রি, মাদকের চালান ক্যাম্পে আনা ও নেওয়ার কাজ করে। এরাই বিভিন্ন সময় জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে। এসব কারণে গত দুই মাসে এ ক্যাম্পে হত্যার শিকার হয়েছেন শাহনেওয়াজ কাল্লু ছাড়াও ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক সানু, শাহেন শাহ ও মো. সাগর।

আগে এখানে সংঘর্ষ হতো দা, বঁটি কিংবা চাপাতি নিয়ে। সরকার পতনের পর সবাই স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, ৫ আগস্ট গণভবন ও বিভিন্ন থানা লুট করতে যায় ক্যাম্পের বাসিন্দারা। সেখান থেকেই বিপুল অস্ত্র তারা লুট করে। এসব অস্ত্র দিয়েই চলে এখন সংঘর্ষ।

বিহারি ক্যাম্পের এ অবস্থা নিয়ে গত শুক্রবার কথা হয় মোহাম্মদপুরের ওসি ইফতেখার হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানকার সমস্যাটা পুরনো। পুলিশ এখানে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছে। এখানকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে। তবে এখানে যেহেতু মাদককেন্দ্রিক সমস্যা, তাই এটায় নারকোটিক্স (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর) যদি নজর দেয়, তাহলে বেশি ভালো হয়।’

শিয়া মসজিদ এলাকায় বাজার দখলের জন্য দুজনকে গুলি : গত বৃহস্পতিবার বাজার কমিটির দখল নিতে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে মোহাম্মদপুর এলাকার মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড কাঁচাবাজারের মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন ও তার ছোট ভাই মাহবুবকে। এ ঘটনার নেপথ্য কারিগর হিসেবে বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেন। ঘটনার অল্প কিছুক্ষণ আগে বাজার কমিটির অফিসে আসেন স্থানীয় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচিত আবদুস সাত্তার ও রহমান। তারা এসেই কার অনুমতি নিয়ে আবুল হোসেন বাজার কমিটির পদে বসেছেন এসব বলে শাসাতে থাকেন। এর অল্প কিছুক্ষণ পরই তিনটি মোটরসাইকেলে করে ছয়জন অস্ত্রধারী সেখানে আসে এবং তার দিকে অস্ত্র তাক করে বাজার ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেন ও বাজারের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি গতকাল পর্যন্ত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। মাঠে যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। আশা করি দ্রুত সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে।