কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে মন্তব্য

ফেসবুকে কমেন্ট, ৯ বছর একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে বুয়েট অধ্যাপক

ফেসবুকে একটি পোস্টে মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. জাহাঙ্গীর আলমকে নানাভাবে হেনস্তা ও লাঞ্ছনা এবং শেষমেশ চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে।

জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির ঘটনায় ২০১৫ সালে ফেসবুকে একজনের একটি পোস্টে মন্তব্য করেন তিনি। আর তার ওই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের দিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, মিথ্যা অভিযোগে করা মামলায় হেনস্তা, বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা ও পরামর্শক থেকে অলিখিতভাবে বাদ দেওয়া, বুয়েট কোয়ার্টারের বাসা ছাড়তে বাধ্য করা এবং শেষমেশ ২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার।

এদিকে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বুয়েটের তৎকালীন  উপাচার্য অধ্যাপক সত্য প্রাসাদ মজুমদারের কথামতো চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন প্রত্যাহার করলেও তা এখনো কার্যকর করেনি প্রশাসন। সবমিলিয়ে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বুয়েট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হেনস্থার শিকার হলেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ জাহাঙ্গীর আলমের।

তবে জাহাঙ্গীর আলমের এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই বলে দাবি করেছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার।

গত ৯ আগস্ট জাহাঙ্গীর আলম চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন তুলে নিতে সাবেক উপাচার্য সত্য প্রাসাদ মজুমদারের কাছে আবেদন করেন। এরপর উপাচার্য পদত্যাগ করলে গত ২২ সেপ্টেম্বর নবনিযুক্ত উপাচার্যের কাছে ফের আরেকটি আবেদন করেন।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল দীপু সরকার নামে একজন ‘বুয়েটে আড়ি পেতে শোনা’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে ‘কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর’ শিরোনামে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন শেয়ার করেন। সেখানে চন্দ্র নাথ নামের একজন প্রথমে ‘জয় বাংলা’ লিখে মন্তব্য করেন। এর নিচে জাহাঙ্গীর আলম রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে ‘জয় মা কালী, জয় ইন্ডিয়া’ ও পরে সংশোধন করে ‘জয় ইন্ডিয়া, জয় মাসল পাওয়ার, জয় পলিটিকস’ লিখে মন্তব্য করেন।

ফেসবুকে অন্যরা এমন মন্তব্যের ব্যাখ্যা চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন সময়ে লেখেন, ‘জয় বাংলা শুধু একটি দলকেই উপস্থাপন করে’, ‘জয় বাংলাদেশ বলুন। এটা অরাজনৈতিক। জয় বাংলা দুটি দেশকে উপস্থাপন করে।’  সবশেষে একটি মন্তব্য করেন। তা হলো,  ‘কারেক্টেড: জয় ইন্ডিয়া, জয় মাসল পাওয়ার, জয় নেসটি পলিটিকস, জয় ইনজাস্টিস (সংশোধিত: ভারত, পেশিশক্তি, কদর্য রাজনীতি ও অবিচারের জয়)’। 
এসব মন্তব্যের জেরে বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি শুভ্রজ্যোতি টিকাদার এবং সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ কনকের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলমকে মারধর করা হয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে বিবৃতি ও  ১৩ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয় তৎকালীন শিক্ষক সমিতি। পরে হামলাকারীদের শনাক্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরপর হামলায় জড়িত অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও দেয় বুয়েট প্রশাসন।

তবে এরপরই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ পুরো ক্যাম্পাসে শোডাউন করে বুয়েট প্রশাসনকে চাপে ফেললে তারা আর মামলার অগ্রগতি নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। পরে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আবেদনের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং তাদের ছাত্রত্বও বহাল রাখা হয়।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ফেসবুকের একটি কমেন্টকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একদল ছাত্র আমাকে হেনস্থা করে, গায়ে হাত তোলে এবং অপমান করে। পরে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খানের প্ররোচনায় সিয়াম হোসেন নামে বুয়েটের এক ছাত্র আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। আর ঘটনার একমাস পরে আবদুল জব্বার খানের প্ররোচনায় এবং প্রত্যক্ষ মদদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. ফয়েজ উল্লাহ নামে এক ছাত্র আমার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে। আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলাই এখনো চলমান আছে।’

অধ্যাপক আবদুল জব্বার তাকে জোর করে ডিপার্টমেন্টের কনসালটেন্সি থেকে বাদ দেন উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সভায় আমাকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সিদ্ধান্তের পর আবদুল জব্বার খানের অলিখিত নির্দেশে আমাকে ডিপার্টমেন্টের কনসাল্টেন্সি কাজ থেকেও বাদ দেয়া হয়। যার কারণে, আমি আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার উপর হামলার প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পরে তারা ছাড়া পেয়ে একাডেমিক ক্লাস-পরীক্ষায় যোগ দিলেও আমার বিরুদ্ধে মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। আমাকে দীর্ঘদিন ধরেই হেনস্থা করা হচ্ছে এবং সে মামলাগুলো এখনো রয়েছে। সেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বুয়েটের কর্তৃপক্ষ কোনো আপীল করেনি এবং মামলা সঠিকভাবে পরিচালনার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, বুয়েট কর্তৃপক্ষ ঘটনার তথ্যপ্রমাণ ও আলামত সরিয়ে ফেলা এবং ধ্বংস করার মত হীন কাজ করেছে বলে আমি শুনেছি। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ে ছাত্রদের বহিষ্কার পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়।’

একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরে যেতে দফায় দফায় আবেদন করেও কোনো ফল পাননি উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন,     ‘বিগত ৯ বছরে কয়েকবার আমি বুয়েট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করি আমার একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় বহাল করার জন্য। কিন্তু, কোনও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২০২০ সালে বিষয়টি সিন্ডিকেটে তোলার সিদ্ধান্ত হলেও তৎকালীন উপ-উপাচার্য আবদুল জব্বার সেটাকে বাতিল করে দেন।’

২০২০ সালে ড. আবদুল জব্বার খান উপ-উপাচার্য হলে বিভিন্ন লোক দিয়ে তাকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন এবং মামলার ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পাসের বাসা ছেড়ে দিতে বলেন অভিযোগ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে ক্যাম্পাসের বাসা ছেড়ে দিই। এরপরও, তৎকালীন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আমার উপর চাকরি ছেড়ে দেয়ার চাপ অব্যাহত রাখে। ভয়ভীতি এবং চাপের মুখে, আমি ২০২২ সালে চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অধ্যাপক জব্বার বুয়েট ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি ছিলেন এসবের মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু তিনি কখনো সামনে আসতেন না।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক ড আব্দুল জব্বার বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। কাউকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা শুধু প্রশাসনের রয়েছে। আর আমি ২০১২-২০ সাল পর্যন্ত বুয়েটের কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলাম না। এ সময় আমি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ছিলাম।’

এদিকে জাহাঙ্গীর আলমকে চাকরিতে ফিরিয়ে নিতে সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের সাথে আমার কথা হয়েছে। তার প্রতি যদি অন্যায় করা হয় আমরা অবশ্যই চাইবো তিনি যেন ন্যায়বিচার পান। উনি বিস্তারিত জানিয়ে আমাদের চিঠি দিয়েছেন, সেটা এখন সিন্ডিকেটে রয়েছে। সিন্ডিকেটে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী এখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অধ্যাপক আবদুল জব্বারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক জাহাঙ্গীর তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন সেটা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। তদন্তের পরে বিস্তারিত জানা গেলে সে অনুযায়ী প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’