মধ্যরাতে ইরানে ইসরায়েলি হামলা

ইসরায়েলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঠিক ২৫ দিন পর দেশটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার দূরে ইরানে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত প্রায় ২টার দিকে ইরানের রাজধানী তেহরান খুজেস্তান ও ইলাম প্রদেশের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এসব হামলায় খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি দাবি করলেও দুই সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে তেহরান।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গতকাল মধ্যরাতে ইরান থেকে বিস্ফোরণ ঘটার খবর আসতে শুরু করে, এতে দেশটিতে ইসরায়েল পাল্টা হামলা শুরু করেছে এমন ইঙ্গিত পরিষ্কার হতে থাকে। এরপর থেকে পরবর্তী তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিন ধাপে তীব্র হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ডজন ডজন যুদ্ধবিমান ও আকাশযান ইরানের রাজধানী তেহরানে এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান ও ইলাম প্রদেশে সামরিক কমপ্লেক্স, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা এবং স্থল থেকে স্থলে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোকে লক্ষ্যস্থল করে।

অবশ্য ইরান জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সফলভাবে ইসরায়েলি হামলা প্রতিরোধ করতে পেরেছে, তারপরও দুই সেনা নিহত হয়েছেন এবং কিছু স্থানে সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েলি হামলার আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে বলে ইরানের আধা স্বায়ত্তশাসিত একটি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে।

বিবিসি বলছে, প্রথম ধাপে রাত ২টায় তেহরানের পাশাপাশি সিরিয়া ও ইরাকে থেকেও বিস্ফোরণের খবর আসে। এ সময় তিনটি দেশেরই আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। হামলার প্রথম ধাপে তিনটি দেশেরই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্যস্থল করা হয় বলে বিভিন্ন খবরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তবে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী যেন কোনো বাধা ছাড়াই ইরানের লক্ষ্যস্থলগুলোতে হামলা চালাতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই প্রথম ধাপের হামলাগুলো চালানো হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ঘটনার সময় পরিস্থিতি পরিষ্কার ছিল না। বিস্ফোরণের শব্দে তেহরানের আতঙ্কিত বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে আসেন। ইরানের রাজধানীর বিমানবন্দরগুলোতে আঘাত হানা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছিলেন তারা।

ইসরায়েলের স্থানীয় সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র নিশ্চিত করে বলেন, আইডিএফ ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট হামলা শুরু করেছে। এটা চলতি মাসের প্রথমদিকে ইসরায়েলে চালানো ইরানি হামলার জবাব। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিবিসি জানায়, ইসরায়েলে ইরানের কোন স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানছে তা পরিষ্কার নয়। ওই সময় তেহরান দাবি করে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্বাভাবিক আছে। সামরিক লক্ষ্য ছাড়া অন্য কোনো স্থাপনাকে লক্ষ্যস্থল করা হচ্ছে কি না, ইসরায়েল তখনও তা প্রকাশ করেনি।

স্থানীয় সময় প্রায় ৩টার দিকে ইসরায়েল জানায়, যেসব ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিস্তারিত হালনাগাদ তথ্য দিয়ে অবহিত করেছে। এর প্রায় আধাঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন জানায়, ইরানে হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত নয়, কিন্তু তাদের এ হামলার বিষয়ে জানানো হয়েছে। এরপর ভোররাত সোয়া ৪টার দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে ইরানে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য জানানো হয়েছে।

ভোররাত ৪টার আগ পর্যন্ত ইরানের কোথায় ও কোন স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সে বিষয়ে অন্ধকারেই ছিল। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো খবর দেয়, সিরিয়া জানাচ্ছে ইসরায়েল তাদের দেশের কেন্দ্রস্থলে ও দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক এলাকাগুলোতে বিমান হামলা চালাচ্ছে। এরপর ইরান থেকে আরেক ধাপের হামলার খবর আসতে শুরু করে।

এ সময় ইরান তাদের আকাশে হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করছে এমন কিছু ফুটেজ গণমাধ্যমের হাতে আসে। এ পর্যায়ে ইসরায়েল ইরানের স্থল থেকে স্থলে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানাগুলোতে আঘাত হানে বলে এ বিষয়ে জ্ঞাত ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা দেশটির ওয়াইনেট নিউজ ওয়েবসাইটকে জানান।

ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলোর পাইলটরা শত্রু দেশের আকাশে থাকা অবস্থায়ই দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট অপারেশনস ডিরেক্টরেটের কমান্ডের বাঙ্কারে বসে আছেন, এমন ছবি প্রকাশ করতে শুরু করে নেতানিয়াহুর দপ্তর।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, সর্বশেষ পর্যায়ের হামলা ভোর ৫টা বাজে শুরু করে প্রায় আধঘণ্টার মধ্যেই শেষ করা হয়। এ সময় ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, ইউএভি ও উৎক্ষেপণ স্থানগুলোতে হামলা চালানো হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০ ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যে আঘাত হানা হয়েছে।

এদিকে ভোর ৬টায় আইডিএফ ঘোষণা করে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও স্থল থেকে স্থলে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে আঘাত হানার পর নিরাপদে ফিরে এসেছে। এ সময় তারা জানায়, ইরানে চালানো সামরিক অভিযানের নাম অনুতাপের দিন।

এরপর ইরানের কী কী স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে এক বিবৃতিতে তার বিস্তারিত তুলে ধরে তারা। আইডিএফের এ ঘোষণার প্রায় ২০ মিনিট পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় হোয়াইট হাউজের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে পুরোপুরি সমর্থন করে আর ইরানকে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা না চালানোর জন্য সতর্ক করেছে। তবে ইসরায়েলের ধারণা, ইরান এ হামলারও জবাব দেবে।

রাতভর ইসরায়েলের হামলায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করার পর ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ইরান প্রথমবারের মতো জানায়, বেশ কয়েকটি এলাকায় সীমিত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ইসরায়েলি আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে পেরেছে।

এদিকে ইরানে ইসরায়েলের হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর। রয়টার্স জানায়, ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অব্যাহত উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরবও ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যস্থল করার মাধ্যমে দেশটির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে। এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেছে রিয়াদ, জানিয়েছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ।

কাতার ও কুয়েত পৃথকভাবে ইরানে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এ হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মিশর।

শনিবার সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাস লিখেছেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক সংঘাত ও সেগুলোর দুর্ভাগ্যজনক মানবিক ও রাজনৈতিক প্রতিফলের পর এই অঞ্চলের একটি ভিন্ন পথ দরকার যেটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে এবং যোগাযোগ ও সংলাপের পরিস্থিতি তৈরি করে উত্তেজনা, সংঘাত হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।