কম খরচে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত সবজি, ফল ও মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ঢাকায় পৌঁছাতে চালু করা হয়েছে ‘কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন’। তবে উদ্বোধনী দিনেই কৃষিপণ্য ছাড়া ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে ট্রেনটি, পরিবহনের জন্য এক কেজি পণ্যও পায়নি। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হয়। এদিন রহনপুর-ঢাকা রুটের ট্রেনটি শুধুমাত্র ডিম পরিবহনের ১৫০ কেজি খালি ক্যারেট (খাঁচি) পরিবহন করেছে।
যাত্রাপথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও আমনুরা রেলওয়ে জংশনেও কোনো পণ্য বুকিং না হওয়ায় খালি বগি নিয়েই ঢাকায় পৌঁছায় বিশেষ এই ট্রেনটি। প্রথম দিনেই পুরো লোকসানে চলেছে। এদিন ট্রেনটির পেছনে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসান গুনতে হয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৭২ টাকা। সময়সূচি ও অন্যান্য জটিলতার কারণে ‘কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন’ কৃষক ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন’-এ সাতটি বগি (লাগেজ ভ্যান) আছে। এর মধ্যে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, অন্য ছয়টি সাধারণ বগি। অত্যাধুনিক লাগেজ ভ্যানে কৃষিপণ্যের মধ্যে ফল, সবজি ছাড়াও রেফ্রিজারেটেড লাগেজ ভ্যানে হিমায়িত মাছ, মাংস ও দুধ পরিবহনের ব্যবস্থা আছে। সংশ্লিষ্ট পণ্যের সঙ্গে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ঢাকায় যাওয়ার জন্য অন্তত ২০টি চেয়ার আছে। সপ্তাহে এক দিন অর্থাৎ প্রতি শনিবার সকালে রহনপুর থেকে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। ট্রেনটির পণ্য ধারণক্ষমতা ১০ টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে ঢাকার তেজগাঁও রেলস্টেশনে পৌঁছাবে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে। এতে প্রতি কেজি কৃষিপণ্য পরিবহনে খরচ পড়বে ১ টাকা ৩০ পয়সা।
আর রাজশাহী থেকে তেজগাঁও এক কেজি কৃষিপণ্য পৌঁছাতে খরচ হবে ১ টাকা ১৮ পয়সা। রহনপুর রেলস্টেশন থেকে কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে ১৩টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে তেজগাঁও স্টেশনে থামবে। নাচোল, আমনুরা জংশন, কাঁকনহাট, রাজশাহী, সরদহ, আড়ানি, আব্দুলপুর, আজিমনগর, ঈশ্বরদী বাইপাস, চাটমোহর, বড়ালব্রিজ ও জয়দেবপুরে থামবে ট্রেন।
রহনপুর থেকে ঢাকা ৩৪৬ কিলোমিটার দূরত্বের রুটে চলতে ট্রেনটির খরচ হবে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩২। কিন্তু প্রথম দিনে ট্রেনটিতে গেছে শুধু ডিম পরিবহনের ১৫০ কেজি খালি ক্যারেট। এতে আয় হয়েছে মাত্র ৩৬০ টাকা। এই হিসাবে প্রথম দিনে ট্রেনটির পেছনে লোকসান গুনতে হয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৭২ টাকা।
রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মামুন আলী বলেন, ‘রাতে পণ্যবাহী স্পেশাল ট্রেনটি রহনপুর স্টেশনে এসেছিল। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কোনো কৃষিপণ্য ছাড়াই ট্রেনটি ছেড়ে গেছে। এই ট্রেনে কেউ কোনো সবজি পরিবহন করেননি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি স্টেশন থেকেই কৃষিপণ্য পরিবহনের কথা ছিল বিশেষ ট্রেনটির। পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশন থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন বনলতাতেও একটি লাগেজ যুক্ত হয় কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য। প্রস্তুতি থাকলেও কোনোটিতেই পণ্য বুকিং হয়নি।’
রাজশাহী স্টেশন ম্যানেজার শহিদুল আলম বলেন, ‘আজকে (গতকাল) ট্রেনটির উদ্বোধন হলো। রাজশাহী থেকে কোনো সবজি বুকিং হয়নি।’
ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন, সরদহ রোড, আড়ানি, আব্দুলপুর, আজিমনগর ও চাটমোহর স্টেশন মাস্টার নিশ্চিত করেছেন, তাদের স্টেশন থেকে কোনো কৃষিপণ্য বুকিং হয়নি।
রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ বলছে, কৃষকের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসায়ীদের সমন্বয় না হওয়া ও আবহাওয়া খারাপের কারণে প্রথম দিন সবজি আসেনি। তবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রেনে কৃষিপণ্য বহনের খবর তারা অনেকে জানেনই না।
রহনপুর এলাকার বাসিন্দা আরাফাত রহমান জানান, পিকআপের থেকে ট্রেনের ভাড়া কম। তবে ট্রেনে পণ্য পরিবহন করতে এই ভাড়ার পাশাপাশি কুলি খরচ, ফসলের মাঠ থেকে স্টেশন এবং স্টেশন থেকে মোকামের আলাদা পরিবহন খরচ পড়ে যাচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ টাকার বেশি। অথচ সড়কপথে ট্রাকে মাল পরিবহন করতে তাদের খরচ হয় কেজিপ্রতি দুই থেকে আড়াই টাকা।
শফিকুর রহমান নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘ট্রেনের সময় সকালে হওয়ায় পণ্য বাজারজাত নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। মূলত আমাদের সড়কপথে সবজি ঢাকায় যায়। আমরা সন্ধ্যায় যাত্রা শুরু করে ফজরের আজানের সময় ঢাকায় পৌঁছেই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এই ট্রেনের সময় সকালে, তাহলে আমরা বিক্রি করব কখন?’
রাজশাহী মহানগর পাইকারি কাঁচাবাজার সমিতির সভাপতি ফাইজুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনটি আমাদের জন্য ভালো হবে। আমরা এটি ব্যবহার করতে পারলে বেশ সুবিধাও হবে। তবে ট্রেনটি যে চালু হবে সেটি আমরা জানি না। আমাদের কেউ জানায়নি কীভাবে বা কখন চালু হবে। জানলে হয়তো কিছু মাল পাঠাতে পারতাম।’
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনটি চালুর সময় সাংবাদিকদের পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা একেএম রুহুল আলম জানান, কৃষিপণ্য স্পেশাল টেনটি গত ২২ অক্টোবর খুলনা, এরপর পঞ্চগড় থেকে চালু হয়েছে। আর গতকাল চালু হলো রাজশাহী থেকে। কৃষকরা তাদের পণ্য যাতে ঢাকায় নিয়ে ন্যায্যমূল্য পায় সেটির লক্ষ্যেই এটি চালু করা হয়েছে। প্রথম দিনে পণ্য না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সবজায়গাতেই প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি। গত পরশু দিনও মুলাডলি বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আশ্বস্ত করেছেন। আশা করছি সামনে এই ট্রেন ভালো সাড়া ফেলবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা চালিয়েছি। কৃষি বিপণন ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমেও প্রচার করেছি। মূলত কৃষকদের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসায়ীদের সমন্বয় নেই। পাশাপাশি কয়েক দিন ধরে আবহাওয়া ভালো নেই, তাই হয়তো কৃষক ফসল সংগ্রহ করতে পারেননি।’