সালটা ২০০৪, ছোট রাজন গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য ভিকি মলহোত্রা ব্যাংকক থেকে ফোন করে ইন্দোরের এক মদের ব্যবসায়ীর কাছে ৪ কোটি টাকা দাবি করেন। কথা না মানলে ব্যবসায়ীকে অপহরণ করা হবে বলেও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ইন্দোর পুলিশকে হুমকির বিষয়ে জানান ওই ব্যবসায়ী।
যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, সেই নম্বরই মুম্বাইয়ের ক্রাইম ব্রাঞ্চকে জানিয়ে দেয় ইন্দোর পুলিশ। এরপর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল ওই ফোন নম্বর। পরে ২০০৫ সালে ভিকি মলহোত্রা ভারতে আসেন। মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘অসাবধানতাবশত’ সেই সিমকার্ড ব্যবহার করেন যার মাধ্যমে এর আগে ইন্দোরের ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
মুম্বাই পুলিশ সতর্ক হয়ে যায় এবং পরের ফ্লাইটে ভিকি মলহোত্রা দিল্লি পৌঁছালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যেহেতু ভিকি মলহোত্রার বিরুদ্ধে ইন্দোরে মামলা করা হয়েছিল, তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব বিবরণ বিশদভাবে তার বই ‘শাকেল দ্য স্টর্ম’-এ লিপিবদ্ধ করেছেন মধ্যপ্রদেশ পুলিশের সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব।
ভিকি মলহোত্রাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়েও ওই বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘আমি ভিকির উপর থার্ড ডিগ্রি ব্যবহার করিনি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম সে কি খেতে চায়। উত্তরে (ভিকি মলহোত্রা) বলেছিল, সে নিরামিষাশী এবং ইডলি খেতে ভালোবাসে।’
‘আমি মদপানের প্রস্তাবও দিয়েছিলাম কিন্তু ভিকি জানিয়েছিল সে মদ পান করেন না। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চান কি না জিজ্ঞাসা করলে তার উত্তর ছিল-হ্যাঁ। ওর স্ত্রী ও ছেলেকে ইন্দোরে ডেকে পাঠানো হয় দেখা করার জন্য।’
অপরাধ জগতের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ভিকি মলহোত্রার মধ্যে হঠাৎই পরিবর্তন আসে এবং তিনি শ্রীবাস্তবকে নিজের কথা সবিস্তারে জানান। সে বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে ওই বইয়ে। শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘একদিন সোফায় বসে ভিকির সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম, হঠাৎ সে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে এবং আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে তার জীবন এবং বিভিন্ন অভিযান ম্পর্কে উন্মোচন করতে শুরু করে।’
শাহরুখ খান অভিনীত চরিত্রের অনুকরণে নাম
ভিকি মলহোত্রার আসল নাম বিজয় কুমার ইয়াদভ। তিনি একসময় পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা ছিলেন। ছোটবেলায় ছোটখাটো অপরাধ করতেন। পরে মুম্বাইয়ে চলে আসেন।
কিন্তু বিজয় কুমার ইয়াদভ কীভাবে ভিকি মলহোত্রা হয়ে উঠলেন?
শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তবের কথায়, ‘ভিকি আমাকে বলেছিল— সে একবার মুম্বাইয়ের একটা গয়নার দোকান থেকে হীরা চুরি করার পর বন্ধুদের সঙ্গে শাহরুখ খান অভিনীত ছায়াছবি বাজিগর দেখতে গিয়েছিল। সেখানে শাহরুখের চরিত্রের নাম ছিল ভিকি মালহোত্রা।’
এরপর সেই চরিত্রের অনুকরণে সহযোগীরা তার নাম বিজয় কুমার যাদব থেকে বদলে ভিকি মালহোত্রা রাখেন। অন্ধকার জগতে প্রবেশের পর ‘নানা’ নামে পরিচিত ছোট রাজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তার ডান হাত হয়ে ওঠেন ভিকি মলহোত্রা।
দাউদ গোষ্ঠীতে ছোট রাজনের প্রবেশ
অপরাধ জগতে ছোট রাজনের সফর বেশ আকর্ষণীয়। একসময় দাউদ ইব্রাহিমের ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিলেন তিনি। ওই গোষ্ঠীতে থেকে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাকে টপকে কোনো কারবার বা অপরাধমূলক অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না। প্রসঙ্গত একসময় দাউদ ইব্রাহিমের বিশ্বস্ত সহযোগী থেকে ‘শত্রু’তে পরিণত হন তিনি। সেই কাহিনীও বেশ রোমাঞ্চকর।
ছোট রাজনের আসল নাম রাজেন্দ্র নিখালজে। তিনি চেম্বুরে সিনেমার টিকিট ‘ব্ল্যাকে’ বিক্রি করতেন। একবার পুলিশ তাকে ধরতে গেলে তিনি লাঠি কেড়ে নিয়ে তাদেরই মারধর করেন।
‘বড় রাজন’ গোষ্ঠীতে তার প্রবেশ ১৯৮০ সালে। আব্দুল কুঞ্জুর হাতে বড়া রাজনের মৃত্যু হলে এর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা করেন রাজেন্দ্র নিখালজে। বড় রাজনের হত্যাকারী আব্দুল কুঞ্জুকে হত্যার সব প্রাথমিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দাউদ ইব্রাহিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন রাজেন্দ্র নিখালজে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে লেখক এস হুসেন জাইদির বই ‘ডোংরি তো দুবাই: সিক্স ডিকেডস অফ দ্য মুম্বাই মাফিয়া’-তে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ‘দাউদের গ্যাংয়ে যোগ দেওয়ার পর একটা ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন কুঞ্জুকে খুন করেছিল রাজেন্দ্র নিখালজে।’
‘কুঞ্জু ম্যাচ খেলছিল। হঠাৎই সে দেখতে পায় সাদা প্যান্ট ও শার্ট পরা অপরিচিত লোকজন তার সঙ্গে ক্রিকেট খেলছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ওর ওপর হামলা চালায়।’
ছোট রাজনের প্রতি ‘ঈর্ষা’
ছোট রাজন যে ধীরে ধীরে দাউদের নিকটবর্তী এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি বৃত্তে ঢুকে পড়ছিলেন তাই নয়, ওই গোষ্ঠীর মস্তিষ্ক এবং শক্তিও হয়ে উঠেছিলেন। দাউদ ইব্রাহিম তাকে খুব বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
তখন ‘ডি কোম্পানিতে’ (দাউদের গোষ্ঠী) প্রায় ৫ হাজার লোক কাজ করত। ছোট রাজনের জন্যই তার গোষ্ঠীতে সামিল হয়েছিলেন সাধু শেট্টি, মোহন কোটিয়ান, গুরু সাতম, রোহিত ভার্মা, ইন্ডিয়া নেপালির মতো অপরাধীরাও। কিন্তু ধীরে ধীরে দাউদ গ্যাংয়ের পুরনো সদস্যদের ঈর্ষার পাত্র হয়ে ওঠেন ছোট রাজন।
লেখক হুসেন জাইদি লিখেছেন, ‘শরদ শেট্টি, ছোট শাকিল এবং সুনীল সাওয়ান্ত কিন্তু ছোট রাজনকে পছন্দ করতেন না। রাজনের অনুমতি ছাড়া মুম্বাইয়ে ব্যবসা বা কারও খুন করা সম্ভব ছিল না। এই সমস্ত কারণে রাজনের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তারা।’
‘একদিন এক মদের আসরে শরদ শেট্টি দাউদকে বলেছিলেন, ছোট রাজনও বিদ্রোহ করতে পারে। ধীরে ধীরে এই কথাগুলো দাউদের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ছোট রাজনকে আস্তে আস্তে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা শুরু হয়।’
দাউদ ও ছোট রাজনের মধ্যে দূরত্ব
দু’জনের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হচ্ছিল। এই ব্যবধান আরও বেড়ে যায় মুম্বাই বিস্ফোরণের সময়। এই হামলার আগে যে বৈঠকগুলো হয়েছিল তা থেকে ছোট রাজনকে পুরোপুরি দূরে রেখেছিলেন দাউদ ইব্রাহিম। অন্যদিকে ছোট শাকিল কিন্তু নিয়মিতভাবে সেই বৈঠকগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনা নাড়া দিয়েছিল ছোট রাজনকে।
১৯৯৩-৯৪ সালে তার এবং দাউদ ইব্রাহিমের মধ্যে দূরত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। ওই বছরই একটা বিলাসবহুল ক্রুজলাইনারে ঘনিষ্ঠজনদের জন্য পার্টির আয়োজন করেছিলেন দাউদ ইব্রাহিম।
জাইদি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘ওই পার্টিতে যাওয়ার আগে ছোট রাজনের কাছে একটা ফোন আসে এবং সমস্ত কথা শুনে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তি জানান, ওই পার্টিতে তাকে (ছোট রাজনকে) খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
‘এরপর (ছোট রাজন) আবু ধাবিতে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুবাই থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদের সহায়তা চায়। এর বিনিময়ে দাউদ সম্পর্কে সমস্ত তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব দেন।’
‘অবশেষে ছোট রাজনের দুবাই থেকে পালানোর পরিকল্পনায় সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় দূতাবাস। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে অন্য নামে প্রথমে কাঠমান্ডু এবং পরে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই ছোট রাজনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় দাউদ ইব্রাহিম ও তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে শেষ করে দেওয়া।’
ছোট রাজনের ওপর দাউদের অনুসারীদের হামলা
দুবাই থেকে করাচিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন দাউদ ইব্রাহিম। অন্যদিকে, ব্যাংককে থেকে যান ছোট রাজন। তিনি (ছোট রাজন) কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন তা খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন দাউদ ইব্রাহিম ও তার লোকজন। একদিন ছোট শাকিলের নির্দেশে মুন্না ঝিংরা ও তার সহযোগীরা ছোট রাজনের ব্যাংককস্থিত অ্যাপার্টমেন্টে হামলা চালায়। তারা প্রথমে ছোট রাজনের কেয়ারটেকার রোহিত ভার্মাকে গুলি করে এবং পরে তার স্ত্রী সঙ্গীতা, মেয়ে ও পরিচারিকাকে আহত করে।
শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘ছোট রাজন তার ফ্ল্যাটের শয়নকক্ষে লুকিয়ে ছিল। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। সেই শয়নকক্ষের বন্ধ দরজায় এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয়।’
‘জানালা থেকে নীচে ঝাঁপ দেন ছোট রাজন। এই তথ্য জানতে পেরেই পুলিশে খবর দেন ভিকি মলহোত্রা। পুলিশ সেখানে পৌঁছে ফ্ল্যাটের পেছনে একটা গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায় ছোট রাজনকে। সেখান থেকে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে ভিকি তার ছায়াসঙ্গীর মতো সবসময় ছিল।’
জন্মদিনের কেকের অজুহাতে ঘরে প্রবেশ
জাইদি তার বইয়ে এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কালো স্যুট পরা চারজন থাই পুরুষ ছোট রাজনের বাড়ির গেটে এসে হাজির হয়। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন জন্মদিনের জন্য তৈরি একটা বড় কেক।’
গেটে মোতায়েন রক্ষীকে বলা হয়েছিল, ‘আজ রাজনের সহকর্মী মাইকেল ডিসুজার মেয়ের জন্মদিন। তাই ভারতীয় বন্ধুরা তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এই কেক পাঠিয়েছে।” কী করনীয় এই ভাবনাতে যখন ব্যস্ত ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী তখনই তার হাতে ২০০ ডলারের নোট গুঁজে দেয় আগত ব্যক্তিরা।’
গেট খুলে দেন রক্ষী এবং গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে ওই চারজন। ‘রক্ষী গেট বন্ধ করতে যাবেন এমন সময় হঠাৎই চারজন ভারতীয় এসে তার ওপর চড়াও হন এবং বেঁধে ফেলেন। রাজন ও ভার্মার মালিকানাধীন দোতলার ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ে দাউদের অনুগামীরা।’
জাইদি লিখেছেন, ‘কেয়ারটেকার ভার্মা ফ্ল্যাটের দরজায় ওই ব্যক্তিদের দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছোট রাজনকে সতর্ক করার আগেই তাকে (রোহিত ভার্মাকে) হত্যা করা হয়।’
‘রাজনকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে তারা শয়নকক্ষের বন্ধ দরজায় এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। এর মধ্যে একটা গুলি দরজা ভেদ করে ছোট রাজনের পেটে লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় জানালা দিয়ে লাফিয়ে নেমে ঘন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে সে। পুরো ব্যাপারটা ঘটাতে সময় লেগেছিল পাঁচ মিনিট।’
হাসপাতাল থেকে পলাতক ছোট রাজন
বিজয় দমন-এই ভুয়ো নাম ব্যবহার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছল ছোট রাজনকে। কিন্তু গুজব ছড়াতে শুরু করে যে তাকে ব্যাংককে হত্যা করা হয়েছে। ভারতীয় এজেন্সিগুলো দ্রুত খবর পায়, ব্যাংককে ছোট রাজনের চিকিৎসা চলছে। তাকে প্রত্যর্পণের জন্য চেষ্টা শুরু হয়। সিবিআইয়ের একটা দল থাইল্যান্ড যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
এরই মধ্যে ছোট রাজনকে হাসপাতাল থেকে বের করে আনার জন্য সেখানকার কর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন ভিকি মালহোত্রা।
শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘এরই মধ্যে ভিকি ভারতে এসে এখান থেকে ছোট রাজনের আদলে একটা পুতুল তৈরি করে এবং বড় একটা স্যুটকেসে ঢুকিয়ে ব্যাংকক নিয়ে যায়। ভিকি আমাকে বলেছিলেন এর জন্য দু’বার ভারতে এসেছিল সে।’
‘প্রথমবার রাজনের আদলে তৈরি পুত্তলিকার উপরের অংশ এবং দ্বিতীয়বার নিচের অংশ ব্যাংককে নিয়ে যায়। একটা বড় দড়িও কিনছিল। তারপর রাজনের আদলে তৈরি পুতুলের দুই অর্ধাংশ জুড়ে চাদর দিয়ে ঢেকে হাসপাতালে ছোট রাজনের বিছানায় শুইয়ে দেয়। দড়ির সাহায্যে জানালা দিয়ে নিচে নেমে আসে রাজন। সিবিআই টিমকে খালি হাতেই ভারতে ফিরতে হয়েছিল সেবার।’
মেয়ের শেষকৃত্যে দাউদকে হামলার পরিকল্পনা
এদিকে ছোট রাজনও দাউদ ইব্রাহিমের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার (দাউদ ইব্রাহিমের) মেয়ের মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যের সময় দাউদ ইব্রাহিমকে খুনের চেষ্টা করা হয়। এই অভিযানের জন্য নেপালি পাসপোর্টে কাঠমান্ডু থেকে করাচী গিয়েছিলেন ভিকি মলহোত্রা।
শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব ব্যাখ্যা করেছেন, ‘করাচিতে এক অস্ত্র পাচারকারীর কাছ থেকে দু’টো একে-৪৭ রাইফেল কিনেছিল ভিকি। পরিকল্পনা ছিল, দাউদ যখন তার মেয়েকে কবরস্থানে সমাধিস্থ করতে আসবে তখনই তার ওপর হামলা হবে। কিন্তু আইএসআই গুপ্তচররা অস্ত্র পাচারকারীকে ধরে ফেলে। ক্রমে দু’জন নেপালি ছেলেকে দু’টো একে-৪৭ রাইফেল বিক্রি করার কথা স্বীকার করে নেয় সে।’
‘ফলস্বরূপ দাউদ সাবধান হয়ে যায় এবং সে কবরস্থানে যায়নি। ভিকি ও তার সঙ্গী কবরস্থানে পৌঁছে দেখে, গোটা এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দাউদকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা সেখানে রাইফেল ফেলে দিয়ে কোনওমতে বালুচিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে পৌঁছয়।’
দুবাইয়ে দাউদের ওপর হামলার চেষ্টা
এরপরেও দাউদ ইব্রাহিমকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে সম্পর্কে শ্রীবাস্তব বলেন, ‘এবার ভিকি এবং তার সঙ্গী বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্রথমে নেপালে পৌঁছয় এবং সেখান থেকে করাচী যায়। তারা দু’টো একে-৪৭ রাইফেল এবং দু’টো পিস্তল কেনে। একটা এলইডি টিভি সেটও কেনে তারা যার ভিতর তাদের এই অস্ত্র লুকিয়ে রাখে।’
‘সেখানে ভিকি ৬০ কোটি টাকা দিয়ে একটা প্রমোদতরী কিনে সমুদ্রপথে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সঙ্গে ছিল টিভি সেটে লুকানো সেই রাইফেল ও পিস্তল। ইন্ডিয়া ক্লাবের বিপরীতে ৫৬ তলা উঁচু ভবনে ফ্ল্যাট ভাড়া নেয় তারা।’
ভিকি মলহোত্রা ও তার সঙ্গীরা দাউদ ইব্রাহিমের অপেক্ষায় ওই ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু বহু মাস কেটে গেলেও ইন্ডিয়া ক্লাবে আসেননি তিনি (দাউদ ইব্রাহিম)। এরই মধ্যে তাদের (ভিকি মলহোত্রা এবং তার সঙ্গীদের) ওপর সন্দেহ হয় দুবাই পুলিশের। তাদের ফ্ল্যাটে তল্লাশিও চালানো হয় কিন্তু কোনও অপরাধমূলক কিছু পাওয়া যায়নি সেখানে।
শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘এরপরই ভিকি বুঝতে পারেন দুবাই পুলিশ ও দাউদের নজরে চলে এসেছে সে। একদিন ওই টিভি সেট থেকে অস্ত্র বের করে তারা ইন্ডিয়া ক্লাবে হামলা চালায়। সেখানেই ২০০৩ সালের ১৯শে জানুয়ারি দাউদের সহযোগী ‘ড্যানি’ নামে পরিচিত শরদ শেট্টিকে হত্যা করে।’
করাচিতে দাউদের ‘ঘাঁটি’ তৈরি
এরপর পাকিস্তানের করাচিতেই ঘাঁটি তৈরি করেন দাউদ ইব্রাহিম। শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘ভিকি জানিয়েছে যে দাউদ এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩টা নাম ব্যবহার করেছে। তার কাছে পাকিস্তানের দু’টো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটা এবং ইয়েমেনের একটা পাসপোর্টসহ বেশ কয়েকটা দেশের পাসপোর্ট আছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আছেন স্ত্রী মেহজাবিন শেখ, ছেলে মঈন নওয়াজ এবং দুই মেয়ে মাহরুখ ও মেহরিন।’
‘তার তৃতীয় মেয়ে মারিয়ার মৃত্যু হয় ১৯৯৮ সালে। মাহরুখ ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদের ছেলে জুনায়েদকে বিয়ে করেছেন এবং আরেক মেয়ে মেহরিন পাকিস্তানি-আমেরিকান নাগরিক আইয়ুবকে বিয়ে করেছেন।’
তিহার জেলে ছোট রাজন
ছোট রাজনের বিরুদ্ধে ‘রেড কর্নার’ নোটিস জারি করেছিল ইন্টারপোল। ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে ভারতীয় পুলিশের হাতে তাকে তুলে দিলে দিল্লি নিয়ে আসা হয়। আপাতত তিহার কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনি।
ছোট রাজনের বিরুদ্ধে ৭০টা মামলায় বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয় এবং ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালেও আরেকটা মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এদিকে, দাউদ ইব্রাহিমকে হত্যার চেষ্টা কিন্তু চালিয়ে জাওয়া হচ্ছিল। শৈলেন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ‘২০০৫ সালে আরও একবার দাউদ ইব্রাহিমকে মারার চেষ্টা করতে চেয়েছিল সে (ভিকি মলহোত্রা)। কিন্তু তার আগেই তাকে (ভিকি মলহোত্রা) এবং তার সহযোগী ফরিদ তানাশাকে দিল্লিতে গ্রেপ্তার করা হয়। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চের টার্ফ যুদ্ধের কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।’
এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্র পুলিশের সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল মীরা বোরওয়ানকর তার আত্মজীবনী ‘ম্যাডাম কমিশনার’-এ লিখেছেন। তার কথায়, ‘ভিকিকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাবেক প্রধান তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি ভিকিকে মুক্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আমি তাকে যেতে দিতে চাইনি।’
শ্রীবাস্তব ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ভিকিকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি থেকে মুম্বাইয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। ২০১০ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সে পালিয়ে যায়। বলা হয় যে সে পালিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যায় আর ছোট রাজনের হীরা পাচার এবং অন্যান্য ব্যবসা দেখাশোনার কাজ শুরু করে।’