ইসলাম মানুষকে পরিপূর্ণ সততা ও পাপমুক্ত জীবন যাপন করতে উৎসাহ প্রদান করেছে। কিন্তু মুসলিম বলে গণ্য হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ পাপমুক্ত হওয়ার শর্তারোপ করেনি। অন্যদিকে ইসলামি বিধান না মানার কারণে পবিত্র কোরআনে কাফের, মুশরেক, জালেম, ফাসেক সবাইকে যেমন জাহান্নামি বলে উল্লেখ করা হয়েছে তেমনি তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করার পর সেখান থেকে আবার বেরিয়ে আসবে এমনটাও উল্লেখ করা হয়নি।
কাফের যেমন ঘৃণিত, তেমনি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও একজন অপরজনকে কাফের বলে ঘোষণা করাও ঘৃণ্য অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠিনভাবে এ বিষয়ে সাবধান করেছেন। অথচ বর্তমান মুসলিম সমাজে একজন আরেকজনকে কাফের বলা যেন স্বাভাবিক ভাষায় পরিণত হয়ে গেছে। বিশেষ করে অন্যকে কাফের বলে ঘোষণা দেওয়ার চর্চা বর্তমান মুসলিম সমাজে যেন নিজেকে বড় জ্ঞানী বলে ঘোষণা করার এক অন্যতম কৌশল বলে মনে করা হয়।
কুফর আরবি শব্দ। এর অর্থ অনীশ্বরবাদ বা অস্বীকার করা। এ বিষয়ে আল মুজামুল ওয়াসিত গ্রন্থকার বলেন, ‘কুফর হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ অথবা নবুয়ত অথবা শরিয়ত অথবা একইসঙ্গে উপরিউক্ত তিনটির কোনোটির প্রতি ইমান না থাকা।’ আল্লামা বায়জাভীর ভাষায়, ‘রাসুল (সা.)-এর আনীত নিশ্চিতরূপে জ্ঞাত জীবন বিধান অস্বীকার করাকে কুফর বলা হয়।’ আর এই অস্বীকার যে করে তাকে আরবিতে ‘কাফের’ বলে।
ইমানের দাবিদারকে কাফের বলার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফের বলে, তবে এ কথা তাদের দুজনের একজনের ওপর প্রযোজ্য হবে। যদি তার ভাই সত্যিই কাফের না হয় তবে যে তাকে কাফের বলল তার ওপরেই কুফরি প্রযোজ্য হবে।’(সহিহ মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনো মুসলমানকে কুফরির সঙ্গে জড়িত করে আহ্বান করে অথবা তাকে বলে, হে আল্লাহর শত্রু! আর সে তা না হয়, তবে তা বক্তার ওপরই বর্তাবে।’ সাবেত ইবনে দাহহাক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনো মুমিন ব্যক্তিকে কুফরিতে অভিযুক্ত করে, তবে তা তাকে হত্যা করার মতোই অপরাধ হবে।’ (সহিহ বুখারি)
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সব আলেমের মতে প্রত্যেক কাফেরই জাহান্নামি। অপরদিকে কোনো মুসলিম যদি এমন কোনো কর্মে লিপ্ত হয় বা কথা বলে যা কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশ অনুসারে কুফর বা শিরক বলে গণ্য হয়ে যায়, তবে তার সেই কর্মকে অবশ্যই শিরক বা কুফর বলে ঘোষণা করার ব্যাপারেও ইসলামের অনুমতি রয়েছে।
অবশ্য কাফের বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন কিছু বিষয় আছে, যেখানে শরিয়তের বিধান সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন কাউকে কাফের ঘোষণা করার আগে দেখতে হবে যে, সে ব্যক্তির বর্ণিত বিষয়ে জ্ঞানের অজ্ঞতা, ব্যাখ্যা, বাধ্য হয়ে কুফরি করা, ভুলবশত কুফরি উচ্চারণ করা, অক্ষমতা, নতুন ইসলাম গ্রহণ, বড় কুফর প্রতিরোধে ছোট কুফর করা, ভুল বুঝা বা এ জাতীয় কোনো ওজর তার আছে কি না। যদি থাকে তবে সেখানে কাফের বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার বিধান কার্যকর হবে। তার মানে, উক্ত ব্যক্তিকে কাফের বলা যাবে না। অন্যথায় একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে কাফের বলার কারণে ঘোষণাকারী ব্যক্তি ইহজীবনেও যেমন অপমান-অপদস্ত হবে তেমনি পরকালীন জীবনেও ভোগ করবে কঠিন শাস্তি।