ক্লিনারদের বেতন ঠিকাদারের পকেটে

রাজধানীর বনানীর একটি সড়ক প্রতিদিন সকালে ঝাড়– দেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রোকেয়া বেগম (ছদ্মনাম)। তিন মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার চালাতে স্বামীকে সহযোগিতা করতে এ কাজ বেছে নিয়েছেন তিনি। রোকেয়া বেগম জানান, মাসের ৩০ দিনই ভোরে ঘুম থেকে উঠে সড়ক ঝাড়– দিতে হয়। মাস শেষে বেতন পান মাত্র ৬ হাজার টাকা।’

মহাখালী এলাকায় হারিদাস নামে আরেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, মাস শেষে তাকে ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। গুলশান এলাকার আমেনা বেগমের বেতন ৭ হাজার টাকা। মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠের পেছনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) কর্মী হাবিবুর রহমান পান মাসে ১০ হাজার টাকা। পরিচয় গোপন রেখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তত ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তাদের বেতন একেক রকম হলেও সবাই হাতে হাতে টাকা পাচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। মাস শেষে ব্যাংক থেকে বেতন তোলেন এমন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১৩টি ওয়ার্ডে পাওয়া যায়নি। অথচ সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী তাদের প্রত্যেকের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ব্যাংকে বেতন দেওয়ার শিট জমা না দিলে সিটি করপোরেশন থেকে বিল তুলতে পারবেন না ঠিকাদাররা। তাই প্রতি মাসে ভুয়া বিবরণী তৈরি করে বিল তুলে নিচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতনের টাকা মেরে দিচ্ছে তারা।

জানা গেছে, গুলশান, বনানী, মহাখালী, শাহজাদপুরসহ ১৩টি ওয়ার্ডে কাজ করছে মাল্টি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। বাকি ১৩ ওয়ার্ডে কাজ করে খন্দকার ব্রাদার্স, রাকিব এন্টারপ্রাইজ ও ক্লিনটেক।

গত জুলাই মাসের বিল তোলার জন্য মাল্টি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে জমা দেওয়া একটি হিসাব বিবরণী সংগ্রহ করেছে দেশ রূপান্তর। তাতে দেখা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কারও বেতন ৬ হাজার টাকা নয়। তাদের নামের পাশে সর্বনিম্ন ৭ হাজার ৯০৫ টাকা লেখা আছে। বিবরণীতে ৩০৪ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ২৩৬ জনের বেতন দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৯০৫ টাকা। একজনের বেতন ৭ হাজার ৬৫০ টাকা। ৫৮ জনের বেতন ১০ হাজার ৪১৬ এবং ১০ হাজার টাকার বেশি বেতন দেখানো হচ্ছে ১৮ জনের।

অনুসন্ধান বলছে, যাদের ৬ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হয় তাদের নামের পাশে ৭ হাজার ৯০৫ টাকা বেতন দেখানো হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই ঝাড়ুদার। ১০ হাজার ৪১৬ টাকা যাদের বেতন দেখানো হয়েছে, তাদের ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর ১০ হাজারের বেশি অঙ্কের বেতনে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা কেউ ১০ হাজার টাকার বেশি পান না।

হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি মাসে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতনের অন্তত ৫ লাখ টাকা মেরে দিচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই প্রক্রিয়ায় ক্লিনারদের ঠকাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নামে সিটি করপোরেশনের টাকা আত্মসাৎ করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো।

মাল্টি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট হিসাব বিবরণীতে যত জনের নাম দেখানো হয়েছে তত সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে কাজ করে না। ডিজিটাল হাজিরার কথা থাকলেও ত্রুটিপূর্ণ সফওয়্যারের মাধ্যমে কর্মী সংখ্যা বেশি দেখিয়ে সরকারি টাকা লুটের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনে হিসাব দেওয়ার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে। অ্যাকাউন্টে ক্লিনারদের নামে মাস শেষে বেতনও ঢুকছে। কিন্তু অ্যাকাউন্টগুলোর বিপরীতে কোনো এটিএম কার্ড বা চেক বই ক্লিনারদের দেওয়া হয়নি। অথচ প্রত্যেকেরই এটিএম কার্ড রয়েছে। এসবের মাধ্যমে বেতনের টাকা তুলে নিচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। আর কর্মীদের খেয়াল-খুশিমতো বেতন দেওয়া হচ্ছে। অনেকে জানেই না তার অ্যাকাউন্টে কত টাকা বেতন ঢুকছে।

ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ২৬টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। ঠিকাদার নিয়োগ করে এসব ওয়ার্ডের ময়লা আবর্জনা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যায় সংস্থাটি। এ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ২০২১ সালে নীতিমালা (টার্মস অব রেফারেন্স টর) তৈরি করেছে ডিএনসিসি। নীতিমালার ১০ নম্বর ধারায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাজিরা ও বেতন সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। ঠিকাদাররা যাতে ক্লিনারদের ঠকাতে না পারে সেজন্য বেতনের বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু মনিটরিংয়ের ঘাপলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছে না।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বলেন, ঝাড়– দেওয়ার কাজ করায় সবাই তাদের ‘অন্য চোখে’ দেখে। সহজে অন্য কোনো জায়গায় কাজ পান না। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে গিয়ে বিব্রত হয়। তবু বেঁচে থাকার তাগিদে তারা এ কাজ করেন। অনেকে ময়লা পরিষ্কারের পাশাপাশি অন্য কাজও করেন। এরপরও সংসার চালাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।

শাহজাদপুর এলাকায় কথা হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী জোসনা বেগমের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। চারজনের সংসারে দুই ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক স্কুলে পড়ে। স্বামী ভ্যান চালান। স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এজন্য স্বামীকে সহযোগিতা করতে এ কাজ নিয়েছেন। কাজ নেওয়ার সময় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাকে প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলেছে। তিনিও রাজি হয়েছেন। প্রতি মাসে বেতনও পাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান বাজারে দুজনের আয়েও সংসার চলছে না। জোসনার মতো শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানেনও না তাদের বেতনের নামে লাখ লাখ টাকা মেরে দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ড. তানিয়া হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি অবাক করার মতো। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অবহেলিত জনগোষ্ঠী। তাদের কষ্টের টাকা নিয়ে যারা মেরে দিচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘ক্লিনারদের সরকার কত টাকা বেতন দিচ্ছে তা জানে না। মানুষ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। আমার বেতন কত টাকা তা আমাকে অবশ্যই জানতে হবে। এজন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। নীতিমালার যে ফাঁক গলিয়ে এসব করা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফিদা হাসান বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যাতে তাদের ন্যায্য পাওনা পায় সেজন্য আমরা নানাবিধ ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা কর্মীদের আর্থিক ও শরীরিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যাতে নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রেখে সিটি করপোরেশনে অভিযোগ দিতে পারে সে ব্যবস্থা করব।’

বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের (বিডিইআরএম) সাংগঠনিক সম্পাদক ভীম্পল্লী ডেভিড রাজ বলেন, ‘এটা অন্যায় হচ্ছে। সরকার যে টাকা খরচ করছে সে টাকা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পেলে তাদের সংসার ভালো চলত। এই প্রক্রিয়া ব্রিটিশ আমলের জমিদারদের অত্যাচারের কথা মনে করিয়ে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে তৎকালীন সরকার যখন নীতিমালা করে তখন থেকেই আমরা এর বিরোধিতা করে আসছি। ক্লিনাররা এমনিতেই অবহেলিত, এর ওপর এভাবে পিষ্ট হলে আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় থাকবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ক্লিনারদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

এ প্রসঙ্গে মাল্টি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সিটি করপোরেশনে দেওয়া কাগজপত্রে ভাটারার একটি ঠিকানায় মাল্টি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের অফিস দেখানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, অফিসটি বারিধারা ডিওএইচএসে স্থানান্তর করা হয়েছে। বক্তব্য নিতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, এমডি ও ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তাদের মোবাইল ফোনে কল দিলেও পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির এমডি ফরিদউদ্দিন পলাতক। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। তার নামে মামলা হয়েছে।