ঋণ নিয়ে কেনা শেয়ারগুলো এখন ট্রিগার সেল বা ফোর্সড সেলের (বাধ্যতামূলক বিক্রি) আওতায় বিক্রি হচ্ছে। এতে যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণ নিয়েছিলেন, তারা পুঁজির প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন। বিপরীতে শেয়ার কেনার মতো পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বাজারে নেই। ফলে আড়াই মাস ধরে চলমান দরপতন এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ট্রিগার সেলের ভয়াবহতায় গতকাল রবিবার এক দিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩ শতাংশ কমে গেছে। এতে গতকাল সূচকটি নেমে এসেছে ৪ হাজার ৯৬৫ পয়েন্টে, যা গত ৪৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর সূচকটি ৪ হাজার ৯৩৪ পয়েন্টে নেমেছিল।
লভ্যাংশের মৌসুমে পুঁজিবাজারের এমন টানা পতনে বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। গত কয়েক মাসে অধিকাংশ শেয়ারের দর ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশই প্রায় সর্বস্ব হারিয়েছেন, বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছিলেন, তাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। ২০১০ সালের ধসে পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীরা ১৫ বছর ধরেই বারবার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। সরকার বদলের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গত আড়াই মাসের টানা দরপতনে তা ধুলায় মিশে গেছে। কোনো সরকারই পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেনি। নতুন সরকারে তিনজন বড়মাপের অর্থনীতিবিদ থাকার পরও পুঁজিবাজার তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি বলে বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন। অনভিজ্ঞদের দিয়ে কমিশন গঠন তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন তারা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিতে কমিশন পুনর্গঠনের পর থেকেই টানা দরপতন তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজারের মন্দায় আস্থা ফেরাতে কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই নতুন কমিশনের শাস্তিমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ, শেয়ারের দাম বাড়লেই তদন্ত দল গঠনসহ নানা পদক্ষেপ উল্টো ফল দিয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, শেয়ার কেনার পর দাম বাড়লেই তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। অথচ কোনো শেয়ার একটু বেশি পরিমাণে কিনলে দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। অবস্থা এমন হয়েছে, ঝুঁকি নিয়ে কোনো শেয়ারে পজিশন নিতে গেলেই শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন তারা।
গত ১৮ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর আগের কার্যদিবস ১৫ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টে। এরপর ধারাবাহিক পতনে গতকাল সূচকটি নেমে আসে ৪ হাজার ৯৬৫ পয়েন্টে, যা গত প্রায় চার বছরে সর্বনিম্ন। নতুন কমিশনের আমলে ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে ৯৩৮ বা প্রায় ১৬ শতাংশ। বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত জানুয়ারিতে ডিএসই কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু বড় মূলধনি কোম্পানিসহ মোট ৮৩টি কোম্পানিকে ডিএসইএক্স গণনা থেকে বাদ দেয়। এ কারণে বড় পতন হলেও সূচক উল্লেখযোগ্য হারে কমতে দেখা যায়নি। যদি এসব কোম্পানি প্রধান সূচকে রাখা হতো, তাহলে ডিএসইএক্স বর্তমানে চার হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসত।
গতকালের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজগুলোয় ট্রিগার সেলের কারণে লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের পতন দেখা দেয়, যা সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। গতকাল দিনশেষে ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৯৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর হারিয়েছে ৩৪১টি, বেড়েছে ২৯টির ও অপরিবর্তিত ছিল ২৬টির দর। গতকাল ৬ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে এমন সিকিউরিটিজের সংখ্যা ১২১টি। গতকালের বড় পতনে ডিএসইর বাজার মূলধন এক দিনেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমে গেছে। এ নিয়ে গত ১৮ আগস্ট থেকে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৬১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
এদিকে বর্তমান সুদের হারও পুঁজিবাজারের দরপতনের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। ঝুঁকিপূর্ণ ও মন্দার বাজারে বিনিয়োগ না করে বড় বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই এখন ব্যাংকে স্থায়ী আমানতে ঝুঁকছেন। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে এক বছর ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়াচ্ছে, যার প্রভাবে ঋণ-আমানতের সুদহারও বাড়ছে। এখন অনেক ব্যাংকেই আমানতে ১২-১৪ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে।
পুঁজিবাজারে টানা দরপতন প্রসঙ্গে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার, সুদের হার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এখন বাজার বিয়ারিশ ট্রেন্ডে আছে। বটম পয়েন্টে নেমে যাওয়ায় অনেক শেয়ার আন্ডার ভ্যালু। আমরা ব্যাংক, বীমা, মিউচুয়াল ফান্ডসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছি। এ ছাড়া কোম্পানি আইন অনুযায়ী, শেয়ার বাইব্যাক করার পূর্বের প্রস্তাবনার বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
রেজাউল করিম আরও বলেন, ‘বর্তমানের টানা পতন আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে, যার কারণে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে যদি বাজার পতনে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি বাজার সাপোর্ট দিতে আইসিবিকে তিন হাজার কোটি টাকার ফান্ড দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। আশা করছি, অচিরেই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি পাবে।’