ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি। জোর দাবি উঠেছে সংবিধান পরিবর্তন ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের। রাষ্ট্রপতির বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করার পর রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপও করেছেন তারা। আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না জানালেও বিএনপি সূত্র বলছে, সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে চাচ্ছে না তারা। জামায়াতসহ অন্যান্য সমমনা দল ছাত্রদের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত প্রকাশ করলেও তারা প্রায় সবাই বিএনপির সুরেই কথা বলছে। তবে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিষয়ে তারা অনড়। প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিষয়ে গত শুক্রবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি। বিএনপি তাদের মত দলীয় ফোরামে আলোচনা করে জানাবে বললেও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে সাংবিধানিক সংকট তৈরির পক্ষে নয় বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদ এবং ১২-দলীয় জোট সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতার শর্তে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। গণ অধিকার পরিষদ জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের পক্ষে মত দেন। সর্বশেষ গতকাল সোমবার আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারাও রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিষয়ে একমত প্রকাশ করার পাশাপাশি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত আসার কথা জানায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে সহজে কোনো সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন অনেকেই। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন তারা ঘটাবেন বলে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে ক্ষেত্রে বর্তমান রাষ্ট্রপতি কোনোভাবেই থাকতে পারবেন না। তাকে কোন প্রক্রিয়ায় সরানো হবে সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির অফিশিয়ালি বক্তব্য পাওয়ার অপেক্ষা করছি। তারা মতামত জানালে সহজ হতো, না জানানোয় আমাদের জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী বিএনপিও একমত প্রকাশ করবেন। বিএনপি একমত প্রকাশ করলে রাষ্ট্রপতিকে সরানো সহজ। যদি তা নাও হয় আমরা আমাদের দাবিতে অনড়। রাষ্ট্রপতিকে সরানো বিষয়ে আমাদের কর্মসূচি চলবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয় রিফাত রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের এক দফায় আমরা অনড় আছি। এর অংশ হওয়ায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরতে হবে। বিএনপি যদি সম্মতি নাও জানায় আমরা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম স্টেকহোল্ডার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবি থেকে সরব না। তবে বিএনপি এখনো আমাদের স্পষ্ট কিছু জানায়নি। কীভাবে সংকট ছাড়া এ প্রক্রিয়ায় যাওয়া যায় সেটা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে আমরা নীতিগতভাবে একমত। বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদে থাকার যোগ্যতা নেই, সে বিষয়ে সবাই একমত। যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের পরবর্তী ধাপে আলোচনা করতে হবে, সেটি হচ্ছে প্রক্রিয়া। জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এগুলো আমাদের কর্মসূচির অংশ।’
এদিকে গতকাল দুপুরে বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ প্রশ্নে ছাত্রনেতাদের সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এবি পার্টি। দলটির নেতারা বলেছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে বিদায় না করলে তা জাতীয় জীবনের মহাসংকট হিসেবে থাকবে। সেজন্য সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠিয়ে মতামত নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সরানো উচিত।
এবি পার্টির পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন দলের সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, যুগ্ম সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ কয়েকজন নেতা। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ উপস্থিত ছিলেন।
এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টাম-লী সুপ্রিম কোর্টে একটা রেফারেন্স পাঠিয়ে তাদের মতামতের ভিত্তিতে শপথ নিয়েছেন। এটা কিন্তু একটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের যে বিধানমতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারে রেফারেন্স নেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে সেরকম একটা রেফারেন্স নিয়ে একটা সমাধানে আসা যেতে পারে। তাহলে সাংবিধানিক সংকট বা শূন্যতা থাকবে না বলেই আমরা মনে করছি।’
ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘এবি পার্টির সঙ্গে সংলাপে হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অপসারণ প্রশ্নে এবি পার্টি আমাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছে। তারা অবিলম্বে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চেয়েছেন। এ ছাড়া আমরা সংবিধান ও প্রক্লেমেশন অব রিপাবলিক নিয়ে আলোচনা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি প্রক্লেমেশন বা ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে এবি পার্টি একমত পোষণ করেছে। আওয়ামী লীগের অধীন গত তিনটি নির্বাচন অবৈধ ঘোষণার বিষয়েও এবি পার্টি একমত হয়েছে। তাদের সঙ্গে আমরা বেশ কিছু জায়গায় ঐকমত্যে আসতে পেরেছি।’