গণভবন জাদুঘরে আয়না ঘরের রেপ্লিকা থাকা উচিত বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে জনরোষে ‘প্রায় ধ্বংসস্তূপে’ পরিণত হওয়া গণভবনকে ‘জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের জাদুঘর বানানোর কাজে গতি আনতে উপদেষ্টাদের নির্দেশনা দেন তিনি।
গতকাল সোমবার গণভবন পরিদর্শন করে ড. ইউনূস এই নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
উপদেষ্টাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাদুঘরের জন্য প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে হবে।
গণভবন পরিদর্শনের সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বসবাস করতেন।
গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত ‘স্বৈরশাসক’ শেখ হাসিনা ১৫ বছর ধরে বাস করেছিলেন, যা দমন ও তার নৃশংস শাসনের প্রতীক হয়ে উঠেছে’ বলে উল্লেখ করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। গণভবনের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শনকালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) দুঃশাসনের স্মৃতি এবং জনগণ যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল, যখন তারা তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছিল, সেসব জাদুঘরের রাখা উচিত হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আয়নাঘর, যেখানে হাসিনার কুখ্যাত নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গোপনে শত শত ভিন্নমতাবলম্বী ও বিরোধীকর্মীকে আটক করেছিল, তার একটি রেপ্লিকাও গণভবনের জাদুঘরে নির্মাণ করা উচিত। (গণভবন জাদুঘর) পরিদর্শনে যারা আসবে, আয়নাঘর তাদের গোপন বন্দিশালার নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দেবে।’
এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া হাসিনার শাসনের অপকর্মগুলো জাদুঘরে যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হবে। বিভিন্ন দেশে বিপ্লব ও বিদ্রোহের স্মরণে বিভিন্ন স্মৃতিস্মারক কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, তা জানতে অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে।’
ঝামেলা ছাড়াই অনলাইনে আয়কর জমা দিন : দেশবাসীকে অনলাইনে আয়কর ই-রিটার্ন জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘এখন থেকে ব্যাংকে লাইন দিয়ে আয়কর জমা দেওয়া বা আয়কর অফিসে গিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা আর করতে হবে না। ঘরে বসেই আপনি আয়কর জমা দিয়ে রিটার্ন দাখিল করবেন এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
গতকাল সোমবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় এ আহ্বান জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর শহরের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফোন অপারেটর এবং বেশ কিছু বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এভাবে আয়কর রিটার্ন দেওয়া এখন থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের বাকি সবাইকে অনলাইনে ই-রিটার্ন ও আয়কর জমা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আয়কর নিয়ে দুটি কথা বলছি। আপনাদের দেওয়া কর-ই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ সরকারের কাছে করের টাকা জমা দিতেই পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। এখন থেকে ব্যাংকে লাইন দিয়ে আয়কর জমা দেওয়া বা আয়কর অফিসে গিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা করতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠান কত বেশি করদাতার আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দিচ্ছেন, তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার অর্জনের জন্য জেলায় জেলায়, শহরে শহরে প্রতিযোগিতা হোক।’
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবকে শিখিয়ে দিন, কীভাবে ঘরে বসে অনলাইনে ই-রিটার্ন আয়কর জমা দিতে হয়। তরুণ-তরুণীদের অনুরোধ করছি এ ব্যাপারে করদাতাদের সাহায্য করার জন্য। ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি এখান থেকেই শুরু হতে পারে।’
ধীরে ধীর সব ধরনের কর অনলাইনে সংগ্রহ করার জন্য সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে উল্লেখ করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সবার জন্য এখন থেকে আয়কর দেওয়ার অভিজ্ঞতা মসৃণ ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত হোক।
এনবিআর কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টিকে উৎসাহ দিয়ে আসছে। ২০২৪-২৫ করবর্ষের রিটার্ন দাখিল ও কর পরিপালন সহজ করতে এনবিআর গত ৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন রিটার্ন দাখিল সিস্টেম উন্মুক্ত করে। িি.ি বঃধীহনৎ.মড়া.নফ ওয়েবসাইটে গিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা সহজে নিজের রিটার্ন তৈরি করে অনলাইনে জমা দিতে পারছেন।
সেজন্য করদাতার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত কি না তা আগে যাচাই করে নিতে হবে। যাচাই করার জন্য ১৬০০১ নম্বরে ডায়াল করতে হবে।
এই পোর্টাল চালুর সময় এনবিআর জানিয়েছিল, ই-রিটার্ন পদ্ধতিতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা নিজের রিটার্ন তৈরি, অনলাইনে রিটার্ন দাখিল অথবা অফলাইনে রিটার্ন দাখিলের জন্য প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। সেই সঙ্গে অনলাইন ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড ও ডেবিট কার্ড বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর পরিশোধ করা যাবে।
এ ছাড়া রিটার্ন দাখিলের তাৎক্ষণিক প্রমাণপ্রাপ্তি, আয়কর পরিশোধ সনদ ও টিআইএন সনদ, আগের বছর দাখিল করা ই-রিটার্নের কপি, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রিন্ট বা ডাউনলোডের সুবিধা আছে।
এ বছর ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সব সরকারি কর্মচারীর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে বিশেষ আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্যও এ আদেশ প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ইউনিলিভার বাংলাদেশসহ সব মোবাইল অপারেটরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আরও বেশি সৌদি বিনিয়োগ চান ড. ইউনূস : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সৌদি আরবকে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুই বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ইসা ইউসুফ ইসা আল দুহাইলান অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান। খবর বাসস
ড. ইউনূস বলেন, ‘এখন আমরা এমন একটি সময় পার করছি, যখন সৌদি আরব আমাদের সর্বোচ্চ সমর্থন দিতে পারে।’ এ সময় সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ‘অনন্য’ ও ‘আলাদা’ হিসেবে অভিহিত করেন প্রধান উপদেষ্টা।
ড. ইউনূস সৌদি আরবকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তহবিল জমা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ তারল্য সহায়তা বৃদ্ধি করবে। এ ছাড়া এটি ‘অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি চমৎকার অঙ্গীকার’ বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি সৌদি আরবকে সহজশর্তে জ¦ালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি তরুণদের প্রশিক্ষণের জন্য বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণের জন্য বিনিয়োগ করলে ঢাকা থেকে সৌদি আরবে আরও বেশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।’
রাষ্ট্রদূত আল দুহাইলান সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবদানের প্রশংসা করে বলেন, ‘প্রবাসী বাংলাদেশিদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে তারা আরও বেশি বেতন পাবেন এবং দেশে অনেক বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হবেন।’
বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত আছেন এবং প্রতিবছর তারা বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রদূত আল দুহাইলান জানান, সৌদি আরব প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার ভিসা প্রদান করে, যা বাংলাদেশি অভিবাসী এবং মুসলিম হজযাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। গত ২০২৩ সালে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করেছেন, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।
রাষ্ট্রদূত আল দুহাইলান জানান, তার দেশ বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশেষ করে আকওয়া পাওয়ারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রস্তাবিত সৌদি বিনিয়োগ সহজ করতে তিনি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সহযোগিতা চান।
তিনি সৌদি আরবের বাদশাহ খাদেমুল হারমাইন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সৌদি জাতীয় দিবস উপলক্ষে অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেন।
সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমার সরকার বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা দেখতে চায় এবং ইনশাআল্লাহ, আমরা বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত আছি।’
তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে পবিত্র আল-কোরআন ও সৌদি আরবের জাতীয় পাখি বাজপাখির একটি রেপ্লিকা উপহার দেন।