নিউমোনিয়া বলতে কী বোঝায়

প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় সব দেশে অনেকের মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়। অতিসাধারণ এ রোগ জটিল হয়ে উঠলে রক্ষা নেই। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো নিউমোনিয়া। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের হাসপাতালে ভর্তির প্রধান কারণও এ রোগ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর এক মিলিয়নেরও বেশি বয়স্ক ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয় নিউমোনিয়া নিয়ে। বছরে প্রায় ৪০ হাজার আমেরিকান এ রোগে মারা যায়। নিউমোনিয়া ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলিতে প্রদাহের কারণে হয়ে থাকে। এটি সাধারণ থেকে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এ রোগের ফলে অক্সিজেনের অভাব এবং রক্তের সংক্রমণসহ জটিল আকার ধারণ করতে পারে। চিকিৎসা করা না হলে যা মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। ঠাণ্ডা এবং ফ্লুর মৌসুম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগ দেখা দেয়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বিভিন্ন ধরনের নিউমোনিয়া এবং এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে। এ-সংক্রান্ত তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউমোনিয়া হলো শ্বাসনালিগুলোর একটি সংক্রমণ। বিশেষত ফুসফুসে থাকা ছোট বায়ুথলিতে এর সংক্রমণ ঘটে। এই থলিকে অ্যালভিওলি বলা হয়, যা রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। নিউমোনিয়া সংক্রমণ বিভিন্ন কারণে জটিল হয়ে উঠতে পারে। নিম্ন শ্বাসনালিতে শুরু হয়ে যা ওপরের শ্বাসনালিতে ছড়াতে থাকে এবং পরে ফুসফুসের গভীর অংশে সংক্রমণ করে। নিউমোনিয়ার সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং সাধারণ ক্লান্তি। বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের পালমোনোলজিস্ট তিয়ানশি ডেভিড উ বলেছেন, নিউমোনিয়া নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস বুঝতে স্টেথেসকোপ ব্যবহার করে। আক্রান্ত রোগী শ্বাস নিলে কর্কশ শব্দ শোনা যায়। উ বলছেন, নিউমোনিয়া নির্ণয়ের জন্য এতটুকু যথেষ্ট। অবশ্য যদি চিকিৎসক তারপরও নিশ্চিত হতে না পারেন তাহলে ফুসফুসের এক্স-রে করতে বলতে পারেন। যার মাধ্যমে তিনি রোগ নির্ণয়ে নিশ্চিত হতে পারেন।

চার ধরনের নিউমোনিয়া

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক তাদের প্রতিবেদনে বলছে, চারটি প্রধান ধরনের নিউমোনিয়া রয়েছে। যা আক্রান্তের কারণের ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত। সেগুলো হলো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাল, ছত্রাক এবং হাসপাতাল থেকে সংক্রমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক দ্বারা সৃষ্ট কিনা তা বলার কোনো উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ নিউমোনিয়ার ঘটনায় শেষ পর্যন্ত নির্ণয় করা যা না কী কারণে এটি ঘটছে। চিকিৎসকরা রোগীর লক্ষণ এবং চিকিৎসার ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করেন। গবেষকরা দেখেছেন, ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া সবচেয়ে সাধারণ যা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। যার মানে এটি সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সারানো যায়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় তাদের লক্ষণ দূর হয়। চিকিৎসা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে তারা ভালো বোধ করে। তবে এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা যত আগে হয়, তত ভালো। এ ছাড়া একটি ভ্যাকসিন রয়েছে, যা নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী সবচেয়ে পরিচিত ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। এ ভ্যাকসিন ৬৫ বছরের বেশি বয়সীসহ নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থার রোগীর জন্য অনুমোদিত। ভাইরাল নিউমোনিয়া কম হয়। এটি ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, সারস কভ-২ (এ ভাইরাস কভিড-১৯ এর জন্য দায়ী)। এ ছাড়া আরএসভি নামে শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস রয়েছে। যা সাধারণত হালকা ঠা-ার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। এই ভাইরাল সংক্রমণের অনেক ওপরের শ্বাসনালিতে শুরু হয়, তারপর ফুসফুসে নেমে যায়। এ ধরনের ভাইরাল সংক্রমণ রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে ফেলে। অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এ ধরনের ভাইরাসের চিকিৎসা করা যায় না। তবে এমন ভ্যাকসিন রয়েছে, যা সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। যেমন বার্ষিক ফ্লু শট, কভিড ভ্যাকসিন এবং যারা যোগ্য তাদের জন্য নতুন আরএসভি ভ্যাকসিন। ছত্রাকের নিউমোনিয়াস বিরল এবং সাধারণত আগে হয়েছে এমন অবস্থা রোগীদের মধ্যে পাওয়া যায়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো মেডিসিনের পালমোনোলজিস্ট লুকাস কিমিগ বলেন, ছত্রাক নিউমোনিয়া ‘অটোইমিউন ডিসঅর্ডারে’ আক্রান্ত ব্যক্তিদের, কেমোথেরাপি নিচ্ছেন এমন রোগীদের বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে; তাদের হতে পারে। ছত্রাকের নিউমোনিয়ার জন্য ভিন্ন চিকিৎসার কৌশল প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার জটিলতা এবং রোগীর অন্যান্য অন্তর্নিহিত অবস্থার কারণে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। আর সবশেষে হাসপাতাল থেকে সংক্রমিত নিউমোনিয়াকে পৃথক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ বেশিরভাগ হাসপাতালের পরিবেশ প্রায়ই রোগীদের বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আনে, যা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কেন গুরুতর

নিউমোনিয়ার ঝুঁকি হলো যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পালমোনোলজিস্ট জেসন তুরোভস্কি বলেন, যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস ফুসফুসকে সংক্রমিত করে, তখন এটি থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো উপায় নেই, যা সেই সংক্রমণ রোধ করতে পারে। নিউমোনিয়ার প্রাথমিক ঝুঁকি হলো এটি ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে, যা একজন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফুসফুসের ক্ষুদ্রথলিতে প্রদাহজনক কোষ তৈরি হলে তা অক্সিজেন সরবরাহ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হতে বাধা দেয়। তুরোভস্কি বলেন, এটি এমন একটি কারণ, যা আপনাকে অত্যাবশ্যক অক্সিজেন পেতে এবং শরীরে তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইড মুক্ত করতে অক্ষম করে তোলে। আর এ রোগের গৌণ ঝুঁকি হলো শরীরের অন্যান্য অংশে সংক্রমণ। যেমন ফুসফুস এবং বুকের প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থান বা রক্ত প্রবাহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যখন এই সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একে সেপসিস বলে। এই সেপসিস অবস্থা দ্রুত জীবনকে হুমকিতে ফেলতে পারে, যা প্রায়ই মৃত্যুর কারণ হয়। নিউমোনিয়া থেকে গুরুতর জটিলতা হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। এ ছাড়া আগে থেকে হৃদরোগ ও ফুসফুসের রোগের মতো জটিলতায় যারা ভুগছিলেন বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাদের, তাদের ক্ষেত্রে এ রোগ মারাত্মক । কেমোথেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে এমন রোগীদের জন্যও ভয়ের। অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা ধূমপান বা প্রচুর মদ্যপান। তবে নিউমোনিয়ার বেশিরভাগ রূপই হালকা এবং সীমাবদ্ধ হয়। যেসব রোগীর নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে এবং বাড়িতে সেরে উঠছেন, তাদের জন্য কিছু সতর্কতা জরুরি। তাদের খেয়াল রাখতে হবে, যেকোনো সময় চিকিৎসাসেবা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন যদি তাদের অবস্থার অবনতি হয়। আবার চিকিৎসার পরও এটি শরীরে থেকে যেতে পারে। তুরোভস্কি বলেছেন, যদি অস্বস্তি দেখা দেয় তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। কারণ প্রথম দিকে থাকলে চিকিৎসকরা গাইড করতে পারে। তবে খারাপ দিকে থাকলে তখন তাদের জন্যও জটিল হয়ে যেতে পারে সমাধান করা।

হাঁটা নিউমোনিয়া

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, বাচ্চাদের মধ্যে নিউমোনিয়ার ঘটনা বেড়েছে, যা নিয়ে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এ মুহূর্তে তারা বিভিন্ন ধরনের নিউমোনিয়া দেখতে পাচ্ছেন। সাধারণ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত নিউমোনিয়ার পাশাপাশি নতুন একটি ধরনের কথাও বলছেন তারা। একে তারা অভিহিত করছেন ‘হাঁটা নিউমোনিয়া’ নামে। তারা বলছে, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক চিলড্রেনসের পেডিয়াট্রিক সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ক্যামিল সাবেলা ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি সাধারণত আপনার স্ট্যান্ডার্ড ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া নয়। হাঁটা নিউমোনিয়া সাধারণত মাইকোপ্লাজমা নিউমোনিয়া, তবে এটি ভাইরাল নিউমোনিয়ার মতোও হতে পারে। ডা. সাবেলা বলেন, তারা নিশ্চিত নন যে, কী কারণে বাড়ছে। এটি সম্ভবত বাচ্চাদের স্কুলে ফিরে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সত্য যে আমরা একটি মহামারী থেকে বেরিয়ে আসছি, যেখানে মাইকোপ্লাজমা সঞ্চালিত হয়নি। ‘হাঁটা নিউমোনিয়া’র উপসর্গগুলো সাধারণত হালকা হয়। তবে তা গুরুতরও হতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে শুকনো কাশি, জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং গলাব্যথা। নিউমোনিয়ার ধরনের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাও পরিবর্তিত হয়। প্রতিরোধের জন্য ডা. সাবেলা শিশুদের ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে টিকা দিতে উৎসাহী করেন। দুর্ভাগ্যবশত সব ধরনের নিউমোনিয়ার জন্য বিশেষভাবে কোনো ভ্যাকসিন নেই। সাবেলা বলেছেন, নিউমোকোকাস নামক ব্যাকটেরিয়ার অনেক ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া স্ট্রেনের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত কার্যকর টিকা রয়েছে এবং প্রতিটি শিশুকে এর বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া উচিত। আমরা যদি জীবনের প্রথম দিকে এর বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া শুরু করি এবং এটি খুব ভালো কাজ করে। তবে যেহেতু নিউমোকোকাল ব্যাকটেরিয়ায় অনেক ভিন্ন স্ট্রেন রয়েছে, আমরা বর্তমানে পাওয়া ভ্যাকসিন দিয়ে সব স্ট্রেন থেকে রক্ষা করতে পারি না। এ ছাড়া তিনি কভিড-১৯ এবং আরএসভি টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন।