রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ দাবি নিয়ে প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। রাষ্ট্রপতির অপসারণ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংলাপ শুরু করলেও এখনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি ছাত্রনেতারা। তবে হাল ছাড়তে নারাজ তারা। ছাত্রনেতারা দাবি করছেন, প্রথম দফার সংলাপে রাষ্ট্রপতির অপসারণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। প্রক্রিয়া নিয়ে তারা দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু করবেন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে কাউন্সিল গঠনের জন্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আলটিমেটাম শেষে সংলাপ আহ্বান করেছি। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপতি অপসারণ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তাকে সরাতে হবে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় সরানো হবে, সেটা নিয়ে আমরা দ্বিতীয় দফার সংলাপ শুরু করব। তারপর সবাইকে এক টেবিলে বসিয়ে আমরা একটা সিদ্ধান্তে যাব।’ গত শুক্রবার থেকে রাষ্ট্রপতির অপসারণসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি দল ও তিনটি জোটের সঙ্গে আলোচনা করেছে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, তারা সরকারের কাছে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটা কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দেবেন। সেখানে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কে কোন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি হবেন, তা তারাই আলোচনা করে নির্ধারণ করবেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম আদীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রথমসারির দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম, এলডিপি, গণফোরামসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা বাকি আছে। এরপর আমরা প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও সংলাপ করব সবার সঙ্গে। তারপর সব রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে আমরা অল পার্টিস কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দেব সরকারকে। সেখানেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ, সংবিধান বাতিল, প্রক্লেমেশন অব সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণা, নির্বাচনসহ সব বিষয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি থাকছেন না, সে বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই। তবে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সংলাপ চালিয়ে যাব। কারণ রাষ্ট্রপতিকে আমরা যেমন চাই না, তেমনি রাজনৈতিক ঐক্য নষ্ট হোক, সেটাও আমরা চাই না। আমরা ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গেও বসব।’
গতকাল দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে বাম জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন ছাত্রনেতারা। বৈঠকে বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষে ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স), সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা। অন্যদিকে যৌথ প্রতিনিধিদলে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, রাজনীতিবিষয়ক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব, সদস্য সাইফ মোস্তাফিজ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সদস্য সচিব আরিফ সোহেল ছিলেন।
বৈঠক শেষে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনার ব্যাপারেও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করা দরকার। রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ ব্যাপারে আমাদের নৈতিক আপত্তি নেই বলে আমরা জানিয়েছি। কিন্তু এটার প্রক্রিয়া কী হবে, সাংবিধানিক ভিত্তি কতটুকু আছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন আছে।’
বৈঠকে আলোচনা নিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, রাষ্ট্রপতির অপসারণ বিষয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নৈতিক সমর্থন রয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তারা দেশের বিশিষ্টজন, নিজেদের দলীয় ফোরাম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করবে।
এদিকে এক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলো যদি একমত হয়, বাংলাদেশের কোনো অপশক্তি রাষ্ট্রপতিকে ওই পদে বসিয়ে রাখতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন ফ্যাসিস্টদের একজন দোসর, যিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন, তাকে অপসারণের মাধ্যমে পুরো দেশের মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে এমন একজন ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষকে আমরা সেখানে বসাব। যিনি ’২৪-এর অভ্যুত্থানের স্পিডকে ধারণ করেন, বাংলাদেশকে আমরা যে জায়গায় ধারণ করি, সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করবেন।