বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান, হামলা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে যুক্ত থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের তথ্য-উপাত্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তথ্য চেয়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া চিঠির প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত কমিটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে তা পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সাবেক সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার দ্বারা গত ১লা জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত হত্যা, গণহত্যা, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত কাজে সহায়তার জন্য তথ্য চেয়ে জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে গত ২৪ অক্টোবর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি পাঠায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন। এর প্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গঠিত তদন্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, বিভাগ ও আবাসিক হলে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি ৯ অক্টোবর গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে তথ্য ও ডকুমেন্ট আহ্বান করে। কমিটি প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত একত্রিত করে গত ১৯ অক্টোবর উপাচার্যের কাছে হস্তান্তর করে। পরে উপাচার্য এসব তথ্য-উপাত্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছে রেজিস্ট্রার দপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্রতিবেদনে অন্তত ১৬টি সংযুক্তিতে আন্দোলনে বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া, আন্দোলন নস্যাৎ করার লক্ষ্যে কর্মকান্ড, আন্দোলনকারীদের নির্যাতন, হুমকিসহ নানা অভিযোগে দুই শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ উল্লেখ করে তালিকা পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে এসব ঘটনার ছবি, ভিডিও ফুটেজসহ অন্যান্য ডকুমেন্টও পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ আসকারী, অধ্যাপক ড. শাহীনুর রহমান, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সেলিম তোহা, অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া, সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান, অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন, অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন আজাদ, সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা বাকী বিল্লাহ বিকুল, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মামুনুর রহমান, বঙ্গবন্ধু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আরফিন, শাপলা ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. পরেশ চন্দ্র বর্মণ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রবিউল হোসেনসহ অনেকের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিরোধীতা, আন্দোলনকে নৈরাজ্য আখ্যা দিয়ে ও আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে মিছিল ও সমাবেশের নেতৃত্বদান, অংশগ্রহণ, আর্থিক সহযোগিতা, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপর হামলার পরিকল্পনা, আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করে কেন্দ্রে পাঠানো, অনলাইন ও টেলিভিশন টক শো করে আন্দোলনের বিপক্ষে প্রচারণা, আন্দোলন নস্যাতে কতিপয় শিক্ষার্থীকে দিয়ে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ানো, আন্দোলনকারীদের হুমকি, মারধর, গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্যপ্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও তালিকায় নাম থাকা উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন- ইংরেজি বিভাগের এ এইচ এম আক্তারুল ইসলাম, বাংলা বিভাগের তপন কুমার রায়, মিয়া মো. রাসিদুজ্জামান, আফরোজা বানু, প্রদীপ কুমার অধিকারী, লিটন বরণ সিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের হাফিজুল ইসলাম, আইন বিভাগের শাহাজাহান মন্ডল, খন্দকার তৌহিদুল আনাম ও সাজ্জাদুর রহমান টিটু, আল-ফিকহ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের আমজাদ হোসেন, ল এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মেহেদী হাসান, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের কাজী আখতার হোসেন, অরবিন্দ সাহা, শেলীনা নাসরীন, শাহাবুব আলম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহব্বত হোসেন, ধনঞ্জয় কুমার, মুর্শিদ আলম, কে এম শরফুদ্দিন, নাসিমুজ্জামান, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের রুহুল আমিন, সঞ্জয় কুমার সরকার, মার্কেটিং বিভাগের মাজেদুল হক, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শহিদুল ইসলাম, পরিসংখ্যান বিভাগের সাজ্জাদ হোসেন, সিএসই বিভাগের আহসান-উল-আম্বিয়া, জয়শ্রী সেন, আইসিটি বিভাগের তপন কুমার জোদ্দার, ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শফিকুল ইসলাম, বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আনোয়ারুল হক, রেজওয়ানুল ইসলাম ও চারুকলা বিভাগের শিক্ষক তানিয়া আফরোজ।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন-কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি দেওয়ান টিপু সুলতান, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হাসান মুকুট, মীর জিল্লুর রহমান, মীর মোর্শেদুর রহমান, শেখ মো. জাকির হোসেন, আলমগীর হোসেন খান, শামসুল ইসলাম জোহা, নওয়াব আলী খান, আব্দুস সালাম সেলিম, ইব্রাহীম হোসেন সোনা, মনিরুজ্জামান মোল্লা, আইয়ুব আলী, সোহেল রানা, তবারক হোসেন, চন্দ্রন কুমার দাস, আব্দুল হান্নান, লুবনা শাহনাজ, নাজিম উদ্দিন, ওলিউর রহমান, মনোয়ার হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, সোহরাওয়ার্দী হোসেন, মিন্টু কুমার বিষ্ণু, আব্দুল আজিজ সরদার, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফুল ইসলাম, জে এম ইলিয়াস, শরিফুল ইসলাম, রঞ্জন, সাইফুল ইসলাম, বিপুল আহমেদ, জুবের আল মাসুদ, রবিউল ইসলাম, তারেক মাহমুদ হোসেন, মাসুদ পারভেজ, কবির হোসেন, আহসানুল হক হাসান, রশিদুজ্জামান খান টুটুল, রেজাউল করিম, আসাদুজ্জামান, রবীন্দ্রনাথ, পিন্টু লাল দত্ত, জাহাঙ্গীর আলম, আমানুর রহমান, আবু সিদ্দিক রোকন, আব্দুর রাজ্জাক, সুদেব কুমার বিশ্বাস, জাহিদুল ইসলাম, উকিল উদ্দিন, মোহব্বত হোসেন, আব্দুল জব্বার, হারুন উর রশিদ, সুজল কুমার অধিকারী, গাউছুল আজম, বকুল জোয়ার্দার, শ্রী নারায়ন চন্দ্র কর্মকার, বদিউজ্জামান, প্রহ্লাদ, মোফাজ্জেল হোসেন, নিখিল কুমার বিশ্বাস, ফরিদ উদ্দিন, বকুল হোসেন, আবু মুসা মোহাম্মদ, সোহেল রানা, আব্রাহাম লিংকন, রুহুল আমিন ও আতিয়ার রহমান।
এদিকে আন্দোলনকারীদের নির্যাতন, হুমকি ও প্রকাশ্য বিরোধীতাকারী শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের তথ্যও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত, সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয়সহ বিপুল খাঁন, মুন্সি কামরুল হাসান অনিক,তন্ময় সাহা টনি, রতন রায়, মেহেদী হাসান হাফিজ, শাহীন আলম, মেজবাহুল ইসলাম, মাসুদ রানা, হুসাইন মজুমদার, অপু রায়, কামাল হোসেন, শাকিল আহমেদ, মামুনুর রশিদ, আহসানুর রহমান আসিফ, মৃদুল হাসান রাব্বি, শিমুল খান, মাহমুদুল হাসান বাধন, আব্দুল আলিম, শাহিন পাশা প্রভৃতি নেতাকর্মীদের নাম এ তালিকায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে নাম আসা আওয়ামীপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলনটি কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল আমরা এটার বিরোধীতা করিনি। কিন্তু যখন এটি সরকার বিরোধী আন্দোলনে রুপ নেয় তখন আমরা চুপ ছিলাম। তার মানে এটা না যে আমরা তাদের বিপক্ষে অবস্থান করেছি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়েছে, এখানে কোন মারামারির ঘটনা ঘটেনি। আর প্রত্যেকেই কোন না কোন রাজনৈতিক আদর্শ লালন করে। কিন্তু এখানে ঢালাওভাবে একটি পক্ষের নাম সংযুক্ত করা হয়েছে। আমি মনে করি তারা এক দলীয় রাজত্ব হাসিলের জন্য এটি করেছে। যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা যা চায় সেটাই হয়।’
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. নুরুন নাহার বলেন, আমরা তথ্য সংগ্রহে গণ বিজ্ঞপ্তিসহ বিভিন্ন দপ্তর ও আবাসিক হলে চিঠি দেই। সেখানে আমরা বেশ কিছু তথ্য, ছবি ও ভিডিও পেয়েছি। এতে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও তৎকালীন সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের অনেকের নামই এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য ও ডকুমেন্টের সবগুলোই আমরা পাঠিয়েছি।