বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে হত্যার যথাযথ তদন্ত এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক সংস্কারে সহায়তা করা জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান-পূর্ব ও পরবর্তীকালে পুলিশ হত্যা ও মব জাস্টিসসহ সব হত্যারই সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন ফলকার টুর্ক।
দুদিনের বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এসব কথা বলেন।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, টুর্ক গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় তিনি জানান, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময়ের জঘন্য অপরাধ বিষয়ে তদন্ত করে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ফলকার টুর্ক বলেন, ‘কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যেকোনো হত্যার বিচারের জন্য অনুসন্ধান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সাহায্য করাটাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের কাজই হলো বাংলাদেশের এ পরিবর্তনে পূর্ণ সহায়তা করা। নতুন সরকারের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে, তারা সবার সহায়তা পেলে সবকিছুই করতে পারবে।’
বর্তমানে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, ‘আগের সময়ের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা করব।’ পাশাপাশি মব জাস্টিস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মব জাস্টিস (দলবদ্ধ গোষ্ঠীর বিচার) কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি অপরাধের ঘটনার তদন্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতে যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়। একটি ভিন্ন বাংলাদেশ দেখছি আমরা।’
সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ছাড়া কিছু মামলা হচ্ছে। সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে টুর্ক বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের বিষয়গুলো ভালো করে যাচাই করতে হবে। সবকিছুই আমাদের তদন্তের আওতায় আসবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার জন্যই আমরা ঢাকায় অফিস নিতে আগ্রহী।’
রোহিঙ্গাদের সাহায্যের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো সারা বিশে^ অনেক বেশি সাহায্য আমাদের কাছে চাওয়া হয়। অনেক ধরনের উদাহরণ আছে আমাদের কাছে। রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা কঠিন হলেও আমরা সহায়তা করে যাচ্ছি।’
মঙ্গলবার ভোররাতে দুদিনের সফরে ঢাকায় পৌঁছান জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। গত দুদিনে তিনি সাতজন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকাল তিনি সকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া তিনি সংস্কার কমিশনগুলোর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সর্বশেষ বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন ফলকার টুর্ক।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফলকার টুর্ক ঢাকায় জাতিসংঘের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশনের কার্যক্রম ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রধান, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যা অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করছে, তার কাজ নিয়েও আলোচনা করেন টুর্ক। পাশাপাশি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত সংস্কার কমিশন নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
স্বৈরাচারী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া বলপূর্বক গুমের বহু ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান ফলকার টুর্ক। তিনি বলেন, গুমের ঘটনা তদন্তে তার অফিস তদন্ত কমিশনকে সহায়তা করছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘স্বাধীন’ এবং ‘সম্পূর্ণ কার্যকরী’ করে শক্তিশালী করার জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ফলকার জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ঢাকায় তাদের উপস্থিতি জোরদার করতে চায়।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারকে বাংলাদেশ সফর করার জন্য এবং অভ্যুত্থানের সময় তার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তার সরকার প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং উন্নয়ন ও মানবাধিকার যেন একসঙ্গে চলতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমান সরকার আগের সরকারের ভুল ও অপরাধের ‘পুনরাবৃত্তি’ করবে না বলেও জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রয়োজনে সংস্কার কমিশনকে কারিগরি সহায়তা : গতকাল সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রধানদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি কোনো কমিশনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট (কারিগরি সহায়তা) লাগে, তারা তা দিতে রাজি আছে। এ ছাড়া লজিস্টিক সাপোর্ট দিতেও তারা আগ্রহী।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পরিচালনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।
বিক্ষোভের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি, মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা এগিয়ে নিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য সুপারিশ করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের দপ্তরটি বাংলাদেশে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম মোতায়েন করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার একটি আগাম পর্যবেক্ষক দল ২২ থেকে ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করে। তারা সে সময় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।