খারাপ খেলতে বললে ওরা সেরা হতো না

অনেক গঞ্জনা সয়ে, অনেক অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হয়েও এতদিন মুখ বুজে ছিলেন গোলাম রব্বানী ছোটন। দল থেকে অনেকদিন ধরেই অনেক দূরে তিনি। ২০২২ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর তার হাতে গড়া মেয়েরা প্রথমবারের মতো সাফ শিরোপা জিতে নেয়। এরপর ঘটেছে অনেক ঘটনা। অভিমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দেন। বাফুফের তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন থেকে শুরু করে দায়িত্বশীলরা বারবার অনুরোধ করেও তাকে ফেরাতে পারেননি দায়িত্বে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মহিলা দলের কোচের দায়িত্বে পালন করে যাচ্ছেন। অথচ তাকেই জাতীয় দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলার দাঁড় করিয়ে দেন আসামির কাঠগড়ায়। জাতীয় দলের মেয়েদের নাকি তিনি খারাপ খেলতে দূর থেকে উসকানি দেন। এমন অভিযোগের পরও তিনি টুঁ শব্দটি করেননি। কিন্তু সাবিনারা যখন আরেকবার হিমালয় জয় করলেন, আর নিজেকে ধরে রাখেননি দেশের নারী ফুটবলের নেপথ্য কারিগর ছোটন। বাটলারের জবাবটা দিলেন একেবারের মোক্ষম সময়ে, ‘আমি যদি মেয়েদের খারাপ খেলতে বলতাম, তাহলে তারা আবার সেরা হতে পারত না।’

সাবিনা, মারিয়া, সানজিদা, কৃষ্ণা, তহুরা, মাসুরা, ঋতু, শামসুন্নাহাররা একেকজন ছিলেন একেকটি মাটির ঢেলা। ছোটনই তাদের গড়ে তোলেন একেকজন হীরক খ- রূপে। এর জন্য তার আত্মত্যাগের গল্প না হয় আরেকদিন করা যাবে। দু’বছর আগে সাফ জিতে আসার পর মেয়েরা যখন আরও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের স্বপ্নে বিভোর, তখন ছোটন অনেক চেষ্টা করেছেন মেয়েদের প্রাপ্য অধিকারটা বুঝিয়ে দিতে। তবে সেই চেষ্টা বিফল হয় বাফুফের অদূরদর্শিতা আর তৎকালীন ব্রিটিশ টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির স্বেচ্ছাচারিতায়। ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ যখন অন্ধকারে, নিজের যখন কিছুই করার নেইÑ তখন বুঝতে পারলেন বাফুফের এই চাকরি আর তার জন্য নয়। তাই অভিমানে চাকরি ছেড়ে দেন হুট করে। ছোটনের এমন সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়েন ক্যাম্পে থাকা একঝাঁক ফুটবলার। কোনো অবস্থাতেই প্রিয় স্যারের বিদায় মেনে নিতে পারেননি তারা। বাফুফের কাছে বারবার অনুরোধ করেছেন ছোটনকে ফিরিয়ে আনার। মেয়েদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেখে বাফুফেও ছোটনকে বারবার ফেরার অনুরোধ জানায়। তবে ছোটন তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়। পল স্মলির সঙ্গে যে কাজ না করার পণ করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফেরানো যায়নি। বাফুফে ভবন ছেড়ে যাওয়ার পর একদিনও আর মেয়েদের ডরমেটরিতে ঢুঁ মারেননি এই কোচ। তবে কোনো সমস্যায় পড়লে যখনই মেয়েরা ছোটনের দ্বারস্থ হয়েছেন, কখনই নিরাশ করেননি। ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছেন সমাধান দেওয়ার। আর এটাই বাটলারের ভালো ঠেকেনি।

জোড়া সাফজয়ী এই দলের বেশিরভাগ ফুটবলারকেই গড়ে তুলেছেন ছোটন। তো, কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, এদের ওপর ছোটনের প্রভাবটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার নয়। তবে সন্তানতুল্য এই ফুটবলারদের মায়া ত্যাগ করে যখন বাফুফে ছাড়েন ছোটন, তখন তার কী দায় পড়েছে বাইরে থেকে মেয়েদের প্ররোচনা দেওয়ার? এই প্রশ্নটা নিজেই রাখলেন ছোটন, ‘এই মেয়েগুলোকে আমি নিজ হাতে গড়েছি। ওদের সুদিনে কখনই আমি কাছে থাকি না। তবে ওরা কোনো সমস্যায় পড়লে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমি চেষ্টা করি সমস্যার সমাধান দেওয়ার। তবে এই টুর্নামেন্টে আমি তাদের কোনো রকম পরামর্শ দিইনি। তাদের ফোন আমি এড়িয়ে গেছি। অথচ কোনো অপরাধ না করে আমাকে অপরাধী করা হয়েছে। এই দলের কোচ খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছেন। একজন নিরপরাধী মানুষকে এভাবে হেনস্তা করার কোনো অধিকার তার নেই।’

এরপর যোগ করেন, ‘আমার সম্পর্কে উনি (বাটলার) কী জানেন? এই মেয়েদের আমি এত বছর ধরে কী করে লালন পালন করেছি, তার কোনো ধারণা কি তার আছে? আচ্ছা আমি ধরে নিলাম, ওদের খারাপ খেলতে বলেছি। তাহলে এমন পারফরম্যান্স মেয়েরা কী করে করল পুরো টুর্নামেন্টে? কী করে তারা আবারও দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হলো?’

প্রিয় শিষ্যদের এমন বিজয়ের দিনে ছোটন ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো উগরে যেমন দিয়েছেন, তেমনই প্রাণভরে তাদের জানিয়েছেন ভালোবাসা, ‘আমি জানতাম ওরা যদি ওদের স্বাভাবিক ফুটবলটা খেলে, তবে জিতবেই। কারণ দিনের পর দিন ওদের মনোবল নিয়ে আমরা কাজ করেছি। ওদের নার্ভ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। এদের প্রত্যেককে রগে রগে আমি চিনি। অথচ আমি নাকি ওদের খারাপ পরামর্শ দেব! আমি এই মেয়েদের প্রাণঢালা ভালোবাসা জানাই দূর থেকে। ওরা কারও জন্য নয়, শুধুমাত্র দেশের জন্য খেলেছে এবং আমাদের গোটা জাতিকে আবারও গর্বিত করেছে।’

এই বিজয়ের সাক্ষী ডাগআউট থেকেই হতে পারতেন ছোটন। ভাসতে পারতেন আবেগ-উল্লাসে। অথচ তার থাকা হয়নি। তাতে আফসোস নেই ছোটনের। সেই খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই এভাবেই যে নিজেকে গড়ে তুলেছেন এই কোচ। তাই তো, না থেকেও বীর ফুটবলারদের সত্তায় মিশে রয়েছেন তাদের প্রিয় ছোটন স্যার।