হাসিমুখে গান শোনানো মানুষটাও হয়তো দিন শেষে একা: নদী

সম্প্রতি কণ্ঠশিল্পী মনি কিশোর প্রয়াত হয়েছে। মৃত্যুর ৪/৫ দিন পর ঘর থেকে গন্ধ বের হওয়ায় পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে। শিল্পীর এমন মৃত্যু গভীরভাবে ভাবিয়েছে কণ্ঠশিল্পী মৌমিতা তাশরিন নদীকে।

এক ফেসবুক পোস্টে এ গায়িকা লিখেছেন, আমি কোনোদিনই আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কোনোকিছু নিয়ে লিখিনি। কারণ, ‘ফেসবুক বিপ্লব’ আমার বরাবরই অপছন্দের বিষয়। যা করে কোনো ফলাফল আসেনা, তা করার কোনো মানে নেই। তবে এখন, কিছু কথা লেখা খুব প্রয়োজন মনে করছি। সবিনয়ে জানাচ্ছি, এগুলো কোনো অভিযোগ নয়, অভিমান নয়। আর, এই কথাগুলো শুধু সঙ্গীতাঙ্গন না, আমাদের এই পুরো এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির সাথে যারা জড়িয়ে আছেন তাদের সবার জন্যই। হতে পারেন তিনি একজন সংগীতশিল্পী বা অভিনয় শিল্পী বা নির্মাতা বা সাংবাদিক বা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বা একজন মেকআপ আর্টিস্ট। আমি এই ইন্ডাস্ট্রির অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ হলেও নিজেকে এই বিশাল পরিবারের একজন ভাবি। তাই, পরিবারের বড়, ছোট, সমবয়সী সবাইকে নিয়ে চিন্তা আসাটাই স্বাভাবিক যখন বিষয়গুলো বারবার নির্মমতার দিকে এগিয়ে যায়!

তিনি বলেন, কদিন আগেই আমি একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। সেখানে লিখেছিলাম -'জীবনের সব কোলাহলের মাঝে একজন আর্টিস্ট অনেক একা এবং নেগলেক্টেড'। স্ট্যাটাসটা দেবার পর অনেকেই সেখানে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।  কিন্তু বিষয় হলো, এই যে আমি একটা স্ট্যাটাস দিলাম, সবাই কমেন্ট করলেন, কৃতজ্ঞতা জানালাম- এতেই শেষ? আর কিছু কি করার নেই আমাদের? একদিন যে মানুষের গান শুনে বা অভিনয় দেখে বা লেখা পড়ে লাখো মানুষ আনন্দ খুঁজে পেয়েছে, শত হাজার মানুষ প্রেরণা পেয়েছে, স্বান্ত্বনা পেয়েছে, সেই মানুষ কীভাবে একটা সময়ে এসে ভয়ঙ্কর একা হয়ে যায়?! 

মনি কিশোরের প্রসঙ্গে বলেন, নব্বই দশকের দুর্দান্ত জনপ্রিয় একজন গায়ক একা বাসায় মরে পড়ে থাকলেন, কেউ খবর পেলো না - কিছুদিন আগের এই ঘটনা আমাকে ভীষণ ভাবিয়েছে। একটা মানুষকে এতোটা একা করে দেয়া কিভাবে সম্ভব?! এমন আরও অনেক শিল্পীরই শেষ জীবন কেটেছে একাকীত্বে, নি:সঙ্গতায়, নির্জনতায়। কেউ বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। আবার অনেকে আত্মহত্যা না করলেও বা একা মরে পড়ে না থাকলেও সবার কাছে অবহেলিত হয়ে নিজেকে এতোটাই গুটিয়ে নিয়েছেন যে তাঁরা জীবিত থেকেও মৃতের মতোই জীবন কাটাচ্ছেন। এমন ভয়ানকভাবে অবহেলিত কোনো হবে একজন মানুষ, তাও আবার নিজের মানুষদের কাছেই? ইন্ডাস্ট্রিতে এতো এতো শুভাকাঙ্ক্ষী-বন্ধু, এই ইন্ডাস্ট্রির মতো এতো বড় একটা পরিবার কেনো একটা সময় থেকেও থাকে না? 

হতাশা প্রকাশ করে নদী বলেন, হাসিমুখে গান শোনানো মানুষটা বা পর্দায় দুর্দান্ত অভিনয় করে যাওয়া মানুষটা যে দিনের শেষে একা, সেটা কি আমরা কখনো বোঝার চেষ্টা করি? আবারও বলি, আমি দর্শক-শ্রোতাদের কথা বলছি না। বলছি ‘আমাদের’ কথা। আমরা যারা শিল্পচর্চা করি, আমরা যারা ভাবি ‘সবাই আমাদের বোঝেনা’, আমরা আমাদেরকে কতোটা বুঝি? কতোটা জানি? কতোটা খেয়াল-খবর রাখি? 

নিজেকেও দোষী মনে করে এই গায়িকা বলেন, সেদিন থেকে আমার নিজেকেও দায়ী/দোষী মনে হচ্ছে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা হাসিমুখে গিটার বা কিবোর্ড প্লে করছেন- মানুষটা আসলেই মানসিকভাবে ভালো আছেন কি না বা অন্যকোনো কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন কি না, সে খোঁজ আমরা ক'জন রাখি? আমরা ক’জন আমাদের এই পরিবারের প্রতিটি মানুষ বা প্রতিটি স্তরের মানুষের সাথে আন্তরিক ভাবে সুন্দর আচরণ করে এবং তাদেরকে নিরাপদ বোধ করিয়ে সমস‍্যা শেয়ার করার জায়গাটা করে দেই?