নীতিমালার ফেরে ওএমএসের আটায় অস্থিরতা

ব্যবসায়ীদের রেষারেষিতে খোলাবাজারে (ওএমএস) আটা সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে চালের ঊর্ধ্বমূল্যের সঙ্গে আটার দামও বেড়ে গেলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনধারনে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে মনে করছেন খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

২০০০ সাল থেকেই ওএমএস কর্মসূচিতে আটা সরবরাহ করেন নারায়ণগঞ্জের মিল মালিকরা। ঢাকার তুলনায় নারায়ণগঞ্জের মিলের সংখ্যাও বেশি। ঢাকায় মিল ছয়টি আর নারায়ণগঞ্জে ১৬টি। এ কারণে তাদের বরাদ্দও বেশি। সম্প্রতি সেই বরাদ্দে ভাগ বসানোর জন্য ঢাকার ব্যবসায়ীরা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। মো. মাহফুজ আহমেদ নামে এক ভোক্তা গত ২৫ সেপ্টেম্বার খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি সময়মতো খাদ্য অধিদপ্তরের ট্রাক থেকে আটা কিনতে পারেন না। ট্রাকগুলো সময়মতো নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয় না বলেও দাবি করেন তিনি।

নিজেকে দিনমজুর দাবি করে মাহফুজ আরও জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে আটা ঢাকায় আনার কারণে ওএমএসের ট্রাক সময়মতো নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে পারে না। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে আটা কিনতে ব্যর্থ হলে তার উপার্জনের সময়ও থাকে না। এ কারণে তিনি নারায়ণগঞ্জের বাড়তি বরাদ্দ ঢাকার ব্যবসায়ীদের দেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগ পাওয়ার পর খাদ্য মন্ত্রণালয় ঢাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুন আল মোর্শেদ চৌধুরীর কাছে প্রতিবেদন চায়। প্রতিবেদনে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানান, অভিযোগকারীর অভিযোগ সঠিক নয়। ঢাকা জেলার মিলগুলোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোও ঢাকা জেলায় সঠিক সময়ে আটা সরবরাহ করছে। ডিলাররা এই আটা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন।

এ ছাড়া, ঢাকা জেলার মিলগুলোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলার মিলগুলোকে পেষণ ক্ষমতার আনুপাতিক হারে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা জেলার মিলগুলো থেকে আপত্তিমূলক কোনো পত্রও পাওয়া যায়নি বলে জানান মামুন আল মোর্শেদ চৌধুরী। এরপর দিনমজুর মাহফুজ আহমেদ বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে যান। আদালতের নির্দেশনার মেয়াদ পার হলেও স্বাভাবিক নিয়মে ফিরছে না খাদ্য অধিদপ্তর।

খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি রেষারেষির। নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোর সক্ষমতা বেশি। নদীবন্দর ও ব্যবসাকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে অনেক আগে থেকেই মিল গড়ে উঠেছে। ২৪ বছর আগে থেকেই তারা সরকারকে আটা-ময়দা সরবরাহ করে আসছে। এ কারণে তারা নিজস্ব ব্র্যান্ডের দিকে মনযোগী হয়নি। শুধু ওএমএসের ওপর নির্ভর করে কারখানাগুলো পরিচালিত হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকার কিছু নামি করপোরেট প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসায় নেমেছে। এতে নারায়ণগঞ্জের এসব ছোট ও পুরনো মিলের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া নীতিমালা নিয়েও কিছু জটিলতা রয়েছে। নীতিমালা বারবার সংশোধন করা হয়েছে। এসব সংশোধনীর সময় স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন হিসেবে মিলারদের ডাকা হয়নি। গত দুই বছরে খাদ্য মন্ত্রণালয় ওএমএসের আটা বিতরণ নীতিমালায় ১০ দফা পরিবর্তন আনে। এসব পরিবর্তনের সময় স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি সরকার।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদুল হাসান এক প্রশ্নের জবাবে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্টেকহোল্ডারদের ডেকে শিগগিরই সমস্যার সমাধান করা হবে।’

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করে। প্রতি কেজি আটা ২৪ টাকা দরে বিক্রি করে। বাজারে এই মানের আটা বিক্রি হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে।

নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতি ও ফ্লাওয়ার মিলস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জসিম উদ্দিন মৃধা খাদ্য সচিবের কাছে এক আবেদনে জানান, চলমান ওএমএস কার্যক্রমকে ব্যাহত করার জন্য বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারীরা নানা উপায়ে কাজ করছে। এতে করে মন্ত্রণালয় মিলারদের সঙ্গে কথা না বলে নানা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাতে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সরকারের খাদ্যবন্ধব কর্মসূচি ক্ষতির মুখে পড়বে। তাছাড়া মিলের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েবেন।

সংশোধিত নীতিমালা ২০২২ অনুসরণ করে জেলার ময়দা মিলগুলোকে ওএমএস কার্যক্রমে গম বরাদ্দ করা হলে নারায়ণগঞ্জের মিলগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হবে। জেলা মিল মালিকদের গম বরাদ্দ দিলে নারায়ণগঞ্জের মিল মালিকদের ব্যাপক ঋণসহ অন্যান্য দায়-দেনা বেড়ে যাবে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মহানগরের শ্রমঘন এলাকার মানুষের পাশে থাকা মিলগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শ্রমিকরা কর্মহীন হলে ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি খাদ্য সচিবকে শতর্ক করেন।