ট্রাম্প না কমলা এখন শুধু ক্ষণগণনা

দুয়ারে কড়া নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। আগামী মঙ্গলবার দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই গুজব, বিভ্রান্তিকর সব অভিযোগ এবং ভোটার ও ভোট জালিয়াতি নিয়ে মিথ্যা তথ্যে সয়লাব হয়ে উঠছে অনলাইন দুনিয়া। আর এসব বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ বেশি রিপাবলিকান-সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে। ডেমোক্র্যাট সমর্থকরা রিপাবলিকানদের মতো অতিমাত্রায় অভিযুক্ত না হলেও, তাদের কাছ থেকেও কিছুসংখ্যক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনের আগে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া জালিয়াতি ও অনিয়মের এসব কথিত অভিযোগের ঝড় সামলানো নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী মঙ্গলবার ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গুজব মোকাবিলা করা এবং ভোটারদের আশ^স্ত করতে হচ্ছে। রিপাবলিকান সমর্থকদের প্রায় প্রতিটি অনলাইন পোস্টগুলোতে ট্রাম্পের প্রচারশিবিরের মিথ্যা দাবিকে সমর্থন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছিলেন। এবার ৫ নভেম্বরের নির্বাচনে তাকে আবারও প্রতারণা করে পরাজিত করা হতে পারে। তবে এ অভিযোগের সপক্ষে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেননি রিপাবলিকানরা। গত সোমবার প্রকাশিত সিএনএন-এসএসআরএসের জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ট্রাম্প পরাজিত হলে ফল প্রত্যাখ্যান করবেন।

সেপ্টেম্বরে দুই প্রার্থীর টেলিভিশন বিতর্কের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, যদি সুষ্ঠু ও বৈধ নির্বাচন হয় তাহলে তিনি ফল মেনে নেবেন। চলতি সপ্তাহে দোদুল্যমান রাজ্য পেনসিলভানিয়ায় ব্যাপক ভোটার জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন ট্রাম্প নিজেই। এজন্য তিনি ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে বিচারও দাবি করেন।

ট্রাম্পের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কর্মকর্তারা পেনসিলভানিয়ার তিনটি কাউন্টিতে ভোটার রেজিস্ট্রেশন আবেদন এবং জালিয়াতির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে কাজ করছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজ বোর্ডে এবং চ্যাট গ্রুপে নির্বাচনী জালিয়াতির শত শত অভিযোগ খতিয়ে দেখেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, পোস্টগুলো ইঙ্গিতই দেয় যে, নির্বাচনের আগে সাধারণের মনে অবিশ্বাসের বীজ বপন করা হচ্ছে। এমনকি কিছু কিছু পোস্টে ভোটিং মেশিন সম্পর্কে মিথ্যা দাবি এবং ব্যালট গণনা প্রক্রিয়ায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন যে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এমন মিথ্যা, ভ্রান্ত তথ্যের প্রচারে নির্বাচনের ফল নিয়ে মানুষের আস্থা ক্ষুণœ হতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনের দিন এবং এরপরও পরিস্থিতি হুমকি এবং সহিংসতার দিকে চলে যেতে পারে। যেমনটি ঘটেছিল ২০২০ সালের নির্বাচনে।

এদিকে, নির্বাচনে ভোটের আগে শেষ মুহূর্তে জোর প্রচার চালাচ্ছেন আসন্ন নির্বাচনের দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। গত শনিবার দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য নর্থ ক্যারোলিনায় প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন দুজনই। শেষ সময়ে এসে ভোটারদের নিজ বলয়ে টানতে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরছেন দুই প্রার্থীই। নর্থ ক্যারোলিনা জনসমাবেশে ট্রাম্প বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনবেন তিনি। গ্রিনসবোরো শহরে করা এ সমাবেশে ৯০ মিনিট ধরে দেওয়া ভাষণে কমলা হ্যারিসকে মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন ট্রাম্প। এ সময় সমর্থকদের আমেরিকান স্বপ্ন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন সাবেক এ প্রেসিডেন্ট। সেই সঙ্গে মঙ্গলবারের নির্বাচনের দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তি দিবস হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

একই রাজ্যের শার্লট শহরে সমাবেশ করেন কমলা হ্যারিসও। সেখানে সাধারণ মানুষদের জীবনযাপন সহজ করতে কর কমানোর ঘোষণা দেন তিনি। হোয়াইট হাউজে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণে নতুন আইন করার কথা বলেছেন কমলা। সমাবেশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ট্রাম্প একচেটিয়া ক্ষমতা চান বলেও মন্তব্য করেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট। কমলা বলেন, তিনি অস্থির এবং প্রতিশোধপরায়ণ মানুষ। সরকার পরিচালনার জন্য তিনি মোটেও উপযুক্ত ব্যক্তি নন।

প্রচারের ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবারও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে চষে বেড়িয়েছেন কমলা ও ট্রাম্প। দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য মিশিগানে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন কমলা। এ সময় ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ট্রাম্পের ঘৃণার রাজনীতি রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আর সমর্থকদের নিয়ে জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা ও পেনসিলভানিয়ায় সমাবেশ করেন ট্রাম্প। এসব সমাবেশে তার জাতীয়তাবাদী কৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে তাকে।

এদিকে নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শক্ত ঘাঁটিতে হিসেবে পরিচিত আইওয়াতে জনমত জরিপে ট্রাম্পের থেকে এগিয়ে গেছেন কমলা। আইওয়ার ডেজ মইনেস রেজিস্ট্রার/মিডিয়াকম আইওয়ার পোলের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গত ২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জরিপ শেষে গত শনিবার ফল প্রকাশ করা হয়। ৮০৮ জন ভোটার জরিপে অংশ নেন। জরিপে কমলা ৪৭ শতাংশ ও ট্রাম্প ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জরিপ পরিচালনাকারী পত্রিকা দ্য রেজিস্টার বলেছে, জনমত জরিপে দেখা গেছে নারীরা, বিশেষ করে বয়স্ক ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নারীদের ভোট কমলার দিকে গেছে। তবে একই রাজ্যে এমারসন কলেজ পোলিং/রিয়ালক্লিয়ারডিফেন্সের ভিন্ন এক জরিপে উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে। এ জরিপে ট্রাম্প কমলার চেয়ে ১০ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। এমারসন কলেজের জরিপ অনুযায়ী, পুরুষ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জোরালো। তবে ৩০ বছরের কমবয়সী ভোটারদের পছন্দ কমলাকে। রাজ্যটিতে ট্রাম্প ২০১৬ সালে ৯ শতাংশের বেশি পয়েন্ট ব্যবধানে এবং ২০২০ সালে ৮ পয়েন্ট ব্যবধানে জিতেছিলেন।