হালাল সাবান থেকে স্বপ্ন’র ১৬০ টাকা 

যুগান্তকারী যত বিজনেস ‘আইডিয়া’

দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাছ-মাংস কেনা নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য একরকম দুঃসহ ব্যাপার। নিম্নআয়ের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত অনেকের পক্ষেও পছন্দমত মাছ-মাংস কেনা কষ্টসাধ্য। বিগত কয়েক বছর ধরেই বাজারে গরুর মাংস চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই গরুর মাংস কিনে পরিবার নিয়ে খেতে পারেন না। অনেক বাবা-মা অর্থের কাছে হার মেনে সন্তানের গরুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছেটাও পূরণ করতে পারেন না।

ঠিক এই সময়ে ‘স্বপ্ন’ সুপারশপ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ১৬০ টাকায় ১০ পিস গরুর মাংসের সঙ্গে ১০ পিস আলুর একটি অফার চালু করেছে। যা দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তার প্রমাণ মিলে স্বপ্ন’র ফেসবুক পেজে। তিনদিন আগে এই সংক্রান্ত একটি ফটোকার্ড করে ফেসবুক পেজে শেয়ার করে স্বপ্ন। যা মুর্হূতেই স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর আউটলেটগুলোতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেকেই স্বল্প মূল্যে পাওয়া প্যাকেজটি কিনতে ভিড় করেন। এদিকে বিষয়টি নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় স্বপ্ন সুপারশপকে অনেকেই ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের এই অস্থির সময়ে যুগান্তকারী এই আইডিয়াকে সমর্থন করে মানুষ স্বপ্ন সুপারশপকে দেশের সব আউটলেটে এই সেবা চালুর অনুরোধ জানাচ্ছেন। 

মিজানুুর রহমান নামের এক ব্যক্তি স্বপ্ন সুপারশপের ফেসবুক পেজে গিয়ে কমেন্টে লিখেছেন, ‘আমি যখনই গরুর মাংস খেতে বসি তখনই দেশের মানুষের কথা মনে পড়ে। লক্ষ লক্ষ বাবা-মা আছেন যারা তাদের সন্তানের মুখে এক টুকরো মাংস তুলে দিতে পারেন না। আপনাদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এই একটি পণ্যতে না হয় প্রফিট না করলেন।’

স্বপ্ন’র এই কার্যক্রম কেন গ্রহণ করা হয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে স্বপ্ন'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ১৬০ টাকার এই গরুর মাংসের অফারটি আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে এনেছি। তবে অফারটি এরই মধ্যে মানুষের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রোটিনের যোগান দিতে মূলত আমাদের এই উদ্ভাবনী পদক্ষেপ। আমরা গ্রাহকদের জন্য ভবিষ্যতে এমন আরও অফার নিয়ে আসবো। ১৬০ টাকায় গরুর মাংসের এই অফারটি আমরা সীমিত পরিসরে এনেও যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি তা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। তবে প্রোডাক্টটি একদম নতুন কনসেপ্ট হবার কারণে আমাদের সকল কর্মীদের এটির প্রসেসিংয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য আমাদের একটু সময় লাগছে। অল্প সময়ের মাঝেই আমরা সারাদেশের সকল আউটলেটে একযোগে এই অফারটি নিয়ে আসবো।’

এর আগেও নানা সময়ে যুগান্তকারী কিছু বিজ্ঞাপন আইডিয়া দিয়ে মোবাইল কোম্পানি, সাবান কোম্পানিসহ কিছু কোম্পানি নিজেদের প্রোডাক্ট দিয়ে বাজার দখল করে। এমন কয়েকটি কোম্পানি হচ্ছে-নব্বইয়ের দশকের একটেল সিম, অ্যারেমেটিক বিউটি সোপ, আলমের পঁচা সাবান ও ডিজুস সিম।

নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় অ্যারেমেটিক বিউটি সোপ ও পঁচা সাবান:

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল লাক্স সাবান। শুধু বাংলাদেশে না বর্হিবিশ্বেও যা ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার মাঝেই দেশে ১০০ ভাগ হালাল সাবান এই স্লোগান নিয়ে বাজারে আসে অ্যারেমেটিক বিউটি সোপ। শুধু হালাল এই স্লোগানের কারণেই তখন দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাবানটি। এমনকি তৎকালীন সময়ে জনপ্রিয় লাক্স সাবানকে পিছনে ফেলে বাজারে জায়গা করে নেয় অ্যারেমেটিক বিউটি সোপ সাবান। এই সাবানের জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, সেই সময়ে মৃত ব্যক্তিদের গোসল করানোর জন্য এই সাবান খুঁজতেন মানুষ। আর এই কাজটি করেছেন সৈয়দ আলমগীর, যিনি এখন এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কীভাবে এই ধারণাটি তিনি পেয়েছিলেন বিষয়টি সম্পর্কে এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সেই সময়ে দেশে জনপ্রিয় সাবান ছিল লাক্স। বাজারে নতুন সাবান মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে ব্যক্তিক্রম কিছু করা দরকার। সেই তাগিদ থেকেই হালাল সাবান ধারণাটি আমার মাথায় আসে। আমি জানি অন্যান্য সাবানগুলো গরু ও শুকরের চর্বি দিয়ে বানানো হয়। তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই আমার সাবানটি হবে হালাল। সেই ধারণা থেকে সাবানটি ভেজিটেবল ফ্যাট দিয়ে বানানো হয়। কাজেই আমি বলেছি এই সাবানটি ১০০ ভাগ হালাল। তখন বিজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের সমস্ত সাবান হারাম, সমস্ত সাবান বর্জন করুন এবং ব্যবহান করুন একমাত্র ও ১০০ ভাগ হালাল সাবান অ্যারেমেটিক বিউটি সোপ।’ এই ধারণার জন্য মার্কিন বিপণন বিশেষজ্ঞ ফিলিপ কোটলার বইয়ে তিনি স্থান করে নেন।

ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে হাতে গোনা দুই-একটি কোম্পানি উৎপাদন করত কাপড় কাচা সাবান। ওই সময় দেশে কদর ছিল আমদানি করা সাবানের। এর মাঝে হঠাৎ করেই স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আলম সোপ অ্যান্ড ফ্যাক্টরি লিমিটেড নিয়ে আসে আলমের ১ নং পঁচা সাবান। নামটি দৃশ্যত অদ্ভুত, দেখতেও খুব একটা ঝকঝকে নয়।

তবে কিছু দিনের মধ্যেই আলমের ১ নং পঁচা সাবান পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। প্রান্তিক পর্যায়ে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত অনেক পরিবার আপন করে নেয় এই সাবান। তখন বিটিভির পাশাপাশি রেডিওতে পঁচা সাবানের জনপ্রিয় জিঙ্গেল এখনও হয়তো মনে করতে পারেন অনেকে। ‘সাবান আছে মনের মতো কাপড় কাচে...। আছে এমন সাবান আছে পঁচা সাবান, আলমের ১ নং পঁচা সাবান।’

যে কারণে গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে একটেল ও ডিজুস সিম:

নব্বইয়ের দশকে দেশে কয়েকটি সিম কোম্পানি বাজারে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে নানা পদক্ষেপ নেয়। এর পরেও ঠিক গ্রাহকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারছিল না। এমন সময় ১৯৯৭ সালে বাজারে আসে একটেল সিম। এই সিমটি বাজারে আসার পর নানা অফার দিয়ে সেই প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন অন্যান্য সিমে কলরেট বেশি হওয়ার কারণে গ্রাহকরা কম কলরেট একটেল গ্রাহক হতে শুরু করে। 

এদিকে ‘বন্ধু আড্ডা গান—এখানেই (ডিজুস) হারিয়ে যাও...’ এই টিভি বিজ্ঞাপনে এক সময় বুঁদ হয়ে ছিল একটি প্রজন্ম। যে প্রজন্মকে অনেকেই বলেন ডিজুস প্রজন্ম। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় সিম ছিল ডিজুস। যে সিমের কল্যাণে ওই প্রজন্ম একদম ফ্রি কলরেটে কথা বলায় সুযোগটি পায়। গ্রামীণফোনের সাব ব্রান্ড ডিজুস সেই সময়ের তরুণের মনে ব্যাপকহারে সাড়া ফেলে।

আর এর পিছনে ছিল গ্রামীণফোনের ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন কৌশল ও অফার। গতানুগতিক বিজ্ঞাপন মাধ্যমে ব্যবহৃত অফিসিয়াল ভাষা এড়িয়ে তারা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেন। একইসঙ্গে যোগ করেন তরুণদের। এর পাশাপাশি নির্ধারিত রাত ১০ থেকে সকাল ১০টা, পরবর্তীতে রাত ১২টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ডিজুস টু ডিজুস নম্বরে কলরেট একদম ফ্রি করা হয়। এই অফারের ফলে সিমটি অল্প দিনের মধ্যে দেশের নামকরা সিমের জায়গা দখল করে। পাশাপাশি নামমাত্র টাকায় মেসেজ কেনার সুযোগসহ গ্রুপ কলে কথা বলায় সুযোগ দেয় সিমটি।

ঠিক এভাবেই সময়ের প্রয়োজনে কোম্পানিগুলো নিজেদের পণ্য ভোক্তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য অফার দিয়ে থাকে। পাশাপাশি তৈরি করেন বিজ্ঞাপন। যা সময় বিবেচনায় মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ও ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

এদিকে এই প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় আরেকটি টিভি বিজ্ঞাপন হচ্ছে গ্রামীনফোন সিমের ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার...’। যে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রামীণফোন এই প্রজন্মের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক ঈদ কিংবা ছুটি আসলেই এই গানটি স্যোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হয়। ঠিক এভাবেই সময়ের সঙ্গে ব্যতিক্রমী ও মজাদার বিজ্ঞাপনে পণ্য বিক্রিসহ প্রোডাক্ট পরিচয় করে যাচ্ছে কোম্পানিগুলো।