সম্পদের হিসাব চাওয়ায় আতঙ্ক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সবচেয়ে সুবিধা নিয়েছেন এবং অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সুবিধা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করছেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেই আলোকে ১ অক্টোবর বেবিচকের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্পদের হিসাব দিতে আরেকটি চিঠি পাঠায় সংস্থাটি। চিঠি পেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এখন পর্যন্ত কেউ সম্পদের হিসাব দেয়নি বলে একটি সূত্র জানায়। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বেবিচকে নানা অনিয়ম চলে আসছে। টেন্ডার ও নিয়োগ-বাণিজ্যসহ সব ধরনের কর্মকা- চালিয়ে আসছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। কর্তৃপক্ষ অনিয়মের লাগাম টেনে ধরতে একের পর এক নজরদারি করলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বিশেষ করে প্রকৌশল শাখা বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। ছদ্মনামে টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই শাখার শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারীরা পর্যন্ত টেন্ডারে ভাগ বসাচ্ছেন। সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলাদাভাবে নজরদারি শুরু করেছে।

বেবিচক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেবিচক ঘিরে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সিন্ডিকেটগুলো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী গত ১৫ বছর কোটিপতি হয়েছেন। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে নিজের এবং স্ত্রী-সন্তানদের নামে ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি ও বাড়ি কিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। আবার অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী দেশের বাইরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দুদক বেবিচকের কর্মকা- নিয়ে অনুসন্ধান করে আসছে। কোন কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হয় সেই তথ্য উদঘাটনও করে সংস্থাটি। এর মধ্যে বেবিচকের ৩৬টি খাত নিয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে বলে দুদক তথ্য পায়। ইতিমধ্যে দুদক একটি তালিকা করেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর হিসাব চেয়ে চিঠি ইস্যু করা হয়। গত ১ অক্টোবর বেবিচক ৪৩টি শাখায় ওই চিঠি পাঠায়।

বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে যারা নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি করে টাকা কামিয়েছেন, তারা বিপদে পড়তে যাচ্ছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নানা অনিয়মের পেছনে ছিলেন বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগসহ আরও কয়েকটি বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেবিচকের দৃশ্যও পাল্টে যায়। সংস্থাটিতে নতুন চেয়ারম্যান যোগ দেন। বেবিচকের সব বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তানদেরও সম্পদের হিসাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগই সম্পদের হিসাব দেননি বলে জানা গেছে।

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণীতে কোনো ধরনের সন্দেহ দেখা দিলে তা বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনা হবে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমেও তদন্তের জন্য পাঠানো হবে। কর্মীদের স্ত্রী বা স্বামী ও সন্তানদের সম্পদের হিসাবও জমা দিতে হবে। সুতরাং এখানে কিছু গোপন করার সুযোগ থাকবে না।

দুদকের একটি তালিকায় বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার কন্ডিশনার ডাক্ট স্থাপন, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আপগ্রেডেশন, বিমানবন্দরে কাউন্টার এবং কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন, এর যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপন, পুরাতন বোর্ডিং ব্রিজে যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও স্থাপন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে এলইডি লাইট কেনা ও ফিটিংস, বাগান আলোকসজ্জা, এইচটি এবং এলটি সুইচগিয়ার স্থাপন কাজের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। তা ছাড়া বিমানবন্দরের ফ্লোর মাউন্টেড এবং ওয়াল মাউন্টেড প্যানেল স্থাপন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সাইজের পাওয়ার কেবল সরবরাহ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন, রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন লাইট ও লাইট ফিটিংস সরবরাহ, আবাসিক ভবনে ইন্টারনাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজ, সিএএবির নতুন সদর দপ্তরের ভবনের বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট সরবরাহসহ ইএম-সংক্রান্ত কাজ, টার্মিনাল বিল্ডিংসহ বিমানবন্দরের অন্যান্য ভবনের ডেকোরেশন-সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইএম কাজ, বিভিন্ন স্থানে অ্যাপ্রোন মাস্ট লাইট স্থাপন, সিসিআর বিল্ডিং-সংশ্লিষ্ট সব ইএম কাজ, রানওয়ে লাইটিংয়ের জন্য বিভিন্ন সাইজের কেবল সরবরাহ ও সংস্থাপন কাজেও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, বেবিচকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পদের হিসাব দেননি। এমনকি কোনো তাগাদাও দেওয়া হচ্ছে না। কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নামে থাকা সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে। এতে আতঙ্ক ও অস্থিরতার সৃষ্টি হলেও করার কিছুই নেই। সরকারের আদেশ মানতে হবে সব সরকারি কর্মচারীকে। সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার বিষয়টি একটি মহৎ উদ্যোগ। এই উদ্যোগের ফলে দেশের সরকারি, আধা-সরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। আমাদের এখানে যদি কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা কর্মচারী থাকে, তাহলে তাদের মধ্যেই অস্থিরতা থাকবে, অন্যদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তারপরও কেন দেওয়া হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পদের হিসাব দিতেই হবে।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, কয়েক মাস আগে বেবিচকের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার দুর্নীতি অনুসন্ধানে সাতটি প্রকল্প কাজের যাবতীয় নথিপত্র তলব করেছে দুদক। বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সাত ধরনের প্রকল্প কাজসহ ৯ ধরনের নথিপত্র তলব করা হয়েছে। এলটিএমের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকার ওপরে সম্পাদিত কাজের ছক নথিপত্র। যার মধ্যে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ ও পরিশোধিত অর্থের বিল ভাউচার। টার্মিনাল ভবনের ছাদে ওয়াটার প্রুফ কাজের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্র, বিজ্ঞপ্তি (পেপার কাটিং), দাখিলকৃত দরপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যাদেশ, এমবি ও ঠিকাদারকে পরিশোধিত বিল ভাউচার। বেবিচকের কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তিগুলো (পেপার কাটিং), দাখিলকৃত দরপত্রগুলো, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যাদেশ, এমবি ও ঠিকাদারকে পরিশোধিত বিল ভাউচার, বেবিচকের এমটি ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তিগুলো (পেপার কাটিং), দাখিলকৃত দরপত্রগুলো, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ, এমবি ও ঠিকাদারকে পরিশোধিত বিল ভাউচারের ফটোকপি ও ডিভিশন-৩-এর ভবনের সিকিউরিটি গেট নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, ঠিকাদার কর্তৃক দাখিলকৃত দরপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যাদেশ, এমবি ঠিকাদারকে পরিশোধিত বিল ভাউচারসহ ওই প্রকল্পের নথির ফটোকপি, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমপোর্ট কার্গো ভবনের পার্কিং শেড নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, বিজ্ঞপ্তি (পেপার কাটিং), ঠিকাদার কর্তৃক দাখিলকৃত দরপত্রগুলো, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ, এমবি ও পরিশোধিত বিল ভাউচার চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেবিচকের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, ঠিকাদার কর্তৃক দাখিলকৃত দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যাদেশ, এমবি, ঠিকাদারকে পরিশোধিত বিল ভাউচারের কাগজপত্র দিতে বলা হয়েছে।