যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটের দিন আজ। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস নাকি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হবেন হোয়াইট হাউজের পরবর্তী চার বছরের বাসিন্দা ভোটাররা সেটি নির্ধারণ করবেন এদিন। ঐতিহাসিক নিয়ম মেনেই স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ, চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। দেশটির ২৪ কোটি ৪০ লাখ ভোটারের মধ্যে অবশ্য ইতিমধ্যে সাত কোটির বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। সাধারণত, যেসব রাজ্যের ভোট দ্রুত গণনা হয়, সেসব রাজ্যের ফল আগে পাওয়া যায়। তবে আগাম ও ডাকযোগের ভোট গণনার বিলম্ব হলে চূড়ান্ত ফল পেতে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
আজ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ৩৪ জন সিনেটর এবং কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের সবাইকে বেছে নেবেন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা। দেশটিতে সাধারণত সরাসরি সাধারণ ভোটারদের (পপুলার ভোটে) নয় বরং ৫৩৮ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জয়ের জন্য অন্তত ২৭০টি ভোট পেতে হয়। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের একেকটিতে ইলেকটোরাল ভোট একেক রকম। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য কতটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট রয়েছে, তার ভিত্তিতে কতজন ইলেকটোরাল কলেজ হবেন, তা নির্ধারিত হয়। সঙ্গে প্রতিটি রাজ্যে থাকা দুজন সিনেটর ইলেকটোরাল কলেজ হন। কোন অঙ্গরাজ্যে কতটি ডিস্ট্রিক্ট থাকবে, তা নির্ধারিত হয় সেখানে মোট জনসংখ্যার আকারের ভিত্তিতে। যেমন প্রত্যন্ত ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট মাত্র তিনটি। আর সবচেয়ে বেশি ৫৪টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট ক্যালিফোর্নিয়ায়।
এবার ভোটে ট্রাম্প ও কমলা ছাড়াও আছেন আরও চার প্রার্থী। তাদের মধ্যে গ্রিন পার্টির প্রার্থী ৭৪ বছর বয়সী জিল স্টেইন এর আগে ২০১২ ও ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েছিলেন। ওই সময় তিনি দশমিক ৪ শতাংশ ও ১ শতাংশ করে ভোট পেয়েছিলেন। এ ছাড়া প্রার্থী হয়েছেন লিবার্টারিয়ান পার্টির চেজ অলিভার, যিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে ১ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় সবকটিই লড়ছেন দলটির প্রার্থী চেজ অলিভার। তাকে এবারের নির্বাচনের সম্ভাব্য অঘটন সৃষ্টিকারী ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। আরেক আলোচিত প্রার্থী হচ্ছেন রবার্ট জুনিয়র কেনেডি। তার পক্ষে এবারের নির্বাচনে ৫-৭ শতাংশ সমর্থন ছিল। কিন্তু গত আগস্ট মাসে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তবে কয়েকটি অঙ্গরাজ্য তার নাম ব্যালট থেকে সরাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আরেক প্রার্থী হচ্ছেন কর্নেল ওয়েস্ট। গ্রিন পার্টি থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন তিনি। বর্ণবাদবিরোধী ৭১ বছর বয়সী এ শিক্ষাবিদ বাইডেনকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ট্রাম্পকে ‘নব্য ফ্যাসিস্ট’ বলে মনে করেন। তিনি ১২টির বেশি অঙ্গরাজ্যে লড়ছেন। তার সমর্থন অল্প হলেও ডেমোক্র্যাট শিবিরের জন্য তিনি বড় দুশ্চিন্তার নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটে লড়াইয়ের ময়দান উন্মুক্ত থাকলেও সাধারণত প্রাইমারি ও ককাসের মাধ্যমে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। এ দুই পদ্ধতির মাধ্যমে দলগুলো তাদের প্রার্থী বাছাই করে। নির্বাচনী বছরের বসন্তের শুরুর দিকে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। স্বাধীনভাবে কেউ প্রার্থী না হলে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের অধীনে তাকে নিজ অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধন করতে হয়। প্রাইমারিতে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ককাস প্রক্রিয়াটি আরও জটিল। এজন্য অঙ্গরাজ্যগুলোতে রাজনৈতিক দলের সদস্যরা একত্র হন। সেখানে তারা ভোটাভুটির মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থী বাছাই করেন। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে প্রাইমারি ও ককাস শেষ হলে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় কনভেনশনের (সম্মেলন) মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও তার রানিংমেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাই করে। এরপরই শুরু মূলত প্রার্থীদের প্রচার। সাধারণত জুন বা জুলাই মাসে প্রধান দুই দলের দুই প্রার্থীর টেলিভিশন বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু আনুষ্ঠানিক লড়াই। এরপর থেকেই তারা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ঘুরে বেড়ান ভোটারদের মন জয় করতে। আর শেষ সময়ে এসে নামেন ‘সুইং স্টেট’ বা দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে। এবারও প্রচারের শেষ সময়ে দোদুল্যমান রাজ্যগুলো চষে বেড়ান দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিস। নির্বাচন নিয়ে করা জরিপগুলো দুই প্রার্থীর মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে।
জর্জিয়া থেকে বিবিসির নর্থ আমেরিকা করেসপন্ডেন্ট জন সুদওয়ার্থ লিখেছেন, শেষ দিকের প্রচারেও ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রচারে অভিবাসনবিরোধী বার্তাকেই সামনে রেখেছেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে বিবিসির কোর্টনি সুব্রামানিয়ান লিখেছেন, কমলা হ্যারিসের প্রচার দল তার জয়ের বিষয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। তারা দোদুল্যমান রাজ্য বলে পরিচিতি অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এক সমাবেশে দেওয়া বক্তৃতায় কমলা হ্যারিস বলেছেন, গাজা যুদ্ধ অবসানে তিনি তার ক্ষমতা অনুযায়ী সবকিছুই করবেন। মিশিগানেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আরব আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বাস। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর ডিয়ারবর্নে সমাবেশ করেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসরায়েলকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে থাকা ক্ষোভকে পুঁজি করে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
মিশিগান থেকে বিবিসির ম্যাডেলাইন হালপার্ট লিখেছেন, ট্রাম্পের কয়েকটি বক্তৃতা শুনে তার মনে হয়েছে যে, তিনি পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়ায় যেসব কথা বলেছেন, সে অবস্থানেই তিনি থাকতে চান।
তিনি গত কয়েক মাস অর্থনীতি নিয়ে যেসব নীতির কথা বলেছেন, সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। ট্রাম্প ও হ্যারিসের একই বক্তব্য বারবার বলা, বিজ্ঞাপন ও দলীয় স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতা সুইং ভোটারদের জন্য কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। বিবিসি বলছে, ভোটারদের মন জয় করার জন্য রাজনৈতিক কর্মীরা সেখানদের ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। এসব কিছুই অবশ্য প্রমাণ করে যে, সেখানে কতটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে।
আজ যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা বাছাই করবেন তাদের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেই প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়বে বিশ্ব জুড়ে। তাই মাদক-অস্ত্র থেকে শুরু করে অভিবাসী কিংবা পররাষ্ট্র ইস্যুতে প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বাইরের পৃথিবীরও চোখ থাকে। বিভিন্ন ইস্যুতে কমলা ও ডোনাল্ডের অবস্থান এবং সেসব বিষয়ে তাদের নীতি কী আর সেগুলো ভোট টানতে কেমন ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিবিসি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি, কর, গর্ভপাত, অভিবাসন, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, জলবায়ু আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলা যুদ্ধ আর সংঘাত প্রভাবিত করতে পারে নির্বাচনের ফল।
বিবিসি বলছে, বাইডেনের শাসনামলে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অবশ্য কভিড-পরবর্তী সময়ে সরবরাহ সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোকেও ভুগতে হয়েছে। তবে সেসব দেশে পরবর্তীকালে মূল্যস্ফীতি কমেছে। এ বিষয়টি সামনে রেখে কমলা হ্যারিস বলেছেন, প্রথম দিন থেকেই তার অগ্রাধিকার হবে শ্রমজীবী পরিবারের জন্য খাদ্য ও বাসস্থানের খরচ কমানো। নিত্যপণ্যের মাত্রাতিরিক্ত দাম নির্ধারণের প্রবণতা বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। প্রথমবার বাড়ি কেনায় সহায়তা এবং আবাসন খাতে প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সবকিছু মানুষের ক্রয় সামর্থ্যরে মধ্যে আনবেন। তার ভাষায়, মেইক আমেরিকা অ্যাফোর্ডেবল অ্যাগেইন। ট্রাম্প সুদহার কমানোর অঙ্গীকারও করেছেন। যদিও সুদহার নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই।
করের বিষয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বছরে চার লাখ ডলারের বেশি আয় করা আমেরিকানদের ওপর কর বাড়াতে চান কমলা হ্যারিস। অবশ্য কোনো পরিবারের করের বোঝা লাঘব করতে, সন্তানের বিপরীতে কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলেছেন তিনি। সম্পদ আহরণের ওপর বাইডেনের আরোপিত করের সঙ্গেও হ্যারিসের দ্বিমত রয়েছে।
ট্রাম্পও বিপুল পরিমাণ করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। একে তার ২০১৭ সালের করহ্রাসের নীতিরই বর্ধিত রূপ বলা চলে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনীদেরই সহায়তা করেছে। তিনি বলেছেন, কর কমালে আয় যতটুকু কমবে তা তিনি উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং আমদানি শুল্ক দিয়ে পুষিয়ে নিতে পারবেন। বিশ্লেষকরা দুজনের পরিকল্পনায়ই অর্থনৈতিক ঘাটতি বাড়াবে। তবে ট্রাম্পের বেলায় সেটা বেশি করে বাড়বে।
গর্ভপাতের অধিকারকে তার প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছেন কমলা হ্যারিস। তিনি সারা দেশের জন্য অভিন্ন প্রজনন অধিকার সুরক্ষা আইনের পক্ষে কথা বলছেন।
গর্ভপাতের ইস্যুতে নিজের বক্তব্যে স্থির থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। সুপ্রিম কোর্টে তার সময়ে নিয়োগ দেওয়া তিন বিচারকের হাতেই গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার বাতিল হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের সংকট সামাল দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কমলা হ্যারিসকে। তিনি কোটি কোটি ডলার অনুদান সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন, যার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ করে উত্তর অংশ অভিমুখে স্রোত ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩-এর শেষ নাগাদ মেক্সিকো থেকে রেকর্ডসংখ্যক লোক প্রবেশ করেছে বটে কিন্তু পরবর্তীকালে সংখ্যাটা কমে আসতে থাকে। হ্যারিস তার প্রচারণায় নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা যেমন বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় আইনজীবী হিসেবে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের কথাও মনে করিয়ে দিয়ে থাকেন।
ট্রাম্প এ দফায় সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে চান। সেই সঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে আরও বেশি করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের অঙ্গীকার করছেন তিনি। কিন্তু হ্যারিসের উদ্যোগে কঠোর অভিবাসন নীতি সংবলিত কোনো ক্রস পার্টি আইন (সর্বদলীয়) প্রণয়নের অংশ না হতে রিপাবলিকানদের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। হ্যারিস বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি এ বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবৈধ অভিবাসী প্রত্যর্পণ ঘটানোর অঙ্গীকার করেছেন ট্রাম্প। গণহারে অবৈধ অধিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাবেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন, এ উদ্যোগ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। আবার নেটিভ আমেরিকানদের কাছে এজন্যই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন ট্রাম্প।
এদিকে ইউক্রেনকে যতদিন প্রয়োজন ততদিন সমর্থন দিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন কমলা হ্যারিস। তিনি নির্বাচিত হলে, চীন নয়, ২১ শতকের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রই জিতবে, দিচ্ছেন এমন প্রতিশ্রুতিও। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে সোচ্চার। গাজা যুদ্ধ বন্ধে আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান একলা চলো অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতার পক্ষে। বিশে^র অন্যান্য স্থানের সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে রাখতে চান তিনি। তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি টানবেন। ডেমোক্র্যাটদের দাবি, এ পদক্ষেপ ভøাদিমির পুতিনকে আরও শক্তিশালী করবে। ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন কীভাবে, এ নিয়ে তাকে বিশেষ কিছু বলতে শোনা যায় না।
এদিকে ট্রাম্পের আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনার সমালোচনা করছেন কমলা হ্যারিস। তার মতে, এতে প্রকারান্তরে শ্রমজীবী মানুষের ওপর নতুন করে কর আরোপ করা হবে, যার ফলে একটি পরিবারকে বছরে প্রায় চার হাজার ডলার বেশি খরচ করতে হবে। আমদানির ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে আরও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চান কমলা।
ইতিমধ্যেই বাইডেন প্রশাসন চীন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো কিছু পণ্য আনার ক্ষেত্রে যে শুল্ক চালু করেছে, সেটিই অনুসরণ করবেন কমলা হ্যারিসও। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের অঙ্গীকারের কেন্দ্রে রয়েছে শুল্ক ব্যবস্থা। বেশিরভাগ বৈদেশিক পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ থেকে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের অভিপ্রায় তার। আর চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে সেই হার হবে আরও বেশি। কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্য উৎপাদনের জন্য উৎসাহিত করতে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ট্রাম্প।
জো বাইডেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মূল্যস্ফীতি কমানোর আইন পাশে ভূমিকা রেখেছিলেন হ্যারিস। এই আইন পাসের ফলে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ও বিদ্যুৎচালিত যানবাহন খাতে বিপুল পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা মিলবে। কিন্তু ‘ফ্র্যাকিং’ পদ্ধতিতে খননের মাধ্যমে তেল-গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্রে বিরোধিতা থেকে সরে এসেছেন কমলা। পরিবেশবাদীরা এই পদ্ধতির বিপক্ষে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে থাকাকালে পরিবেশ সুরক্ষার বহু উদ্যোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। প্রত্যাহার করে নেওয়া তেমন উদ্যোগেরই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যানবাহন থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ সীমিত রাখা। এবারের প্রচারণায় তিনি জ্বালানির জন্য উত্তর মেরুতে খনন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে কথা বলছেন।
বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে মারিজুয়ানা বা গাঁজার ব্যবহারকে বৈধতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কমলা হ্যারিস। তার মতে, বহু মানুষকে শুধু সঙ্গে গাঁজা রাখার কারণে কারাগারে যেতে হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ এবং লাতিন নাগরিকদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংখ্যাগত অসামঞ্জস্যের দিকেও ইঙ্গিত করেন তিনি।
ট্রাম্পও তার দৃষ্টিভঙ্গি নমনীয় করেছেন এ বিষয়ে। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের উদ্দেশ্যে অল্প পরিমাণ মারিজুয়ানা বহনের জন্য অপ্রয়োজনে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে পাঠানো বন্ধ করার এখনই সময়। হ্যারিস প্রসিকিউটর হিসেবে তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে ট্রাম্পের অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প মাদক কার্টেল ও দলগত সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা যেসব শহর পরিচালনা করছে সেগুলো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভরে গেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করলে তিনি ‘উগ্র বাম ও শত্রুদের’ বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী বা ন্যাশনাল গার্ড ব্যবহারের কথা বলেছেন।
দুই প্রার্থী তাদের মতো করে যে প্রতিশ্রুতিই দেন না কেন, এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা ও ট্রাম্পের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এবারও জয়-পরাজয় নির্ধারণে দোদুল্যমান রাজ্যগুলোই ভূমিকা রাখবে।