যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আজ। এই নির্বাচনেই ঠিক হতে চলেছে— পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবার।
দেশটিতে ইতিমধ্যে আগাম ভোট দিয়েছেন ৮ কোটি ভোটার। তবে ভোটের ফলাফল নির্ধারন হয় 'ইলেক্টোরাল কলেজ' পদ্ধতির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে যে প্রার্থী বেশি ভোট পেয়ে থাকেন তাকেই যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়।
'ইলেক্টোরাল কলেজ' আসলে কী?
'ইলেক্টোরাল কলেজ' হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ব্যবহৃত রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় আইনের একটি জটিল ব্যবস্থা, যা দেশটির সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত। ‘কলেজ’ শব্দটির অর্থ এখানে সেই ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যারা একটি অঙ্গরাজ্যের ভোট দেওয়ার অধিকারী।
'ইলেক্টোরাল কলেজ' হচ্ছে কর্মকর্তাদের একটি প্যানেল, যাদের 'ইলেকটরস' বলা হয়। এরা এক কথায় নির্বাচক মণ্ডলী। প্রতি চার বছর পর পর এটি গঠন করা হয় এবং এরাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট বাছাই করেন।
কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে প্রতিটি স্টেট বা অঙ্গরাজ্যে ইলেকটরসের সংখ্যা নির্ধারিত হয়: যা নির্ধারিত হয় স্টেটে সেনেটরের সংখ্যা (প্রত্যেক স্টেটে দুইজন) এবং প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিনিধির (যা জনসংখ্যার অনুপাতে) যোগফল মিলে।
ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি অনুযায়ী যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বেশি, সেসব রাজ্যে ইলেকটোরাল ভোটও বেশি। সবচেয়ে বড় ছয়টি স্টেট হলো ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫), টেক্সাস (৪০), নিউইয়র্ক (২৯), ফ্লোরিডা (২৯), ইলিনয় (২০) এবং পেনসিলভেনিয়া (২০)।
এই পদ্ধতির ফলে ছোট রাজ্যগুলোকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়, যার অর্থ হচ্ছে একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে অবশ্যই পুরো দেশজুড়ে ভোট পেতে হবে। সাধারণত অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের হাতে থাকা ইলেক্টোরাল ভোট সেই প্রার্থীকেই দেয়, যিনি ওই অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সরাসরি ভোটে জয়ী হয়েছেন।
ধরা যাক, টেক্সাসে একজন প্রার্থী ভোটারদের সরাসরি ভোটের ৫০.১% পেয়েছেন, তাকে ওই অঙ্গরাজ্যের হাতে থাকা ৪০টি ইলেক্টোরাল ভোটের সবগুলিই সেই প্রার্থী পেয়ে যাবেন। একটি অঙ্গরাজ্যে জয়ের ব্যবধান যদি বিরাট হয়ও, তাহলেও বিজয়ীপ্রার্থী ওই নির্দিষ্ট সংখ্যক ইলেক্টোরাল ভোটই পাবেন।
ফলে সবগুলো অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে একজন প্রার্থী ভোটারদের ভোট বেশি পাওয়ার পরেও ইলেকটোরাল ভোট কম পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যেতে পারেন।
ইলেক্টোরাল ভোটে ‘টাই’ হলে কী হবে?
ইলেক্টোরাল ভোটে যদি কোনো প্রার্থী এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, সেক্ষেত্রে মার্কিন আইন সভার নিম্ন-কক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস’ ভোট দিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা শীর্ষ তিন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাছাই করে থাকেন। বাকি দুইজন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেছে নেয় দেশটির সিনেট।
যদিও এরকম ঘটনা মার্কিন ইতিহাসে একবারই ঘটেছে। ১৮২৪ সালে এভাবেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন কুইনসি অ্যাডামস।
তবে বর্তমানে অবশ্য রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দু’টির যে আধিপত্য রয়েছে, তাতে ওইরকম ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর কী হয়?
নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠন করা হয় না। বিজয়ীদেরকে কিছুদিন সময় দেওয়া হয়, যাকে ‘রূপান্তরকালীন সময়’ বলা হয়ে থাকে। ওই সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাছাই করেন এবং পরিকল্পনা তৈরি করে থাকেন।
এরপর নতুন বছরের শুরুতে, অর্থ্যাৎ জানুয়ারিতে নতুন বা পুননির্বাচিত প্রেসিডেন্টের অভিষেক ও শপথ অনুষ্ঠান হয়। রীতি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনে নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৩৩ সালে হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২০তম সংশোধনীতে নির্ধারণ করে দেয়া হয় যে, প্রেসিডেন্টের ওই অভিষেক অনুষ্ঠান হবে ২০শে জানুয়ারি।
রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনের সামনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রেসিডেন্টে অভিষেক হয়। এ অনুষ্ঠানের পরই নতুন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে যান তার চার বছরব্যাপী মেয়াদ শুরু করার জন্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে ১৯৫১ সালের আগ পর্যন্ত অবশ্য দেশটিতে দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনের মাধ্যমে একই ব্যক্তির দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সূত্র: বিবিসি।