নগরপিতা নয় সেবক হয়ে কাজ করতে চাই: চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সপ্তম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর আগে দুপুরে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমি নগরপিতা নয় নগরসেবক হিসেবে কাজ করে যেতে চাই।

ঢাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মিলনায়তনে গত রবিবার চসিকের মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শাহাদাত হোসেন। এরপর মঙ্গলবার চট্টগ্রাম আসেন তিনি। সোনার বাংলা ট্রেন যোগে বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছলে সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল সংবর্ধনা দেয়া হয়। 

সংবর্ধনার জবাবে নেতাকর্মী ও নগরবাসীর উদ্দেশ্যে শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি ৭০ লাখ মানুষের নগরপিতা হিসেবে নয়, নগরসেবক হিসেবে আপনাদের কাছে থাকতে চাই। এই ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে সকল ধর্মের, বর্ণের, ভাষার নাগরিক এই চট্টগ্রাম শহরে আছে। আমি তাদের পাশে থেকে সেবক হিসেবে কাজ করে যেতে চাই। এ জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন শাহাদাত।

নগরবাসীকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এই শহরটা শুধু আমার একার শহর নয়। এই শহর আমাদের সবার। আসুন, আমরা সবাই মিলে একযোগে একটি সুন্দর শহর গড়ে তুলি। এ শহর হবে ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি ও হেলদি সিটি।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে রাজনৈতিক হয়রানি, নির্যাতন-নিপীড়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের বলেন, গত ১৮টি বছর আপনারা ঘরে থাকতে পারেননি। আপনাদের পরিবারের খোঁজ নেওয়ার মানুষ ছিল না। আপনাদের পরিবারের বাজার করার টাকা ছিল না। অর্ধহারে-অনাহারে দিন কাটিয়েছেন। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের এক লাখ মামলায় ৬০ লাখ আসামি। কিন্তু তারপরও আপনারা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। আপনাদের এই ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে মেয়র হজরত শাহ আমানত (র.) ও বদর আউলিয়া (র.) মাজার জিয়ারত করতে যান। পরে লালদীঘি পাড়স্থ চসিক লাইব্রেরী ভবনের সম্মেলন কক্ষে চসিকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মেয়র শাহাদাত। 

পরে সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে শাহাদাত হোসেন বলেন, সেবা সংস্থাগুলোর কাজের সমন্বয়ের জন্য সিটি গভর্মেন্ট বা নগর সরকার একান্ত প্রয়োজন। নগর সরকার হলে সমস্ত সেবা সংস্থাগুলো সিটি কর্পোরেশনের অধীনে একই ছাতার নিচে থেকে কাজ করবে। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের অধীনে যদি সমস্ত সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো কাজ করে তাহলে পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হবে। 

হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাবধান হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আমারও প্রতিষ্ঠান আছে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে কী হয় তা আমি জানি। তিনি বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যে হোল্ডিং ট্যাক্স আগে পেতাম সেটা সঠিকভাবে পেলে সিটি কর্পোরেশনের বেতন দেয়ার বিষয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।

আমি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি, হেলদি সিটি উপহার দিতে চাই। এটি আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আমি আজ যখন দায়িত্ব নিচ্ছি তখন প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা ঘাটতির বোঝা নিয়েই দায়িত্ব নিচ্ছি। আমি অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। আমি আশা করবো আপনারা সততার সাথে, দুর্নীতিমুক্তভাবে, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আমার সাথে কাজ করবেন। আপনাদের চ্যালেঞ্জ আমি নিলাম। আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে একটি স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমি গড়ে তুলবো। 

মেয়র শাহাদত বলেন, আমি এসি রুমে বসে থাকার লোক নই। আমি অতি দ্রুত ৪১টি ওয়ার্ডে প্রোগ্রাম দেব। এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ ডেঙ্গু। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেব। মশক নিধনের জন্য যে স্প্রে ব্যবহার করা হয় সেটার মান আমি আগে পরীক্ষা করে দেখবো। দেখতে হবে সেই স্প্রে মারার পর মশা লাফ দিয়ে উঠে যায় কিনা। আমি সশরীরে প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাবো। আমি জেনেছি এখানে ২ হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছে। আমি দেখতে চাই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তারা কাজ করে কিনা। সঠিকভাবে কাজ না করলে তাদের চাকরি নাও থাকতে পারে। 

তিনি বলেন, আমি রাজনীতিবিদ, আমার সে রাজনীতি হবে সিটি কর্পোরেশনের বাইরে। আমি আমার নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই। আপনারা আমাকে কাজের সময় ডিস্টার্ব করবেন না। আমি আপনাদের সাথে রাজনীতি করবো বিকেল ৫টার পরে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো ধরনের রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা নিয়ে আমার এখানে আসবেন না। 

সন্ধ্যা ছয়টায় শাহাদাত হোসেন টাইগারপাসস্থ সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাত শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এ সময় চসিকের কর্মকর্তা কর্মচারীরা নতুন মেয়রকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা মেয়রের দায়িত্বগ্রণকালে উপস্থিত ছিলেন।