ইন্ডাস্ট্রিতে কোরিওগ্রাফি নিয়ে এখনো চিন্তাভাবনা করা হয় না: হৃদি শেখ 

একাধারে নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, চিত্রশিল্পী হৃদি শেখ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাশিয়ান নাগরিক। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মস্কোতে। ২০১৬ সালে ‘সেরা নাচিয়ে’ প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০১৭ সালে ভারতের ‘ডান্স প্লাস সিজন থ্রি’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। এসবের পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি তার মা। মায়ের উৎসাহেই এগুলো শিখেছেন এবং তার কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পান।

গত কয়েক দিন ধরে তার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর নোয়েল রবিনসন, যিনি মূলত জার্মানির বাসিন্দা। বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে ভিডিও তৈরি করেন তিনি। সেসব ভিডিওতে গানের তালে নাচতে দেখা যায় তাকে। গেল সপ্তাহে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছিলেন নোয়েল। এ সময় ঢাকার রাস্তায় তার সঙ্গে নাচতে দেখা গেছে হৃদি শেখকেও।

এ প্রসঙ্গে হৃদি শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশি কোনো শিল্পী বাংলাদেশে এলে যেকোনোভাবেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়। এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে এসেছিল, এখন চলে গেছে। পুরান ঢাকাতে একটা ফানি কনটেন্ট দেখছিলাম আমি এবং সেখানে কমেন্ট করেছিলাম “বাংলাদেশে তোমাকে স্বাগতম।” তারপর আমি তাকে ইনস্টাগ্রামে মেসেজ দিলাম স্বাগত জানিয়ে। এরপর রিপ্লাই দিলো ‘হ্যাঁ. হ্যাঁ আমি তো তোমার কথা শুনেছি।’

Ridy Sheikh 4

এরপর জানতে পারলাম যে, ও যখন প্লেনে করে বাংলাদেশে আসছিল তখন ওর পাশের এক যাত্রী নোয়েলকে আমার ব্যাপারে বলে ‘আমি বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান ড্যান্সার।’ এরপর সে জানাল যে, সে আমার কাজ আগে দেখেছে। তারপর তো দেখা হলো, কথা বললাম এবং একসঙ্গে কিছু কনটেন্ট বানানো হয়েছে।

নিজের সাম্প্রতিক ব্যস্ততা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘বন্ধু রে’, ‘বেনি খুলে’, ‘ঝুমকা’ খ্যাত এই কোরিওগ্রাফার বলেন, ‘এখন নাচ নিয়েই ব্যস্ত। আমার নিজের একটা ডান্স স্টুডিও আছে, যেখানে নাচ শেখাই। সেখানে ৬০ জন শিক্ষার্থী আছে, সঙ্গে প্রশিক্ষণ টিমও আছে। আমার সব থেকে ভালো লাগে যখন দেখি ইন্টারন্যাশনাল শিল্পীরা আমার সঙ্গে কাজ করতে চায়। কাজ হচ্ছেও। দেড় বছর ধরে এটা নিয়েই ব্যস্ত আছি। নিয়মিত কনটেন্ট বানাই। দেশের বাইরেও প্রজেক্ট করা হচ্ছে। এ বছর মস্কোতে বেশ কয়েকটা প্রজেক্ট করেছি। গত জানুয়ারিতে শিল্পী কনা-মুজার ‘ডানে বামে’ মিউজিক ভিডিওর নৃত্য পরিচালনা করছিলাম। এ মাসে বেশ কিছুদিন ধরে নিয়মিত স্টেজ পারফরমেন্স করছি।’

Ridy Sheikh 5

‘নবাব এলএলবি’ সিনেমাতে ‘চিল করব’ শিরোনামের আইটেম গানে পারফর্ম করতে দেখা গিয়েছিল। এরপর আপনাকে আর সিনেমাতে পাওয়া যায়নি কেন, এমন প্রশ্নে হৃদি শেখের উত্তর, ‘সত্যি কথা বলতে গত সপ্তাহে একটা সিনেমাতে অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিল। আমি স্ক্রিপ্ট পড়ে, সবকিছু বিবেচনা করে না বলে দিয়েছি।’

কোরিওগ্রাফি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সিনেমার পরিচালকরা নাচের চেয়ে অন্য জিনিসগুলোর প্রতি বেশি নজর দেন। যেমন সিনেমার প্রমোশন, কে অভিনয় করছে এসব। নাচ-গানের প্রতি এখনো সেই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আসেনি। আমার মনে হয় না ইন্ডাস্ট্রিতে কোরিওগ্রাফি নিয়ে এখনো সেভাবে চিন্তাভাবনা করা হয়। বড় বাজেটের সিনেমাগুলোয় কোরিওগ্রাফি করার জন্য ভারত থেকে কোরিওগ্রাফার নিয়ে আসা হয়। সিনেমাসংশ্লিষ্টরা এখনো দেশের কোরিওগ্রাফারদের বিশ্বাস করতে পারে না। বাইরে থেকে যে ভিন্ন কিছু নিয়ে আসে তেমনও না। তাদেরকে যে বাজেট দেওয়া হয় একই বাজেট দেশিও কোরিওগ্রাফারদেরকে দিলে কাজ ভালো স্ট্যান্ডার্ডের হবে। আমি ছাড়া দেশে আরও ক্রিয়েটিভ কোরিওগ্রাফার আছে যারা বাজেটের কারণে ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাস কাজ উপহার দিতে পারছে না। সঠিক মূল্যায়ন আর বাজেট দিলে আমি এবং ইন্ডাস্ট্রির কোরিওগ্রাফাররা ভালো কাজ উপহার দিতে পারব’

Ridy Sheikh 3

চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সিন্ডিকেট আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই জায়গাটাতে একটা সিন্ডিকেট আছে। আমি যে স্ট্যান্ডার্ডের কোরিওগ্রাফি দিতে চাই সেরকম কাজের এবং মানের জন্য কেউ কোরিওগ্রাফার, কস্টিউম কিংবা টিমের পেছনে বিনিয়োগ করতে চায় না। সবাই চায়, এক টাকাতে সেরা কাজটা পেতে, কিন্তু আমি এক টাকাতে কীভাবে ওয়ার্ল্ড ক্লাস স্ট্যান্ডার্ড দেব? এমন না যে, প্রস্তাব আসে না, আসে। কিন্তু দেখা যায় যে, একটা মিউজিক ভিডিওর জন্য যে বাজেট থাকে তার চেয়েও অনেক কম বাজেট থাকে সিনেমার গানের জন্য। তাহলে আমি কীভাবে কোয়ালিটি এনশিওর করব! এটা একটা অনেক বড় ইস্যু, আমার কাছে মনে হয়। 

Ridy Sheikh 2

পুরনো যারা আছেন তারা হয়তো অনেক কম পারিশ্রমিকে অনেক কিছু করে দেন, কিংবা পরিচালকরা হয়তো ডিফারেন্ট কিংবা নতুন কিছু ট্রাই করতে চান না। এখানে সমস্যাটা হলো সিস্টেমে। সিস্টেম পরিবর্তন না হলে কিছুই ঠিক হবে না। হয়তো সংশ্লিষ্টরা বিষয়টা বুঝছে না, নয়তো দেখছে না। আমি তো সেই সিস্টেমের সঙ্গে মারামারি করতে যাব না, যেখানে আমি নিজে একটা কমফোর্টেবল অবস্থানে আছি। আমি চাই সংশ্লিষ্টরা বুঝুক, এই কোরিওগ্রাফিটারও ভ্যালু আছে, এখানে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। আমি অপেক্ষায় আছি। আমাকে যে রকম সাপোর্ট দেবে, আমিও ঠিক তেমন স্ট্যান্ডার্ডের কাজ উপহার দেব ইন্ডাস্ট্রিকে।’ 

সুযোগ পেলে অভিনয়ও করতে চান হৃদি। তবে তা প্রধান চরিত্রে। বললেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আমার সামর্থ্য আছে। আমি মনে করি কথা বলার থেকেও কাজ করা উত্তম। কাজ ভালো হলে অবশ্যই কাজের অভাব হবে না।’