ট্রাম্পের জয়, লিবারেলিজমের পরাজয়, অস্থির দুনিয়া আর টালমাটাল হয়ে উঠা

ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন রাজনীতির বিতর্ক পুরুষ। কট্টর বর্ণবাদী, অভিবাসনবিরোধী, নারীবিদ্বেষী, মার্কিন তথাকথিত লিবারেল মূল্যবোধের চরম বিপরীতে দাঁড়ানোর বহু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ৭৮ বছর বয়স্ক এই রিপাবলিকান নেতা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও নির্বাচনপূর্ব জরিপগুলো বলছিলো লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি এবং কেউ কেউ ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেট নেতা কমলা হ্যারিসকে একটু হলেও এগিয়ে রেখেছিলেন।

কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বেশ ভালো ব্যবধানেই জিতলেন। দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে একচেটিয়া জয় তুলে নিয়ে, মিডিয়ার নানা প্রচারের বিপরীতে টানা তিনটা নির্বাচনে দুইটিতে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হলেন। কাকতালীয়ভাবে দুইবারই তিনি হারালেন দুইজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বীকে। যুক্তরাষ্ট্রের নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়ার অপেক্ষা আরও বাড়লো। যুক্তরাষ্ট্র ও দুনিয়ায় আশঙ্কা ও পূর্বাভাস শুরু হয়েছে সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ট্রাম্প সামনের চার বছর কী প্রভাব ফেলবেন। বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ ইত্যাদি ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সামনের দিনগুলোতে কী প্রভাব ফেলে তা দেখার অপেক্ষায়।

তবে, শুরুতেই অল্প করে বলা যাক ট্রাম্পের বিজয় এবং ডেমোক্রেট তথা লিবারেলদের ভরাডুবির কারণ:

লিবারেল নীতি হারিয়ে ফেলা

ফরাসি নির্বাচনের পর মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড উলফ মন্তব্য করেছিলেন, পশ্চিমা দুনিয়ায় লিবারেল রাজনীতির পতনের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে। মুখে প্রগতিশীলতার কথা বললেও লিবারেলরা জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। ফিলিস্তিনের গণহত্যা প্রতিরোধে তাদের কার্যকরী ভূমিকা ছিল না। শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ দেখতে ব্যর্থ হয়েছে বেশিরভাগ লিবারেলরাই। উপরন্তু, আর্থিক সংকটে পশ্চিমারা আরও বেশী ডানপন্থী লোকরঞ্জনবাদের দিকে ঝুঁকে গেছে। নিজেদের অবস্থার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করছে। ফিলিস্তিনের মতো সিরিয়াসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা ইত্যাদি বিষয় বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের গণতান্ত্রিক বিশ্বের মোড়ল ভাবলেও এখন তাদের শক্তি ম্রিয়মাণ। ইউক্রেন যুদ্ধ এর বড় প্রমাণ। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যসহ বৈশ্বিক ক্ষমতায় অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে। মার্কিন ধমকে এখন ভারত বা ব্রাজিলের মতো শক্তিরা সবসময় ভয় পায় না। তথাপি লিবারেলরা বারবার নিজেদের অধিক শক্তিধর দেখাতে চেয়েছে। প্রকৃত সমস্যা এড়িয়ে গিয়ে কেবল লিবারেল নীতির বাগাড়ম্বর করেছে। মানুষ এগুলো ভালোভাবে নেয়নি।

নীতিকথা নয় কাজ জরুরি

ডেমোক্রেটদের নীতি দরিদ্রবান্ধব। তারা নানারকম কল্যাণমূলক নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ইত্যাদি বিষয়ে জোর দেয়। নারী, অভিবাসী, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীদের বাড়তি যত্নের কথা বলে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের নীতি ব্যবসা বান্ধব। তারা ধনীদের কর কর্তন করে তাদের উন্নয়নে বিশ্বাসী। ধনীদের উন্নতি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এই নীতি অনুসরণ করে তারা। তবে ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব এসব কিছুকে থোরাই কেয়ার করেন। তিনি মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন বলে হুংকার দেন। ক্ষমতায় এসেই ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন, দেশ থেকে অভিবাসীদের তাড়াবেন, মেক্সিকোর সাথে দেয়াল তুলবেন ইত্যাদি কথা স্পষ্ট করে বলেন। লিবারেলদের শিবির তাদের নেতাদের কথায় আস্থা রাখতে না পারলেও ট্রাম্পপন্থীরা এই কট্টর নেতার পেছনে এক হয়েছিলো।

ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব

বর্তমান দুনিয়া অস্থিরতা আর শোডাউনের। একদা রেসলিং এর রিং মাতানো, জাত ব্যবসায়ী ট্রাম্প জানেন যে কোনো প্রচারই এই যুগে কার্যকরী। তিনি সবসময় স্পটলাইটে থাকেন, তা সে উগ্র বক্তব্য দিয়ে হোক কিংবা আপত্তিকর কাজ হোক। গুলি খেয়েও তিনি যখন ফাইট! ফাইট! বলেন মার্কিন জনগণের মানসপটে তিনি লড়াকু নায়কের ছবি এঁকে ফেলেন। অস্থিরতার এই যুগে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত স্ট্যাটাস হারানোর শঙ্কায়, তরুণরা হতাশ। ট্রাম্প এসবকে উসকে দেন। কল্পিত সোনালী অতীতের গল্প দেন। এই গল্প বেশ কার্যকর হয়। এর বিপরীতে ডেমোক্রেটদের গল্পগুলো ম্যাড়মেড়ে শোনায়। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম যুগের মূলনীতি ধরে ফেলে নিজেকে সর্বদা কালচারাল ওয়ারের যোদ্ধা হিসেবে হাজির করেন। ওরা বনাম আমরার লড়াই চালিয়ে গিয়ে পরিসংখ্যানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখান। লিবারেলদের যা কিছু প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম হোক কিংবা আদালত, তার পক্ষে না গেলেই তিনি ষড়যন্ত্র,মিথ্যা ইত্যাদি বলে কাঁচকলা দেখান। ট্রাম্প সত্যমিথ্যার ধার ধারেন না। তিনি আধুনিক যুগের ম্যাকিয়াভেলীর প্রিন্স। ভয় দেখানো, কল্পিত ছায়ার সঙ্গে লড়াই, নিজেদের বিপন্ন দেখিয়ে নিজেকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখাতে পারেন। তাই তিনি বিপুল জনপ্রিয়।

ট্রাম্পের চারবছরে কি কি পরিবর্তন আসতে পারে?

বৈদেশিক নীতিতে অস্থিরতা

ট্রাম্প নির্বাচিত হবার পরপরেই বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থী ও লোকরঞ্জনবাদী নেতারা তাকে অভিনন্দিত করতে শুরু করেছেন। যদিও রাশিয়া এখনো অভিনন্দন জানায়নি, তবে পুতিনের সাথে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। তিনি ন্যাটোবিরোধী অবস্থান নেবেন বলে ধারনা করা হচ্ছে। তবে, ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পারলেও চীনের সঙ্গে সংঘাত বহুগুণে বাড়বে। আগেরবার পূর্ণ উদ্যমে বাণিজ্য যুদ্ধ করলেও এবার তা পুরোপুরি যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। তাইওয়ান নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে বিবাদ বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। তাইওয়ানের অন্যতম উপাদান মাইক্রোচিপ, যা কম্পিউটার ও মোবাইল শিল্পে অত্যাবশ্যক, তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড়সড় যুদ্ধ হতে পারে।

এছাড়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভিন্ন এলাকা, আফ্রিকা, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দুদেশের প্রভাব নিয়ে প্রক্সি যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে। যদিও বাইডেনের ফিলিস্তিনি নীতির কারণে মুসলিমরা ক্ষুব্ধ, কিন্তু ট্রাম্পের আমলে ইসরেল আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভারতের নরেন্দ্র মোদীকে ‘বন্ধু’’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

অবশ্য, কেউ কেউ আশা প্রকাশ করছেন যে, ট্রাম্প যেহেতু নিজের দেশের সমস্যা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন, ডেমোক্রেটদের মতো সারা দুনিয়ায় মার্কিন সেনা বহাল নাও রাখতে পারেন। কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে অস্থিরতা বাড়লেও দুনিয়াজুড়ে অস্থিরতা কমবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াইয়ে বড়সড় ধাক্কা

ট্রাম্প জলবায়ুর সমস্যাকে মোটাদাগে ‘হোক্স’ বা ভুয়া ভাবেন। তিনি আরও বেশি খননের পক্ষে। এর আগের আমলেও জলবায়ু তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমে গিয়েছিলো। ট্রাম্পের এই আমলে সেইরকমটাই আশংকা করা হচ্ছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াই আরও দুর্বল হবে। ক্লাইমেট মাইগ্রেন্টদের অবস্থা আরও শোচনীয় হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য টিকে থাকা কঠিন হবে।

অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান নীতি হচ্ছে কট্টর অভিবাসন বিরোধিতা। তিনি ২ কোটির উপর অভিবাসীদের ‘ফেরত পাঠানোর’ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তার আমলে অভিবাসনবিরোধী আইন কঠোরতম হবে বলেই শঙ্কা।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে

ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে শত্রু জ্ঞান করেন। নিজের বিরুদ্ধে গেলেই ‘ফেইক নিউজ’ এবং সংবাদমাধ্যমকে ‘গণমানুষের শত্রু’ আখ্যা দেন। আরও বেশি ক্ষমতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়া ট্রাম্প এবার সে নীতি থেকে সরে আসবেন বলে মনে হয় না। 

গর্ভপাতের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান

গর্ভপাত মার্কিন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। বিশেষত প্রান্তিক নারীদের গর্ভপাতের অধিকার জীবন রক্ষাকারী বলে প্রতীয়মান হয়েছে বহু গবেষণায়। কিন্তু ট্রাম্প এর কট্টর বিরোধী। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ম্যানিফেস্টো ছিল প্রজেক্ট ২০২৫ যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে ১৮৭৩ সালের কোমস্টোক অ্যাক্ট ব্যাবহার করা হবে যাতে গর্ভপাতের পিলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হবে। কার্যত সারাদেশেই গর্ভপাত নিষিদ্ধ হবে। এছাড়াও এলজিবিটিকিউদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নেবেন বলে ধারনা করা যায়।

বন্দুকের নিরাপত্তা আইন শিথিল

যুক্তরাষ্ট্রের গান লবির সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক ভালো। এরফলে, বন্দুকের নিরাপত্তা আইন শিথিল হতে পারে এবং দেশটিতে ম্যাস শুটিং এর আশংকা বাড়বে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এইসব আশঙ্কা কদ্দুর সত্যি হবে বলা মুশকিল। তবে, সারা দুনিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রও কঠোরভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। ট্রাম্পের বিপরীতে মধ্যপন্থী লিবারেলদের বদলে বামপন্থী রাজনীতির উত্থান হবে এবং দুনিয়া জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরও বৃদ্ধি পাবে। ট্রাম্পের অস্থির ব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যে অস্থির দুনিয়াকে আরও বেশি টালমাটাল করে তুলবে।