দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজ হচ্ছে ‘দুর্নীতি’ দমন করা। অথচ ভূত তাড়ানোর বদলে দেখা যাচ্ছে, সর্ষের ভেতরেই ভূত। দুদকের এক সদ্য বিদায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আইন ভেঙে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার। জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকায় এই শক্তিশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতদিন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবী কোটায় রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে পাঁচ কাঠা আয়তনের দুটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদ্যবিদায়ী কমিশনার মো. জহুরুল হক ও তার স্ত্রী মাসুমা বেগম। প্লট বরাদ্দ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো পরিবারকে একাধিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও একটি রেখে অন্যটি রাজউকের কাছে সমর্পণ করতে হয়। অথবা রাজউকের দায়িত্ব একটি প্লটের বরাদ্দ ঠিক রেখে অন্যগুলো বাতিল করা। কিন্তু দুদক কমিশনার ও তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। উল্টো দুটি প্লটের আয়তনের সমান একটি ১০ কাঠার প্লট নিয়েছেন। দেশের দুর্নীতি দমন সংস্থার শীর্ষপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এমন দুর্নীতির কাছে অনেকটাই অসহায় ছিলেন রাজউকের কর্মকর্তারা। তারা উপায়ান্তর না পেয়ে, দুটি প্লটের আয়তনের সমান একটি প্লট দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ২০২১ সালে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় মো. জহুরুল হককে। তার মেয়াদ ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত থাকলেও সম্প্রতি (২৯ অক্টোবর) তিনিসহ চেয়ারম্যান ও বাকি একজন কমিশনারের সমন্বয়ে গড়া কমিশন পুরোটাই পদত্যাগ করে। এরপরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস ১৯৬৯ অনুযায়ী রাজউক প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, স্বামী ও স্ত্রীর নামে আলাদা প্লট বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। কোনো প্রকল্পে স্বামী ও স্ত্রীর নামে আলাদা প্লট বরাদ্দ পেলে একটি প্লট বহাল রেখে অন্যটি সমর্পণ করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী আলাদা প্লট বরাদ্দ নিলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহিরুল হক ও তার স্ত্রী মাসুমা বেগম আলাদা আলাদা প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। রাজউকের নথিপত্র অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবী ক্যাটাগরিতে দুদক কমিশনার মো. জহুরুল হককে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের ১০ নম্বর সেক্টরের ৪০২ নম্বর রোডের পাঁচ কাঠা আয়তনের ১০ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার নামে প্লট রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। এর আগে সরকারি চাকরিজীবী ক্যাটাগরিতে স্ত্রী মাসুমা বেগমকে একই প্রকল্পের ১০ নম্বর সেক্টরের ৪০২ নম্বর রোডের পাঁচ কাঠা আয়তনের ৯ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সেটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। তাদের প্লট ২০০৯ সালের বিধিমালা প্রণয়নের পর দেওয়া হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, তাদের একজনের প্লট সমর্পণ করার কথা, কিন্তু তারা তা করেননি। তাদের প্লট দেওয়ার সময় রাজউকের এমএসআই ডেটাবেস সিস্টেম ছিল না। এ কারণে রাজউক বিষয়টি বুঝতে পারেনি এবং প্লটের বরাদ্দও বাতিল করা হয়নি। তবে রাজউক কোনোভাবেই তাদের দুটি প্লট বহাল বা দুটি প্লট একত্র করার ক্ষমতা রাখে না। মো. জহুরুল হক তার প্লটের আয়তন বাড়াতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয়ের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক তাকে একটি ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু ভবন নির্মাণের জন্য তিনি রাজউকের অনুমোদনও পাননি। এ ছাড়া জহুরুল হকের বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তানের যাতায়াতের জন্য দুদকের একটি গাড়ি সাড়ে তিন বছর ব্যবহার করার অভিযোগ আছে।
যে প্রতিষ্ঠানের কাজই দুর্নীতি দমন করা, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হয়ে আইন ভঙ্গ করে নিজেই দুর্নীতি করা একটা নিকৃষ্ট উদাহরণ। খতিয়ে দেখা দরকার, আরও কোন কোন কর্মকর্তা কর্মচারী রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। যাদের কাজ অন্যায়কে দমন করা তাদের অন্যায় কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। সত্যি বলতে কি, যদি জবাবদিহি থাকত, কঠিন কোনো শাস্তির উদাহরণ থাকত তাহলে ক্ষমতার এমন অপব্যবহারের সুযোগ থাকত না। এ রকম দুর্নীতিবাজের মতো কত দুর্নীতিবাজ যে সরকারি চাকরির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে, তা জানলে হয়তো প্রশাসনের না হোক, জনগণের চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য।