স্থলভাগে বদলাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের ধরন

ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপ উপকূলে ওঠার পর নিম্নচাপে রূপ নিয়ে দ্রুত উত্তর বা উত্তর-পূর্ব দিক হয়ে দেশের সীমানা পার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে স্থল নিম্নচাপ দীর্ঘ সময় ধরে একই এলাকায় অবস্থান করে। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে ওঠার পর দ্রুত সরে যাচ্ছে না। উপকূলীয় এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি যেমন বেশি হচ্ছে, তেমনি বৃষ্টিপাতও বেশি ঘটাচ্ছে। গত আগস্টে দেশে যে ভয়াবহ বন্যা হলো, সে সময় দেশের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে স্থল নিম্নচাপ বিরাজ করেছিল। এর আগে গত বছর আঘাত করা ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’ ৩৪ ঘণ্টা, ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ ৩৯ ঘণ্টা, ২০২০ সালে ‘আম্পান’ ৩০ ঘণ্টা ছিল স্থল নিম্নচাপ আকারে। ঘূর্ণিঝড়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে কেন স্থল নিম্নচাপ আকারে বেশি সময় থাকছে? এ প্রশ্নের উত্তরে একাধিক আবহাওয়াবিদ বলেন, বিশ^ জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগর ও স্থলভাগের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপগুলো স্থলভাগে ওঠার পর আগে যেখানে ৭৫ শতাংশ শক্তি হারিয়ে ফেলত এখন হারাচ্ছে ৫০ শতাংশ। শক্তি কম হারানোর কারণে স্থলভাগে বৃষ্টিপাত যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি ক্ষয়ক্ষতিও বেশি করছে।

ঘূর্ণিঝড় নিয়ে ১৯৮১ সাল থেকে কাজ করা আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়কে স্টিয়ারিং করে এগিয়ে নিয়ে যায় মূলত ঊর্ধ্বাকাশের বাতাস। ভূপৃষ্ঠের ৩০ থেকে ৪০ হাজার ফুট ওপর কল এরিয়া (দুটি উল্টো ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে যদি কোনো ঘূর্ণিঝড় থাকে তখন তাকে কল এরিয়া বলা হয়) থাকলে তখন ঝড়টি স্থির থাকে। গত কয়েক বছর ধরে ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপ উপকূলে উঠে স্থল নিম্নচাপ হওয়ার পর কল এরিয়ায় পড়ে থাকে। তখন দীর্ঘ সময় একই এলাকায় অবস্থান করে। তবে এমন অবস্থা সাগরেও হয়ে থাকে, তখন আবহাওয়াবিদরা বলে থাকেন, ঘূর্ণিঝড়টি একই এলাকায় অবস্থান করছে।’

কেন একই এলাকায় অবস্থান করে এর কারণ জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূপৃষ্ঠের ওপরের তাপমাত্রা যেমন বেড়েছে, তেমনিভাবে সাগরের উপরি পৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বেড়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঊর্ধ্বাকাশে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়েছে। জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপটি পানির জোগান পায় এবং তখনই দীর্ঘ সময় বৃষ্টিপাত ঘটায়। আর এ কারণেই এখানকার ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপগুলো উপকূলে ওঠার পর দীর্ঘ সময় স্থল নিম্নচাপ আকারে থাকছে।’

আবুল কালাম মল্লিকের বক্তব্যের সঙ্গে আরও যুক্ত করেন আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগের ঘূর্ণিঝড়গুলোতে একটি চোখ থাকত। ফলে তা প্রচ- শক্তিশালী থাকত এবং উপকূলে ওঠার পর দ্রুত বেগে তা স্থলভাগ এলাকা পার হয়ে যেত। কিন্তু এখনকার ঘূর্ণিঝড়গুলোতে চোখ হওয়ার আগেই দুর্বল আকারে উপকূলে আঘাত করে। আর দুর্বল হওয়ায় তা দ্রুত অতিক্রম করতে পারে না এবং ওপর থেকে জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শ পায় বলে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত ঘটায়।’

নভেম্বর-ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের উর্বর সময় : বঙ্গোপসাগরে গ্রীষ্মের পর বর্ষার আগে (এপ্রিল-মে) ও বর্ষার পর শীতের আগে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৫৩৫টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। আর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে হয়েছে ২৭৫টি এবং এর মধ্যে শুধু নভেম্বরেই হয়েছে ১২৫টি ঘূর্ণিঝড়। শুধু ঘূর্ণিঝড়ই নয়, ১৮৯১ থেকে এ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৭০৮টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এসব নিম্নচাপের মধ্যে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে হয়েছে ১৮৭টি, এর মধ্যে অক্টোবরে হয়েছে ৫০টি, নভেম্বরে ১০৩টি ও ডিসেম্বরে ৩৪টি। নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘নভেম্বর মাসটি বঙ্গোপসাগরের ঘূূর্ণিঝড়ের উর্বর সময়। চলতি বছরও এ মাসে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে উত্তর বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টির অবস্থায় রয়েছে, তবে তা শ্রীলঙ্কার দিকে যেতে পারে। মাসের দ্বিতীয়ার্ধে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে।’

গত মাসে ‘দানা’ নামে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। এটি ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের মাঝ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করেছিল।