জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে মগবাজার ওয়্যারলেস কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মিজান ও তার স্ত্রী ছাড়া পরিবারের সবাই এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত। এর মধ্যে খবর এসেছে মায়ের জ্বর, ছোট বোনও ডেঙ্গু আক্রান্ত। আলাপকালে মিজানুর রহমান জানান, ডেঙ্গুতে প্রতিবছরই মানুষ মারা যাচ্ছে। যারা সুস্থ হচ্ছেন, তারাও আর্থিকভাবে প্রায় পঙ্গু। এরপরও সিটি করপোরেশন নির্বিকার। কোথায় মশা মারছে, কোথায় টাকা খরচ করছে তা সিটি করপোরেশনই ভালো বলতে পারবে।
শুধু এই মিজানের পরিবার বা জুরাইন-ই নয়, দেশ জুড়েই চলছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর দাপট। নিয়ন্ত্রক সংস্থার গাফিলতি আর খামখেয়ালিতে লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এ বছর গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজার ৩৯৩ জন। এ সংখ্যা দেশে এ যাবৎকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত বছর এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে অক্টোবরে ১৩৪ জনের। এরপর সেপ্টেম্বরে ৮০ জন, আগস্টে ২৭, জানুয়ারিতে ১৪, মে ও জুলাইয়ে ১২ জন করে, জুনে ৮, মার্চে ৫ ও ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন মারা গেছে। গত ১০ দিনে মারা গেছে ৫৮ জন।
প্রতিদিনই মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বাদ যাচ্ছে না শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ, পুরুষ ও নারী কেউ-ই। এ বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৫৯ জন। এরপর ঢাকা উত্তর সিটিতে ৬৪ জন।
এদিকে, ডেঙ্গুজ্বরের পিক সিজনে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতে ডেঙ্গুজ্বর প্রকট আকার ধারণ করে। এতে গত দুই মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে চলতি মাস থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো রোগীর তালিকা অনুযায়ী তাদের তথ্য ও ঠিকানা সংগ্রহ করে আবাসস্থল এবং চারপাশে বিশেষ লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থা দুটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তা ছাড়া আলাদাভাবে সিটি করপোরেশন এলাকার এবং ঢাকার বাইরে থেকে আসার রোগীর তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করছেন।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও নিবিড় তদারকির জন্য ডিএনসিসির কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত টিম নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করেছে। সারা বছর আমাদের কর্মীরা জনগণকে সচেতন করেছেন। ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ থেকে নাগরিকদের রক্ষাকল্পে জনসচেতনতা সৃষ্টি, মশার প্রজননস্থল বিনষ্টকরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং লার্ভা ও মশা নিধন ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, র্যালি এবং বাড়ি বাড়ি এডিস মশার প্রজননস্থল অনুসন্ধান করে ধ্বংস করার ফলে গত বছরের তুলনায় এই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক কম। আমরা এটি আরও নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যক্রম জোরদার করেছি।’ তিনি বলেন, ডিএনসিসি শুধু হাসপাতালের রোগীদের নিয়ে কাজ করছে না বরং কমিউনিটিতে যে রোগীগুলো আছে, তাদের খুঁজে বের করার জন্য সিটি করপোরেশনের ভলান্টিয়ার গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৬টি নগর মাতৃসদন ও মাতৃকেন্দ্রে বিনামূল্যে নাগরিকদের জন্য ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও সঠিক সময়ে রোগ নিরূপণ ও সঠিক চিকিৎসাপ্রাপ্তি রোগীদের জটিলতা এবং মৃত্যুহার বহুলাংশে কমাতে সাহায্য করছে।
ডিএসসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বলেন, মশার প্রজনন ক্ষেত্র ড্রেন, নর্দমা, ডোবা ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার রাখছি। এ ছাড়া সকালে মশার লার্ভা নিধনের জন্য লার্ভিসাইট, বিকেল বেলা উড়ন্ত মশা নিধনের জন্য নিয়মিত ফগিং করছি। তা ছাড়া আক্রান্ত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে দিন দিন কতটা ভয়ানক রূপ ধারণ করছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু। মশাবাহিত এ রোগ যে ভয়াবহতা ছড়াবে, তা আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু কর্ণপাত না করে গদি রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন জনপ্রতিনিধিরা। এর ফাঁকে সারা দেশে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা বিস্তার লাভ করেছে বলে মনে করেছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তারা বলছেন, একসময় মৌসুমি রোগ থাকলেও ডেঙ্গু এখন সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে। তাই আক্রান্ত মৃত্যু বাড়লেই নয়, বরং সারা বছর এডিস মশা নিধনের একটি কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। বছরের শুরুতে সতর্ক না হলে শেষ বেলায় মশা মেরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃষ্টি কমে গেছে, শীত আসছে। প্রাকৃতিকভাবেই এখন এডিস মশার প্রজনন কমতে থাকবে। তবে ডেঙ্গু একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। কিছু এলাকায় থেকে যাবে। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে, তার আশপাশে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করতে হবে। সম্ভাব্য প্রজননস্থলে লার্ভিসাইট এবং অ্যাডাল্টিসাইট প্রয়োগ করতে হবে। মশক নিধনের এই কার্যক্রম শুধু মৌসুমকেন্দ্রিক চালালে ফল পাওয়া যাবে না। সারা বছরই এই কাজ করতে হবে।
বাজেট বাড়ে, মশাও বাড়ে : ঢাকার মশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর নিধনের বাজেটও। কিন্তু মশা কমছে না। প্রতিবছর শতকোটি টাকা খরচ করেও নাগরিকদের মশার অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে পারছে না সিটি করপোরেশন। চলতি বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা মারতে ১৫২ কোটি ৮৫ লাখ বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে উত্তরের ১২১ কোটি ৮৪ লাখ আর দক্ষিণের ৩১ কোটি ১ লাখ টাকা।
গত এক যুগে এই খাতে বছরে খরচ হয়েছে অন্তত ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এসব টাকা মশা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি, কীটনাশক ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেই মশক নিধনে হাঁকডাক শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।
মশা মারতে ড্রোন ব্যবহার, জলাশয়ে হাঁস উন্মুক্তকরণ, গাছ ও মাছের ব্যবহারের মতো অভিনব কর্মসূচি নিয়ে বরাবরই আলোচনা সৃষ্টি করেছেন মেয়র-মন্ত্রীরা। কিন্তু এসব কর্মসূচিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি কেউ। এরপর নাগরিকদের সচেতনে রোডশো, পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের শরীরে অত্যাধুনিক বডি ক্যামেরার সংযোজন করেও আশানুরূপ ফল পাননি তারা। জনসচেতনতার নানা কর্মসূচির পাশাপাশি জেল-জরিমানার মুখোমুখিও করা হয়েছে নাগরিকদের। তবে কোনো কর্মসূচিতেই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।