নূর হোসেন, ডা. মিলন কিংবা আবু সাঈদ, মুগ্ধ

বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জন ও বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা কম নয়, বরং অনেক বেশি রক্তই ঝরেছে এই পোড়া দেশের জমিনে। সেইসব বলিদানে লক্ষ্য অর্জিত হোক বা না হোক পরবর্তী সময়ে শহীদদের অবমাননা এবং অস্বীকারের কাজটি চলে আসছে আচ্ছা মতো। আবার নাম বা মৃত্যুর তারিখকে উপলক্ষ করে অন্য লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টাও চলে হরদম। তা এবারের ১০ নভেম্বর আরও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ১৯৮৭ সালের এই দিনে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা সেøাগান নিয়ে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি রাজধানীর জিরো পয়েন্টে (বর্তমান শহীদ নূর হোসেন চত্বর) পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ২৪ বছরের অপ্রতিরোধ্য যুবক নূর হোসেন। আর সে ঘটনাই যেন ছিল গত শতকের শেষে স্বৈরাচারী সরকার পতন আন্দোলনের সবচেয়ে বড় স্ফুলিঙ্গ। নূর হোসেন হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের পোস্টার।

নব্বইয়ের পর প্রতি বছর দেখা যেত এ দিনটিতে একটু কাচুমাচু হয়ে থাকত সাবেক পতিত শক্তি জাতীয় পার্টি। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাঙ্গাত পাতার পর থেকে বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে। নূর হোসেনকে নিয়ে কিছু বলতে হয় না। উপরন্তু আওয়ামী লীগের আশকারায় একবার পুরনো কথা বলে ফেলেছিলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব। মুখ ফসকে মনের কথা ‘নূর হোসেন ছিল হিরোইঞ্চি’ বলে একটু ঝামেলা পাকলে পরে তাদের অভিভাবক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একটু শাসিয়ে পিঠ চাপড়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দিয়েছে। এবার আরেকটু ব্যতিক্রম। ১০ নভেম্বরের মূল প্রতিপাদ্যের ধারেকাছেও না গিয়ে দিনটি পার হয়েছে ভিন্ন উত্তেজনায়। পুরনো স্বৈরাচার জাতীয় পার্টির জমানায় সংঘটিত হত্যা নূর হোসেন দিবসটিতে সদ্য পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সমাবেশ ডাকে নূর হোসেনের নামে প্রতিষ্ঠা পাওয়া চত্বরে। এ নিয়ে ঘটনার বাঁক অন্যদিকে।

ক্ষমতাসীনদের মধ্যে বরাবরই শহীদদের নিম্ন ভাষায় আক্রমণের স্বভাব সহজাতের মতো। এবারের গণআন্দোলনে শহীদদের দুর্বৃত্ত বলতে অভ্যস্ত ছিল আওয়ামী লীগ। তাদের আশ্রিত জাতীয় পার্টি শহীদদের বলত ষণ্ডা-গুণ্ডা। আর নূর হোসেনকে বলেছিল নেশাখোর-টোকাই। একাত্তরের পাকিস্তানি শাসক ও তাদের দোসররা মুক্তিযোদ্ধাসহ স্বাধীনতাকামীদের বলত দুষ্কৃতকারী। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার কাছে শিবির-নেশাগ্রস্ত। রংপুরের আবু সাঈদকেও সেই সম্বোধনই করা হয়েছে। তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কয়েক সমন্বয়ককে তাদের রাজধানী রংপুরে নিষিদ্ধও করেছে।

পতনের পর আওয়ামী লীগ গুষ্টিসুদ্ধ পালিয়েছে। জাতীয় পার্টিকে পালাতে হয়নি নব্বইতে এবং এই চব্বিশেও। শেখ হাসিনার কয়েকটা অডিও সংলাপ ছাড়া ডুবন্ত জাহাজ উদ্ধারে এখনো কোনো আওয়ামী লীগের নেতাদের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। আশায় বুক বেঁধে থাকা আফসোস লীগের ভ্রাতা ও ভগ্নিরা ক্লান্ত অবসন্ন বিরক্ত। জাতীয় পার্টি আশা দেখছে তাদের নিষিদ্ধের অ্যাকশন কার্যকর না হওয়ায়। গত চার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকলেও অপরাধ করেননি বলে দাবি তাদের। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে শেখ হাসিনা তাদের নির্বাচনে নিয়ে মন্ত্রী-এমপি করে দিয়েছিলেন বলে অজুহাত। যুক্তি বা অজুহাত কী চমৎকার!

অবশ্য, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের আচরণ আরও জঘন্য। এত বিপুল মানুষের মৃত্যুর পর দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়া নয়; অন্তত ক’টা দিন চুপ থাকার বিবেচনাবোধও দেখায়নি দলটি। তার ওপর পিতা-কন্যার বদলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত ব্যানার-পোস্টার নিয়ে ধরা পড়া আবেগি কর্মীদের জনরোষের মতো বিপদে ছুড়ে দেওয়ার ফন্দি করেছে। একে কী বলবেন? কু-চর্চা? বিকৃত মানসিকতা? সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ না থাকলেও তাদের নেত্রী কর্মীদের বলছেন ‘ট্রাম্পের ছবি নিয়ে মিছিল করবা, সেই ছবি ভাঙচুর হবে, তার ছবি তুলে আমাকে পাঠাবা, আমি তা ট্রাম্পের কাছে পাঠাব। তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে।’

একটি প্রাচীন বৃহৎ দলের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বে থেকে, টানা ১৫ বছরসহ মোট ২০-২১ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে এ কী অর্জন, কী বিষাক্ত রুচি। অবশ্য, ১০ নভেম্বর নূর হোসেন দিবসে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ ইত্যাদি লীগকে রাজধানীর জিরো পয়েন্টে জমায়েত হওয়ার বার্তার বিপরীতে নেতাকর্মীদের দেখা যায়নি। গুটিকয় মানুষ, নেত্রীর কথামতো ট্রাম্পের ছবিসহ আটক হয়েছেন। এর বাইরে কেউ কেউ জনরোষের শিকার হয়েছেন। নিজে ও দলের নেতারা যেখানে বিদেশে বা আত্মগোপনে নিরাপদে বসে আছেন, সেখানে একটা গণহত্যার প্রেক্ষাপটের দায়যুক্ত দলের কর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ কীভাবে দেওয়া যায়! জনাকয়েক কর্মীকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দেন তিনি কোন বিবেচনায়! এর আগের রাতে শেখ হাসিনার ভাইরাল হওয়া কথিত অডিও ক্লিপের নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপি। শেখ হাসিনা দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে দলের নেতাকর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ব্যবহার করে মিছিল সমাবেশের নির্দেশ দৃষ্টেই তারা এই দুঃসাহস করেছেন। তাদের আশা এটা ট্রাম্পকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে সহায়ক হবে।

ভার্চুয়াল; জগতে রাতভর নানা উল্টাপাল্টা বার্তা ছড়ানো হয়েছে আওয়ামী লীগের এই বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে। কিন্তু সকালে একদম ফাঁকা। আওয়ামী লীগের ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল প্রতিহত করতে ভোর থেকেই জিরো পয়েন্টসহ আশপাশে অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। গণহত্যায় জড়িত এই দল এবং তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম কোনো সংগঠনকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানান তারা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিচার দাবিতে জিরো পয়েন্টেই গণজমায়েত করেন তারা। ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের যেকোনো কর্মসূচি মোকাবিলায় মাঠে থাকার ঘোষণা দেন। আর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের এলাকা থাকে বিএনপি নেতাকর্মীদের দখলে। ওই সময় আওয়ামী লীগ কার্যালয়টিও ছিল কার্যত শূন্য।

অথচ, দিনটি কত স্পর্শকাতর ও বেদনার। যে স্বৈরাচারী এরশাদ নূর হোসেনকে হত্যা করল, সেই এরশাদকে ক্ষমতার অংশীদার করে জাতীয় পার্টিকে রাজনীতিতে পুনরুজ্জীবন দেওয়া আওয়ামী লীগ নূর হোসেনকে নিয়ে যেন মশকারাই করল। টানা ১৫ বছর তারা এই দিবসটি ও তার তাৎপর্য কি ভুলে ছিল? কেবল ছোট বোনকে নিয়ে দলের বাকিদের অনিরাপদ রেখে এক কাপড়ে পালিয়ে ক্ষমতা ছাড়ার সময়ও লোক হাসিয়েছেন শেখ হাসিনা। পালিয়ে গিয়েও হাসাচ্ছেন। একটুও অনুশোচনা নেই। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তাদের অন্ধ করে ফেলেছে। এখন দলীয় নেতাকর্মীদের আপদের ওপর বিপদে ফেলছেন। ক্ষমতার ক্লোজিং পিরিয়ডের বাস্তবতা বোঝেননি। মানেননি। এখন পতনের পরও সাধারণ মানুষের এ সময়ের সেন্টিমেন্ট না বুঝে উল্টোপথে নামিয়ে আবেগি-নিরীহ কর্মীদের সঙ্গে নির্মমতা করছেন। বুঝতে চাইছেন না নিজেদের রাজনৈতিক পেরিফেরি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

কিন্তু, অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা থামছেন না। এতে দুই প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর তাকে অভিনন্দন জানিয়ে আওয়ামী লীগের বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গ তুলে একজন ভারতীয় সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ভারত শেখ হাসিনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাকি ‘নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে বিবেচনা করছে? সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নামিয়ে দেওয়া, ইসকনের উসকানি, কয়েক জায়গায় সেনাবাহিনীর গাড়িতে হামলা ইত্যাদির মাধ্যমে প্যানিক তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু, নেট ফল হাসিল হচ্ছে না। পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিয়েও সুবিধা করা যায়নি। কয়েক দিন অশান্তি জিয়ানো গেছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। কোনো ঘটনার রহস্য জানা গেছে ঘটানোর আগেই। এসব ঘটনা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দেউলিয়াত্বের আরও প্রকাশ ঘটিয়েছে। ১০ নভেম্বর ঘটাল আরেক এপিসোড।

৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সবাই পালিয়ে যাননি। তবে, বাতাস বুঝে তারা গর্তবাসী। শেখ হাসিনাসহ ভার্চুয়ালি কয়েক নেতার হম্বিতম্বিতে তারা মুখ টিপে হাসেন। ভুলেও রাস্তার ধারেকাছেও আসেন না। হাল বুঝে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরাও বেশ সাবধানী। কিন্তু পতিতরা বুঝতেই চাচ্ছেন না তাদের চাতুরী, ছলাকলা, মায়াকান্না এখন আর গেলানো যাচ্ছে না। তবে, নব্বইয়ের পতিত শক্তি জাতীয় পার্টি হাল ছাড়ছে না। তারা আশ্রয়দাতা মুরব্বিদের মতো পলায়ন করেনি। আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে আরও কয়েকটি দল অংশ নিলেও শুধু জাপার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে জিএম কাদের বলেন, ‘দেশের ভালোর জন্য আমরা জীবন দেব’। শেখ হাসিনা পালানোর আগের কয়েকদিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলা শুরু করেছিলেন ‘আমার কী অপরাধ? পালাব না, প্রয়োজনে বাবার মতো জীবন দেব’। এই নাটক আন্দোলনকারীরা খায়নি। একদিকে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, আরেকদিকে ‘আমার কী দোষ, প্রয়োজনে জীবন দেব’ বলার চাতুরী বোঝার বাকি থাকেনি।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনে শহীদদের নিয়ে মশকারা করবেন, তাদের হত্যা দিবসকে উপলক্ষ করে অন্য লক্ষ্য খুঁজবেন আর কত? জাতীয় পার্টি তো নূর হোসেন, ডা. মিলন হত্যার দায় এড়ানোর বয়ান হাজির করা শুরু করেছিল। জুলাই ২৪-এর অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধদের নিয়েও কি এমন রাজনৈতিক মশকারা দেখব আমরা? জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা কি মালুমই করতে পারছে না এই দলটি ফ্যাসিবাদের দোসর না হলে দোসর কে? তা বুঝে জাপার সুযোগ হাতানো নেতারা সাইড লাইনে থাকছেন। কাছে কিনারে ভিড়ছেন কম। মন্ত্রী, হুইপ, এমপি হয়ে সুবিধা হাসিল করেছেন। কামিয়েছেন দুই হাতে। নির্বাচনের খরচ বাবদ টাকার বস্তা নিয়েছেন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। এখন শেখ হাসিনার মতো ‘আমার কী দোষ’ বলে নিস্তার খোঁজার চেয়ে যদ্দুর নিরাপদ থাকা যায়, সেই মওকা খুঁজছেন তারা।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

mostofa71@gmail.com