বেতন শোধের আশ্বাসে সড়ক ছাড়লেন শ্রমিকরা

গাজীপুর মহানগরীর মোগরখাল এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে টিএনজেড গ্রুপের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ৫৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অবরোধ কর্মসূচি চালানোর পর প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বেতন পাওয়ার আশ্বাসে গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে অবরোধ তুলে নিলেও ঘণ্টাখানেক পর ফের ওই মহাসড়কেই অবরোধ সৃষ্টি করে। পরে আগামী রবিবারের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের আশ্বাসে রাতে ফের মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন শ্রমিকরা। রাত সোয়া ১০টার দিকে তারা মহাসড়ক ছেড়ে যাওয়ার পর যান চলাচল শুরু হয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত সুপার মোশাররফ হোসেন জানান, রবিবারের মধ্যে এক মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে বলে গতকাল শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি বকেয়া ২৮ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। ওই সিদ্ধান্ত শ্রমিকরা মেনে নিয়ে মহাসড়ক থেকে সরে যান।

গতকাল দুপুরে গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদ মিয়া ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে মীমাংসা করার প্রতিশ্রুতি দিলে শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নেয়। শ্রমিকদের একটি অংশ সরকারি সিদ্ধান্ত মানলেও অন্য একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত না মেনে মহাসড়কে অবস্থান করে। পরে সেনাবাহিনী ধাওয়া দিলে শ্রমিকদের ওই অংশ মহাসড়ক থেকে সরে যায় এবং যানবাহন চলাচল শুরু হয়। ঘণ্টাখানেক পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে শ্রমিকরা আবারও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। তারা বেতন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত সড়ক থেকে সরবে না বলে প্রশাসনকে জানিয়ে দেয়।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় ৬ কোটি টাকা ওই কারখানা কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ওই টাকা দিয়ে রবিবারের মধ্যে শ্রমিকদের পাওয়া মিটিয়ে দেওয়ার কথা। তারপরও যদি শ্রমিকদের কোনো দাবি থাকে তাহলে সোমবারের (১১ নভেম্বর) মধ্যে শ্রমিকদের নিয়ে একটি কমিটি করে ঢাকায় গিয়ে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু শ্রমিকরা এখনো তাদের প্রতিনিধিদের নাম ঠিক করতে পারেনি। তারা সড়ক অবরোধের কর্মসূচি থেকেও সরে যায়নি।

পোশাক শ্রমিকরা তাদের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে মহাসড়কে দুই রাত পার করেছে। রাত জেগে তারা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে।

ইকবাল হোসেন নামের মোগরখাল এলাকার স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত ৫০ বছরে গাজীপুরে এত দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি। এ মহাসড়ক দিয়ে দেশের প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের মানুষ চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কটি তিন দিন ধরে অবরুদ্ধ থাকলেও সরকারপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে অনেক বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের চালক-হেলপাররা বিপাকে পড়েন। তারা নিত্যকৃত্য সারার জন্য আশপাশের বাড়িঘরে ভিড় করছেন। তিন দিন ধরে গোসল করতে না পেরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।’

গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক নারী ও পুরুষ পোশাক শ্রমিক মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে। মহাসড়কের পাশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। শ্রমিকরা তিন দিন ধরে মহাসড়ক অবরোধ করে রাখলেও যানবাহন ভাঙচুর বা অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটায়নি।

কয়েকজন পোশাক শ্রমিক জানিয়েছে, বকেয়া বেতন পাওয়া মাত্রই তারা অবরোধ তুলে নেবে। সালমা আক্তার নামে এক পোশাক শ্রমিক বলেন, ‘কারখানা মালিককে প্রশাসনের মাধ্যমে আমাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য বারবার তারিখ দিলেও তারা কথা রাখেনি। তাই এবার আমরা প্রশাসনসহ কারও কথাই মানব না, আমরা আমাদের পাওনা চাই।’

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে শ্রমিকদের অবরোধের কারণে স্থানীয় শাখা রোডগুলোতেও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ছোট-বড় অনেক গাড়ি অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তায় ঢোকার ফলে এ যানজট সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

তিন দিন ধরে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নানা ঝুঁকি ও দুর্ভোগ নিয়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকায় ঢুকছে। অনেকে সময়মতো ঢাকায় পৌঁছতে না পারায় তাদেরও ভোগান্তি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গতকাল সকালে বিক্ষুব্ধ কিছু পোশাক শ্রমিক গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া, বাসন সড়ক, চৌধুরীবাড়ি, ভোগড়া বাইপাস, চান্দপাড়া, মোগরখাল, ছয়দানা, মালেকের বাড়ি, ডেকেরচালা, সাইনবোর্ড প্রভৃতি এলাকার পোশাক কারখানায় গিয়ে ওইসব কারখানার শ্রমিকদেরও তাদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে থাকে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এসব এলাকার অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে শিল্প-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটান পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) ইব্রাহিম খান বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের দাবির প্রশ্নে অটল। তারা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নিচ্ছে না। বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চলছে। আশা করছি খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’

গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সুপার সারোয়ার আলম বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ চলছে। আশা করছি শিগগিরই বিষয়টির সমাধান হবে।’

ফতুল্লায় বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, বিসিকের বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট হামলা-ভাঙচুর : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বকেয়া বেতনের দাবিতে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সড়কটি অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটিতে অবস্থিত ক্রোনি গ্রুপের শ্রমিকরা। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে পঞ্চবটি-মুন্সীগঞ্জ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুন্সীগঞ্জ থেকে এ রুট দিয়ে ঢাকায় যাতায়াতকারীরা ভোগান্তিতে পড়েন। বিকেল সাড়ে ৩টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে গেলেও সড়কের দুপাশে অবস্থান নিয়েছেন। যেকোনো সময় তারা আবারও সড়ক অবরোধ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পাঁচ ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেওয়ায় সড়কটিতে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, বিজিবি, শিল্প ও থানা পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। 

এদিকে বিক্ষোভরত শ্রমিকরা একপর্যায়ে পাশের বিসিক শিল্পাঞ্চলে ঢুকে বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ভাঙচুর করলে নিরাপত্তার কারণে বিসিক শিল্পাঞ্চলের সব গার্মেন্ট দুপুরের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।

নরসিংদীর আওয়ামী লীগ নেতা আসলাম সানির মালিকানাধীন ক্রোনি গ্রুপের দুটি তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। গত বছর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে প্রায়ই বিক্ষোভ করছেন।

ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্স নামের পোশাক কারখানার সুইং সেকশনের শ্রমিক জাহানারা বেগম বলেন, ‘গত বছর থেকে এ কারখানার মালিক বেতন নিয়ে গড়িমসি শুরু করেন। আগস্ট মাস থেকে আমার বেতন বকেয়া। বেতন না দিয়ে গত মাসে কারখানা লে-অফ ঘোষণা করা হয়। অনেকের কাছে আমরা গেছি, কোনো সমাধান পাইনি। আজকে তাই বাধ্য হয়ে সড়কে নামছি আমরা।’

আন্দোলনরত প্রতিষ্ঠান দুটির শ্রমিকরা বিসিকে প্রবেশ করে কয়েকটি গার্মেন্ট ভাঙচুর করলে বেলা সাড়ে ১১টায় বিসিকের সব গার্মেন্ট ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। বিসিকের আর-ফোর নামে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক শাহিদা আক্তার বলেন, আমাদের লাঞ্চ হয় সাড়ে ১২টায়। কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর করায় ভয়ে কারখানা ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই ক্রোনি গ্রুপের কারখানা দুটিতে বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে অসন্তোষ চলছে। গত এপ্রিলে ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্সের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। ওই সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৬০ জন আহত হয়েছিলেন।

বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্পাঞ্চলে ৪৩২টি কারখানা রয়েছে। তবে সব কারখানায় কাজ নেই। বিসিকের বাইরের একটি গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিসিকের অধিকাংশ কারখানা লাঞ্চের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশের পরিদর্শক সেলিম বাদশা বলেন, ক্রোনি ও অবন্তী গামের্ন্টের মালিক শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের নিয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা আলোচনা করছি।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, বিকেলে শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে গেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন আছেন। দীর্ঘ সময় অবরোধের কারণে পঞ্চবটি-মুন্সীগঞ্জ সড়কে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করছে।