হাসিনাকে কি ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানো যাবে

জুলাই-আগস্টে গণহত্যার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারে রেড নোটিস জারি করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইন্টারপোলকে অনুরোধ জানিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) মাধ্যমে ইন্টারপোলকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

গত রবিবার অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলও বলেছেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

এর আগে, গত অক্টোবরে শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের গ্রেপ্তার করে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন বা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনা যাবে কি না, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। একই সঙ্গে আত্মগোপনে চলে যান তার সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিছুদিন আগে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার দেশটিতে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে থাকা দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

ইন্টারপোলকে রেড নোটিস জারির অনুরোধ : গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত পরশু (রবিবার) রেড নোটিস বা রেড অ্যালার্ট জারির (শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারে) জন্য অনুরোধ করেছি। একসময় যিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যিনি এ মামলার আসামি, তিনি এখন পলাতক, দেশের বাইরে আছেন। তাকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের জন্য প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে অনুরোধ পাঠিয়েছি। আন্তর্জাতিক পুলিশিং সংস্থা ইন্টারপোল তাকে যেন গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা নেয়; তার ব্যাপারে অন্তত রেড অ্যালার্ট জারি করে, এ অনুরোধ আমরা জানিয়েছি।’

ইন্টারপোল বা প্রত্যর্পণ চুক্তিতে হাসিনাকে কি ফেরানো সম্ভব : সরকারের পক্ষ থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি জোরালোভাবে বলা হলেও কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রত্যর্পণ বা ইন্টারপোলের রেড নোটিস দুভাবেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা দিল্লির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় কোনো দেশ যদি কোনো আসামিকে ফেরত দিতে না চায়, তাহলে যেকোনো কারণ দেখিয়ে ইন্টারপোলের আবেদন নাকচ করে দিতে পারে।

প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ চুক্তি বাস্তবায়ন করার বিষয়টি শুধু আইনি নয়, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও বিষয়। ভারত সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের সম্পর্ক এবং বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কও এর সঙ্গে যুক্ত। ইন্টারপোল বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনেক জটিল বলে মনে করেন এ কূটনীতিক।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, যার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তাকে যে দেশে নেওয়া হবে, সেই দেশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, এখানে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কি না, সেগুলোও বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কাউকে ফৌজদারি অপরাধে আটক দেখিয়ে ফেরত আনা খুব একটা সহজ নয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলাসহ বিভিন্ন মামলার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রথমে ইন্টারপোল ওই বছরের ২ জুলাই তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করেছিল। এ নিয়ে তারেক রহমানের আইনজীবীরা আইনি লড়াইয়ে যান। ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ ইন্টারপোলের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেড নোটিসের তালিকা থেকে তারেক রহমানের নাম প্রত্যাহারের আদেশ দেয় ইন্টারপোল কমিশন। বর্তমানে ইন্টারপোলের তালিকায় বাংলাদেশের যে ৬৪ জনের নাম রয়েছে, তার মধ্যে তারেক রহমানের নাম নেই।

ইন্টারপোলের রেড নোটিস কী : ইন্টারপোল হলো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ সংস্থাটি সারা বিশে^র পুলিশ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের একটি নেটওয়ার্কে সংযুক্ত ও সমন্বয় করে। এ সংস্থার প্রধান কাজ হলো অপরাধীদের ধরতে ইন্টারপোলের সঙ্গে সংযুক্ত পুলিশকে সহায়তা করা। যাতে করে বিশে^র সব পুলিশ অপরাধের বিরুদ্ধে এক হয়ে কাজ করতে পারে।

ইন্টারপোলের এমন একটি ডেটাবেস রয়েছে, যেখানে অপরাধীদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য যেমন অপরাধীর ছবি বা স্কেচ, ক্রিমিনাল প্রোফাইল, ক্রিমিনাল রেকর্ড ইত্যাদি পাওয়া যায়। দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানব পাচার, অস্ত্র পাচার, মাদক পাচারসহ ১৭ ক্যাটাগরির অপরাধ তদন্তে ইন্টারপোল তার সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা দিয়ে থাকে।

তবে রেড নোটিস কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয় এবং ইন্টারপোল গ্রেপ্তারের নির্দেশও দিতে পারে না। একটি দেশের নাগরিক অপরাধ করার পর অন্য দেশে চলে গেলে তাকে ধরতে বা ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা লাগে। সংস্থাটি অপরাধের তদন্ত, ফরেনসিক ডেটা বিশ্লেষণ এবং একই সঙ্গে পলাতক আসামিকে খুঁজতে সহায়তা করে। আর এর জন্য ওই দেশকে সন্দেহভাজন অপরাধীর যাবতীয় তথ্য দিয়ে রেড নোটিস জারির জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর ইন্টারপোল সেই কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নোটিস জারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। নোটিস জারির ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া না হওয়া তাদের কাছে মুখ্য নয়। ইন্টারপোল কারও বিরুদ্ধে একবার রেড নোটিস জারি করলে তা সংস্থাটির সদস্যভুক্ত ১৯৪টি দেশের কাছে পাঠানো হয়।

তবে কোনো দেশ যদি তাদের নিজস্ব বিবেচনায় বা মানবাধিকার প্রশ্নে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, সে ক্ষেত্রে ইন্টারপোল বা তাদের জারিকৃত রেড নোটিসের মাধ্যমে কিছু করা সম্ভব নয়। যদি গ্রেপ্তার করতেই হয়, তাহলে অভিযুক্ত যে দেশে আছেন, সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা নিজ দেশের বিচারিক আইন মেনে চলবে অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করে অভিযুক্ত যে দেশে রয়েছেন তাদের ওপর।

ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি : ২০১৩ সাল থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের মামলা’য় অভিযুক্ত বা ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অন্যের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি চুক্তি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তির নামে মামলা বা অভিযোগ দেওয়া হয় বা তিনি দোষী সাব্যস্ত হন অথবা দেশের আদালত কর্তৃক প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ করার জন্য তাকে ফেরত চাওয়া হয়, তাহলে তাকে ফেরত দেবে বাংলাদেশ ও ভারত। আবার এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, অপরাধটি রাজনৈতিক প্রকৃতির হলে যেকোনো দেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ২০১৬ সালে একটি ধারায় সংশোধনী এনে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখালেই তাকে বৈধ অনুরোধ বলে ধরে নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত সরকার যেকোনো কারণ দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিতে পারে।