বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের হতাহতের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরই মধ্যে হত্যা এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কয়েকশ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয়সহ অন্তত পাঁচ লাখ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা-আমলা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউই বাদ যাচ্ছেন না এসব মামলার আসামি তালিকা থেকে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই মামলার আসামিদের চিনছেন না স্বয়ং বাদী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। এসব মামলা ঢালাওভাবে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
এমন ঢালাও মামলায় সরকার বিব্রত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আইন ও বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ প্রসঙ্গে কথা বলেন তিনি। আইন উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকারের আমলে অহরহ গায়েবি মামলা হতো। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বর্তমান সরকার কোনো মামলা করছে না। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ঢালাও মামলা হচ্ছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য বিব্রতকর।
এসব ঢালাও মামলাকে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। তারা বলেন, মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে শুধুমাত্র টাকা আদায়ের লক্ষ্যেই কতিপয় গোষ্ঠী এসব করছে যা গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পরিপন্থী ও বর্তমান সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো কার্যক্রম।
সম্প্রতি একটি মামলার ‘আসামি হিসেবে’ নাম থাকায় আলোচনায় এসেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। রাজধানীর রামপুরা থানায় গত ১৯ অক্টোবর একটি মামলা নথিভুক্ত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রামপুরায় গুলিতে নিহত হন সোহান শাহ নামে এক চাকরিজীবী। এই ঘটনায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর নিহতের মা সুফিয়া বেগম ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে নালিশি মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে সেই মামলা থানায় রেকর্ড করা হয়। মামলার ৫৭ জন আসামির মধ্যে ৪৯ নম্বর তালিকায় নাম রয়েছে শেখ বশির উদ্দিন ভূইয়া নামে একজনের। যার পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। বাবার নাম শেখ আকিজ উদ্দিন ভূইয়া। নামটি আংশিকভাবে মিলে যায় গত রবিবার অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা হওয়া ব্যবসায়ী সেখ বশির উদ্দিনের সঙ্গে। এমনকি তার বাবার নামের সঙ্গে আসামি তালিকায় থাকা ‘শেখ বশির উদ্দিন ভূইয়া’র বাবার নামের আংশিক মিল রয়েছে। এর পরেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী হত্যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপদেষ্টা করা হয়েছে এমন সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে দেশ জুড়ে। এই সমালোচনাকে কেন্দ্র করেই উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার নথি, আসামি, পুলিশ ও বাদীর বক্তব্যে জানা যায়, মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ তিন পক্ষের কেউই কাউকে চেনেন না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রামপুরা থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার জন্য নির্দেশ দেয়। সেই মামলায় এজাহারভুক্ত ৪৯ নম্বর আসামি শেখ বশির উদ্দিন ভূইয়া নামে একজন। এই শেখ বশির উদ্দিন ভূইয়া বর্তমান উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন কি-না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নামে কিছুটা অসংগতি থাকলেও বাবার নাম ও বাড়ির ঠিকানা একই।’
এ বিষয়ে গত সোমবার প্রথম কর্মদিবসেই সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি খুব ভালো জানি না। আমাদের লিগ্যাল টিম বিষয়টি দেখছে। ওখানে (মামলার এজাহার) আমার নামের, আবার বাবার নামের কিছু সংগতি আছে, কিছু অসংগতি আছে। এটা আসলেই আমি কি না, আমি নিশ্চিত নই। নিশ্চিত হলে লিগ্যালি ফেস (আইনিভাবে মোকাবিলা) করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় মামলার বাদী সুফিয়া বেগমের কাছে। তিনি বলেন, ‘সন্তান হারিয়ে আমি পথে পড়ে গেছি। পাগলপ্রায় অবস্থা। এমন সময়ে মোবাইল করে আমাকে ঢাকায় আদালতে যেতে বললে, আমার স্বামী সেকেন্দার শাহের সঙ্গে গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর স্বাক্ষর করেছি; কিন্তু ওই মামলায় কারা আসামি, কাদের নাম লেখা আছে সেটি জানা নেই। তবে মামলা যারাই করুক, আমি স্বাক্ষর করেছি। সেখানে যাদের নামই থাকুক, আমি ন্যায়বিচার চাই।’
কারা ডেকে নিয়ে মামলা করিয়েছে জানতে চাইলে মুখ খোলেননি সুফিয়া বেগম।
মামলার বাদী আসামি কেউই কাউকে চেনেন না। তাহলে মামলার নেপথ্য কারিগর-প্রভাবক কে বা কারা? এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেই মুখে কুলুপ আঁটেন বাদী। শুধু সোহান হত্যা মামলার বাদী সুফিয়াই নন, এমন ঘটনা দেখা গেছে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলার বাদী বাকেরের ক্ষেত্রেও। গত ১৯ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আহাদুল ইসলামকে গুলি ও মারধর করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা করা হয়। ঘটনার প্রায় তিন মাস পর ১৭ অক্টোবর খিলগাঁও থানায় মামলাটি করেন আহাদুলের বাবা মো. বাকের। এই মামলায় ৯৪ নম্বর নামটি জেড আই খান পান্নার। মামলাটির তথ্য জানাজানির পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সমালোচনার মুখে একদিন পরই মামলা থেকে জেড আই খান পান্নার নাম প্রত্যাহারের আবেদন করেন বাদী বাকের। সেই আবেদনে তিনি লেখেন, ‘উক্ত এজাহারের ৯৪ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্নাকে অজ্ঞতা ও ভুলবশত আসামি করা হয়। ৯৪ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে মামলাটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করিতে মর্জি হয়।’ কার পরামর্শে এই মামলা ও তাতে জেড আই খান পান্নাকে আসামি করা হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাব দেননি বাদী বাকের।
এই ধরনের মামলাগুলোকে ভুয়া হিসেবে অভিহিত করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ধরনের ভুয়া মামলা যারা করছেন তারা সরকার এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে বিতর্কিত করছেন। এসব মামলার মাধ্যমে অনেকেই চাঁদাবাজি করছেন। এমন মামলা দিয়ে মানুষকে হয়রানি করা মোটেও সমীচীন নয়।’
মামলা নেওয়ার আগে পুলিশের প্রতি যাচাই-বাছাইয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলা নেওয়ার আগে পুলিশের উচিত বাদীসহ অভিযোগের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা। মামলার আসামিদের যাচাই করা। যদি বাদীকে যাচাই-বাছাই করে মামলার সঠিকতা না পাওয়া যায় তাহলে এ ধরনের মামলা নথিভুক্ত করারও কোনো প্রয়োজন নেই। যেহেতু এ ব্যাপারে প্রশ্ন উঠছে যে বাদী আসামিকে চেনেন না, আসামি বাদীকে চেনেন না। সেহেতু এসব মামলার ক্ষেত্রে বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই মামলা নথিভুক্ত করা উচিত। যদি কোর্টে মামলা করতে যায়, তাহলে কোর্টের উচিত বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া। বাদী যদি অভিযোগ ও আসামির ব্যাপারে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন তাহলে মামলা নেওয়া উচিত। না দিতে পারলে এ ধরনের মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।’
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগরের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা করার ক্ষেত্রে বাদীর এবং মামলা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের তরফ থেকে অভিযোগ, ঘটনা ও আসামিদের ব্যাপারে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। যদি পুলিশের তরফ থেকে এক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি পাওয়া যায়, তাহলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’